Image description

টেকনাফ পৌর সদরের শাপলা চত্বর থেকে প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দূরে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লাতুরীখোলা গ্রাম। এই গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমানের ঘরে এখন শুধুই কান্না আর নিস্তব্ধতা। সংসারে সচ্ছলতা আনার স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন তাঁর দুই ছেলে জুনায়েদ (১৯) ও তারেক (২০)। কিন্তু আলো জ্বালাতে গিয়ে উল্টো পুরো পরিবারকেই অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছেন তাঁরা।

স্বজনদের ভাষ্য, দালালদের প্রলোভনে পড়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথের সেই ভয়ংকর মরণযাত্রায় শামিল হয়েছিলেন দুই ভাই। ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ট্রলার ডুবে যাওয়ার পর থেকেই নিখোঁজ তাঁরা। এর পর থেকে প্রতিটি দিন কাটছে অপেক্ষা আর শঙ্কায়। দুই ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছে পরিবারটি।

আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবিতে অন্তত ২৬৪ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে। এর মধ্যে শতাধিক বাংলাদেশি রয়েছেন। বেশির ভাগ টেকনাফের বাসিন্দা। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে এই উপজেলার ৪০ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে।

গত সপ্তাহে সরেজমিনে ঘুরে এই পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে স্বপ্নভাঙা মানুষের বুকচেরা আর্তনাদ।

জানা গেছে, নিখোঁজদের বেশির ভাগই কিশোর ও তরুণ। কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষি শ্রমিক, কেউ লবণচাষি, কেউ আবার ছোটখাটো কাজ করে সংসারে সহায়তা করতেন। অনেকেই পরিবারের অজান্তে দালালদের ফাঁদে পা দিয়ে জীবন বাজি রেখে পাড়ি জমিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার পথে। আবার কয়েকজনকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

লাতুরীখোলার বাড়িতে বসে জিয়াউর রহমান বলেন, ‘কত ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচিয়ে ওদের বড় করেছি। সেই ছেলেরাই আজ সাগরে হারিয়ে গেছে। বুকটা একেবারে খালি হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘ওরা প্রায়ই বিদেশে যাওয়ার কথা বলত। বলত সংসারে সচ্ছলতা আনবে। কিন্তু ঘরের কাউকে কিছু না জানিয়েই দালালের কথায় চলে গেল। আগে জানলে কখনোই সমুদ্রপথে যেতে দিতাম না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘যদি ওদের মরদেহও পেতাম, বাড়ির উঠানে দাফন দিতাম। মনে হতো, ছেলেরা আমার কাছেই আছে। এই কষ্ট আমাকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে।’

একই গ্রামের মো. কালুর ছেলে এনায়েত রহমান (১৮) এবং আবদুর রহমানের ছেলে মো. তারেকও (১৭) একই ট্রলারের যাত্রী ছিলেন। তাঁদের পরিবারেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

অসুস্থ বাবার সংসার চালাতে ইটভাটায় দিনমজুরের কাজ করতেন এনায়েত। পরিবারকে সচ্ছল করার স্বপ্নেই দালালের প্রলোভনে পা দেন তিনি। বাবা কালু বলেন, ‘যারা বেঁচে ফিরেছে তাদের কাছে শুনেছি, আমার ছেলেও সাগরে তলিয়ে গেছে। এখন আমাদের খাওয়াবে কে? ভিক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

অন্যদিকে টমটমচালক আবদুর রহমানের স্বপ্ন ছিল ছেলেকে বৈধভাবে বিদেশে পাঠাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি কষ্ট করে টাকা জমাচ্ছিলাম। কিন্তু ছেলে আমাকে না জানিয়েই মালয়েশিয়া চলে গেল। এখন শুধু আফসোস হয়।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দালালরা শুধু গরিবের ছেলেদের টার্গেট করে। গরিব পরিবারের সন্তানদের বিক্রি করে তারা কোটিপতি হচ্ছে, আর আমাদের সব শেষ করে দিচ্ছে।’

উত্তরপাড়া এলাকার লবণচাষি হারুনুর রশিদ গত ৩০ মার্চ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি। তাঁর বাবা জাফর আলম ও মা রশিদা খাতুন জানান, ছেলেকে তাঁরা শপথ করিয়েছিলেন, কোনো দালালের প্রলোভনে পা দেবে না। কিন্তু পরে জানতে পারেন, স্থানীয় এক ব্যক্তি তাঁকে বড় দালালের হাতে তুলে দিয়েছে।

