Image description

জার্মানির বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সেলর (রাজনৈতিক) ও দূতালয় প্রধান হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তানভীর কবির। প্রায় দেড় বছর আগে তাকে বার্লিন থেকে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে কাউন্সিলর পদে বদলির আদেশ দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সরকারি আদেশ তামিল করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি তানভীর।

 

এমন অবস্থায় বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় পরিদর্শনে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব ও পশ্চিম দপ্তরের সচিব ড. নজরুল ইসলাম।

 

এদিকে তানভীর কবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগোর পাহাড় জমা হয়েছে। দূতাবাসে স্থানীয় ভিত্তিক কর্মচারী ও হোম-বেসড কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা, একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকে খুশি করতে এক কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা, দ্বিতীয় বিয়ে করা এবং একটি বইমেলায় জার্মান নারী কর্মচারীকে হেনস্তা করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের প্রমাণ এশিয়া পোস্টে হাতে এসেছে।

 

এর আগে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার ব্যক্তিগত ইচ্ছায় তানভীরকে ২০২১ সালে জার্মানির বার্লিন দূতাবাসে তৎকালীন সরকার নিয়োগ দেয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, একজন কূটনীতিক সাধারণত কোনো মিশনে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। সে হিসাবে বার্লিনে কবিরের মেয়াদ পূর্ণ হয় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। সে বছরের ২১ নভেম্বর তাকে বার্লিন থেকে ইসলামাবাদে বদলি করে আদেশ জারি করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে এই আদেশ মেনে সেখানে যোগ দেননি তিনি। উল্টো বার্লিনে থেকে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে ২৪ নভেম্বর পররাষ্ট্রসচিব বরাবর আবেদন করেন তানভীর।

 

বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাস নিজস্ব চ্যান্সেরি ভবনের কাজের জন্য তার সেখানে দায়িত্ব পালন প্রয়োজনীয় উল্লেখ করে ওই আবেদন করেছিলেন তানভীর। তবে তার সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর এক ফ্যাক্স বার্তার মাধ্যমে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তানভীরকে সেই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়। তবু বার্লিন ছেড়ে ইসলামাবাদ যাননি তানভীর।

 

সূত্র জানিয়েছে, জার্মানিতে অবস্থানরত একটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের প্রবাসী উইংয়ের একজন সদস্য, সেই রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং বার্লিন দূতাবাসের বর্তমান রাষ্ট্রদূত জুলকার নাইন তাকে বদলির পরও দূতাবাসের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্রিয় সহায়তা করছেন।

 

সবশেষ গত ২০ জানুয়ারি পৃথক আরেক আদেশে তানভীর কবিরকে ঢাকায় বদলি করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (সংস্থাপন) নওরিদ শারমিন স্বাক্ষরিত এক আদেশে তানভীরকে আগামী জুলাইয়ের মাঝে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করতে বলা হয়।

 

তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, ঢাকায় ফিরে আসার এই আদেশও বাতিল করতে ইতোমধ্যে তোড়জোর শুরু করেছেন তানভীর। ঢাকায় যোগদান না করে বার্লিনে থেকে যেতে ইতোমধ্যে তদবির শুরু করেছেন তিনি।

 

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের মহাপরিচালক আবুল হাসান মৃধা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বদলির আদেশ হওয়ার পরও নানা কারণে বিদেশি মিশনগুলোতে থাকা কর্মকর্তা বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ না-ও দিতে পারেন। এটা খুবই স্বাভাবিক এবং নানা কারণ থাকে। যেমন কোনো দেশে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভ্রমণ থাকলে রাষ্ট্রদূত কর্মকর্তাকে না-ও ছাড়তে পারেন। কোনো কর্মকর্তার পড়াশোনার বিষয় থাকতে পারে। এ ধরনের নানা ‘ফ্যাক্টর’ কাজ করে।’

 

বদলির আদেশ হলে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদানের সাধারণ সময়সীমার বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল হাসান বলেন, ‘নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। একেক ক্ষেত্রে একেক রকম সময় লাগতে পারে।’

 

যেসব অভিযোগ তানভীরের বিরুদ্ধে

 

