Image description
ডিআইএর জবাবদিহিতায় অনিয়ম

গত বছরের অক্টোবরে রাজধানীর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে তদন্তে যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) এর প্রতিনিধিদল। বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে সংঘটিত নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করেন তারা। অথচ ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। কারণ অডিট করতে গিয়ে অভিযুক্তদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে তারা ২ কোটি টাকা ঘুস নিয়েছেন। ঘুস লেনদেনের বিষয়টি যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন অডিট টিমের একজন কর্মকর্তা। শুধু তাই নয়, পরিদর্শনে গিয়ে প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঘুস লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই অডিট অফিসার যুগান্তরকে বলেন, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মনিপুরের বিভিন্ন অনিয়ম খতিয়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ আয়-ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তারা ডিআইএ পরিচালককে বড় অঙ্কের ঘুস দিয়ে অডিট রিপোর্ট পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন যুগান্তরকে বলেন, ডিআইএ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিদর্শন ও নিরীক্ষার জন্য সাত সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়। তারা ওই বছরের ১২ অক্টোবর থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠনটি অডিট করেন। পরের মাসে আবার তারা ৫ দিন অডিট পরিচালনা করেন। ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এসএম শহিদুল ইসলাম নিজেই অডিট মনিটরিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এই অডিটের সময়ই ঘুস লেনদেন হয়।

এ বিষয়ে ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এসএম শহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘মনিপুর স্কুলে অডিটের সময় অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমরা ইতোমধ্যে দুর্নীতির জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। সেই অনুযায়ী কাজ করছি। এসব অনিয়মের অভিযোগের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অডিট রিপোর্ট দ্রুত প্রকাশ করা হবে। যেহেতু এই প্রতিষ্ঠানের অনেক শাখা রয়েছে। তাই রিপোর্ট তৈরি করতে একটু সময় লাগছে।’

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অডিট টিমটিতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এখানে চাকরি করে সবাই এখন কোটিপতি। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অডিট করতে গিয়ে ভয়ভীতি দেখান। এ সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ঘুস দিতে বাধ্য হন। স্থায়ী কর্মচারীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুসবাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

শিক্ষা খাতে জবাবদিহি নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম খুঁজে বের করাই এর মূল দায়িত্ব। সেই প্রতিষ্ঠান ঘিরেই উঠেছে ঘুস, বদলি ও নানা দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ। অধিদপ্তরে বর্তমান পরিচালক শহিদুল ইসলাম এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা। তার নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এছাড়া দপ্তরের বেশকিছু শিক্ষা পরিদর্শক, সহকারী পরিদর্শক ও অডিটরদের বিরুদ্ধে পরিদর্শনের নামে ‘অনৈতিক সুবিধা’ গ্রহণের অভিযোগও সামনে এসেছে। এর মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগও দেওয়া হয়। অধিদপ্তরের অডিটর সুপার আবু সুফিয়ানকে ঘিরে নিয়োগে অনিয়ম, ঘুসবাণিজ্য এবং প্রভাব বিস্তারের একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি নানা অনিয়মের মূল হোতা হিসাবে পরিচিত।

অভিযোগের বিষয়ে আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সবকিছু দেখভাল করেন। তাই আমাদের অনিয়মে জড়ানোর সুযোগ নেই।’

এছাড়া ঘুসবাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে-দপ্তরের অডিটর সিরাজুল ইসলাম, মো. শাহপরান মিয়া, আলতাফ হোসেন, রাজিব ও সানোয়ার হোসেনসহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে। ডিআইএ শিক্ষা পরিদর্শক একেএম রাশিদুল হাসান, সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলফাজ উদ্দীন, মো. কাওছার হোসেন, মাহমুদুল হাসান, সহকারী পরিদর্শক এফএম শাহাবুদ্দীন রুমন, অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেবসহ আরও অনেকে ঘুস নেন পরিদর্শনে গিয়ে। এর মধ্যে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে এ দপ্তরে কর্মরত আছেন।

সম্প্রতি রাজধানীর সূত্রাপুরের গেন্ডারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে অনিয়ম তদন্ত করতে গিয়ে ঘুস দাবি করার অভিযোগ উঠেছে পরিদর্শক নূশরাত হাছনীনের বিরুদ্ধে। এই নিয়ে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ২০ মে মধ্যে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এই বিষয়ে তদন্ত কমিটির সদস্য ও ডিআইএ যুগ্ম-পরিচালক অধ্যাপক মো. ইদ্রিস আলী যুগান্তরকে বলেন, আমরা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করে দেখছি। যথাসময়ে রিপোর্ট দেব।

এদিকে চাঁদপুরের ফরক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের অডিট রিপোর্টকে কেন্দ্র করেও অডিট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বিদ্যালয়ের সাবেক অভিভাবক সদস্য মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অডিটের পর কিছু শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে প্রায় এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। প্রায় ১০ লাখ টাকার চুক্তির মাধ্যমে অডিট রিপোর্ট পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে। ওই অডিট টিমের পরিদর্শক মো. মকবুলার রহমান যুগান্তরকে বলেন, রিপোর্টে নানা অসংগতি তুলে ধরায় দেরি হচ্ছে। দ্রুত রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে। অর্থ নেওয়ার অভিযোগ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি ডিআইএ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি সেখানে নিয়োগ পেতে কর্মকর্তারা (শিক্ষা ক্যাডারের) মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে বেশি ভিড় করেন বলেও মন্তব্য করেন। এছাড়া এর কর্মকর্তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে এক মাসের এমপিওর সমান (বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতনের সরকারি অংশ, শতভাগ মূল বেতন) আর্থিক সুবিধা আনার অভিযোগ আছে বলেও শিক্ষামন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ডিআইএ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সারা দেশের প্রায় ৩৭ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো লেনদেন হয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম ধরতে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ডিআইএ। এতে একজন পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালক, চারজন উপপরিচালক, ১২ জন পরিদর্শক ও ১২ জন সহকারী পরিদর্শকসহ মোট ৩০ কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। এ ছাড়া অডিট দপ্তর থেকে চারজন অডিট অফিসার এবং নিজস্ব জনবল থেকে ৯ জন অডিটর দায়িত্ব পালন করেন। তাদের মধ্যে পরিচালকসহ শিক্ষা ক্যাডার ও দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ঘুস সিন্ডিকেট গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটে দপ্তরের পরিচালক থেকে শুরু করে শিক্ষা পরিদর্শক, সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক ও অডিটররা সম্পৃক্ত রয়েছেন।

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অডিট টিম পরিদর্শন করে যথাসময়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ধরতে গিয়ে নিজেরাই অপরাধে জড়াচ্ছেন। এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।