ঘরের দাওয়ায় বসে ছিলেন হারুনের ৮০ বছর বয়সী দাদি এলম বাহার। মুখে কোনো কথা নেই, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। ঘরের ভেতরে স্ত্রী মুর্শিদা খাতুন দুই বছরের মেয়ে রাইসা নূর আর দেড় মাস বয়সী ছেলে আবির হাসানকে সামলাচ্ছিলেন।

জাফর আলম জানান, ৪ এপ্রিল ট্রলার ছাড়ার দিন ছোট ভাইকে ফোন করে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন হারুন। সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা।

শাহ পরীর দ্বীপের মিস্ত্রীপাড়া ও বাজারপাড়া থেকেও চারজন কিশোর ও তরুণ নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের একজন আবদুল হান্নান (১৬)। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় দালাল মাহবুবুর রহমান ওরফে মাম্মা তাকে পাচার করে দিয়েছে।

হান্নানের মা মাহমুদা বেগম বলেন, ‘আমার ছোট ছেলেটার কোনো খোঁজ নেই। চারদিকে শুধু ট্রলারডুবির খবর শুনি। বুকটা ফেটে যায়। কান্না করতে করতে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। আমি আমার মানিককে ফেরত চাই।’

তিনি জানান, গত ১ এপ্রিল ফুটবল খেলার মাঠ থেকে প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর ছেলেকে নিয়ে যায় দালালচক্র। পরে ফোনে জানানো হয়, মালয়েশিয়া পাঠাতে লাখ টাকা লাগবে। এখন শোনা যাচ্ছে, সেই ট্রলারটিই সাগরে ডুবে গেছে।

চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘দালাল আমার ছেলেকে সাগরের মাছের খাদ্য বানিয়ে দিল।’

বাজারপাড়ার জাহিদ হোসেনের ছেলে জিয়াউর রহমান (১৭) সাগরে মাছ ধরত। ২ এপ্রিল সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়ি ছাড়ে সে। জাহিদ বলেন, ‘যখন শুনেছি ছেলে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে, তখন পুরো এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। যে করেই হোক, ওকে আটকাতাম। সেই সুযোগটি আর পেলাম না। এখন ছেলের শোক বুকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি।’

ছেলের শোকে মারা গেলেন বাবা

আন্দামান ট্র্যাজেডির ভয়াল ছোবল পড়েছে টেকনাফের একটি পরিবারে। সাবরাং ইউনিয়নের কাঁটাবুনিয়া গ্রামের কিশোর এনায়েত উল্যাহ নিখোঁজের আঘাতে স্ট্রোক করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাবা সলিম উল্যাহ (৫০)। কয়েক দিন অপেক্ষার পর ছেলের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় গত ১৯ এপ্রিল মারা যান তিনি।

সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, বাড়িতে নতুন দালানের কাজ শুরু হয়েছিল। মাটি খুঁড়ে পিলারও দাঁড় করানো হয়ে গেছে। বড় ভাই আবদুল্লাহ জানান, এনায়েত বাড়ির এই কাজ দেখভাল করত। তাঁদের সংসারে কোনো অভাব নেই। তবু বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে গোপনে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।

তিনি জানান, ১ এপ্রিল কক্সবাজার পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট হাতে পেয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত ছিল এনায়েত। পাসপোর্ট করার পরও যে সে সমুদ্রপথে চলে যাবে, এটা কেউ ভাবতেই পারেনি।

এ সময় আবদুল্লাহ একটি ভিডিও ফুটেজ দেখান। এতে দেখা যায়, এনায়েত পাসপোর্ট হাতে নিয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পারে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, ‘হয়তো এটাই আমার শেষ কক্সবাজার আসা, আর হয়তো কক্সবাজার আসা হবে না। বন্ধুরা, আমার জন্য দোয়া করো।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোট ছেলে এনায়েতকে ভীষণ ভালোবাসতেন বাবা সলিম উল্যাহ। তিনি সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। কিন্তু ছেলে এভাবে হারিয়ে যাওয়ায় ভেঙে পড়েন তিনি। গত ১৯ এপ্রিল খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে আহাজারি শুরু করেন। শুধু বলতে থাকেন, ‘হায় আমার পোলা...।’

এরপর সকাল ৮টার দিকে বড় ছেলের সঙ্গে পায়ে হেঁটেই হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যান। টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলেন। ল্যাবে সেই পরীক্ষা করার সময় আচমকা পড়ে পড়ে যান তিনি। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। 

স্বামীর পথ চেয়ে অন্তঃসত্ত্বা মুবিনা

শাহপরীর দ্বীপ বাজারপাড়ার হাফেজ মো. সাউদের গল্প আরো করুণ। বয়স মাত্র ২৪ বছর। আরো দুই বছর পড়লে পূর্ণাঙ্গ আলেম হতেন। তাঁর ১৮ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে, আর স্ত্রী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

মা অলমরজান জানান, ৪ এপ্রিল কাজের কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন সাউদ। কাউকে কিছু না জানিয়েই দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার পথে পাড়ি জমান।

স্ত্রী মুবিনা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার স্বামী আমাকে কিছু না জানিয়েই চলে গেছে। আমি কখনো ভাবিনি, এভাবে স্বামীহারা হব, আমার সন্তান এতিম হবে।’

এক বাড়ির তিনজন

দক্ষিণপাড়ার জেলে হোসেন আলীর ছেলে ফরিদ সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পাসপোর্টও জমা দিয়েছিলেন একটি এজেন্সিতে। কিন্তু স্থানীয় দালালের প্রলোভনে পড়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে এখন নিখোঁজ।

মা লায়লা বেগম ছেলের পাসপোর্ট হাতে নিয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় দরজার সামনে বসে থাকেন। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব যাওয়ার জন্য টাকা পর্যন্ত দিয়েছিলাম। এখন জানি না, আমার ছেলে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে।’

পাশের বাড়ির হোসাইনও একই পথে হারিয়ে গেছেন। ওই বাড়িতে গেলে দেখা যায় হোসাইনের মা নূর বেগম নীরবে কাঁদছেন। আমাদের দেখে বুকভাঙা আর্তনাদ শুরু করেন। কাঁদতে কাঁদতেই বলেন, ‘দইজ্যারে হইদ্দে আঁর পুয়ারে ফেরত দে (সাগরকে বলি আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও)।’ তাঁর ভাষ্য, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছেলেকে প্রলোভন দেখিয়ে দালালচক্র কেড়ে নিয়েছে।

এই বাড়ি থেকে একটু এগোলেই সমুদ্রপারে আরেক মায়ের শোকের মাতম। নিখোঁজ জয়নালের পথ চেয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত মা খালেদা বেগম। ছোট্ট একটি ঘর। এটিকে আসলে ঘর বললে ভুল হবে। এ যেন কবি জসীমউদ্দীনের কবিতায় বর্ণনার সেই ঘরটি। চারপাশে প্লাস্টিকের বেড়া, ওপরে নারকেল পাতার ছাউনি। এর ভেতরেই খালেদার কষ্টের সংসার।

আমরা সামনে যেতেই তিনি বলেন, ‘আপন চাচা আমার ছেলেটাকে দালালের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।’ খালেদা বেগম এখনো বুকভরা বিশ্বাস নিয়ে অপেক্ষায় আছেন, ছেলে ফিরবে। তিনি বলেন, ‘চারদিকে শুধু শুনি সাগরে ট্রলারডুবির কথা। এই কথা শুনলেই বুকটা ফেটে যায়, চোখের পানি আর থামে না। তবু মনে হয় আমার ছেলেটা আমার বুকে ফিরে আসবে।’ 

ওসমানের শোকে হাসপাতালে মা

বাহারছড়া ইউনিয়নের বড়ডেইল ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. আমিনের ১৬ বছর বয়সী ছেলে মো. ওসমান। স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করত। পরিবারের সদস্যরা জানায়, অল্প বয়সেই বিদেশ যেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল সে। এই সুযোগে দালালচক্র তাকে প্রলুব্ধ করতে থাকে। তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পুরো পরিবার এখন শোক আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। 

ছেলের নিখোঁজ হওয়ার শোক সইতে না পেরে ওসমানের মা আনোয়ারা বেগম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বাবা আমিন বলেন, ‘গত ৪ এপ্রিল থেকে আমার ছেলে নিখোঁজ। অনেক জায়গায় খুঁজেছি, কোথাও পাইনি। পরে সন্দেহ করি, কেউ তাকে মালয়েশিয়া যাওয়ার ট্রলারে তুলে দিয়েছে। পরিবারের সবাই তখন দিশাহারা হয়ে পড়ি।’

তিনি আরো বলেন, ‘৯ এপ্রিল শুনতে পাই সাগরে একটি ট্রলার ডুবে গেছে। সেখানে ৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তোফায়েল নামে আমাদের এলাকার একজন ছিল। সে ফিরে এসে জানায়, ওই ট্রলারে আমার ছেলে ওসমানও ছিল। এক দিন পর্যন্ত তারা একসঙ্গে ভাসছিল। পরে একটি ঢেউ এসে তাদের আলাদা করে দেয়। এরপর থেকে আর আমার ছেলের কোনো খোঁজ নেই।’