তানভীর দূতাবাসে স্থানীয় ভিত্তিক কর্মচারী ও হোম-বেসড কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি অনুসরণ করছেন এবং হেইট প্রিচিং (ঘৃণা বিদ্বেষ) চর্চা করছেন। দ্বিতীয় বিবাহের অভিযোগে তার রোষানলে পড়ে মো. শরীফ হোসেন নামে একজন স্থানীয় ভিত্তিক বাংলাদেশি কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন, যিনি গত আট বছর ধরে ওই মিশনে কর্মরত ছিলেন।

 

জানা গেছে, ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকে খুশি করতে তানভীর এই কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেন। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তাকে ডিপোর্টেশনের ভয় দেখিয়ে, আইনজীবী এনে একটি কক্ষে আটকে রেখে জোরপূর্বক অব্যাহতিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়। স্বাক্ষরিত পত্রে তাকে চার মাসের নোটিশ দেওয়া হলেও দুই মাসের বেতন দেওয়া হয়। তানভীর জার্মানি থেকে ফেরত গেলে ওই কর্মচারী চাকরি ফেরতের আবেদনসহ আদালতে দূতাবাসের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা ভাবছেন বলে জানান। জোর করে অব্যাহতিপত্রে সই করিয়ে নেওয়ার অডিও প্রমাণ সংরক্ষণ করে রেখেছেন ওই কর্মচারী।

 

এ ছাড়া ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দূতাবাসে কর্মরত একজন সিনিয়র বাংলাদেশি কর্মচারীকেও চাকরিচ্যুত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে রাষ্ট্রদূতের হস্তক্ষেপে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

 

আরও অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে কর্মস্থলে ফিরে আসা এক জার্মান নারী কর্মচারীকেও চাকরিচ্যুত করার জন্য তানভীর নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

 

দূতাবাসের কমার্শিয়াল উইংয়ে কর্মরত একজন জার্মান নারীর সঙ্গে অপেশাদার আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে তানভীরের বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় তানভীর ওই জার্মান নারীকে তার ও দূতাবাসের গাড়িচালকের মেলার ভিজিটর টিকিট তৈরি করার পরিবর্তে কেন তাকে ভাউচার কোড দেওয়া হলো, সে জন্য মেলায় আসা শত শত দর্শনার্থীর সামনে অপমানিত করেন। মেলায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে এরূপ আচরণ ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। ভুক্তভোগী নারী রাষ্ট্রদূতের কাছে অভিযোগ করলেও রাষ্ট্রদূত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ওই নারী বাংলাদেশে ন্যাশনাল বুক সেন্টার, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেন।

 

রাষ্ট্রদূত বরাবর ওই স্থানীয় নারীর করা অভিযোগের কপি রয়েছে এশিয়া পোস্টের কাছে।

 

মন্ত্রণালয় থেকেও কোনো উত্তর না পেয়ে ওই নারী পুরো বিষয়টি জার্মান ফেডারেল ফরেন অফিসে জানান। ফেডারেল ফরেন অফিস ওই নারীর সঙ্গে একাধিকবার এ বিষয়ে যোগাযোগ করে। ন্যাশনাল বুক সেন্টারের তৎকালীন পরিচালক আফসানা বেগমও এ ব্যাপারে তানভীরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদূতের কাছে অভিযোগ করেন।

 

যোগাযোগ করা হলে জার্মানির বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (রাজনৈতিক) ও দূতালয় প্রধান তানভীর কবির দাবি করে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বার্লিন থেকে আমাকে বদলি করা হলে, বদলি বাতিলের আবেদন করি। প্রথমে মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাক্ষান করলেও পরে পুনর্বিবেচনা করায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তেই অদ্যাবধি আমি বার্লিনে অবস্থান করছি। এ বছর জানুয়ারিতে দেওয়া ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের আদেশ অনুসারে আগামী জুলাইয়ের মধ্যে আমি ঢাকায় ফিরব।’

 

রাষ্ট্রদূতের কাছে একাধিক কর্মী আপনার বিরুদ্ধে অসদাচরণ এবং দূতাবাসের এক জার্মান নারী কর্মচারীকে হেনস্তার অভিযোগ করেছেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘একাধিক নয়, একজন নারী অভিযোগ করেছেন। সেটিও তদন্ত সাপেক্ষে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আমি দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেছি, কাউকে হেনস্তা করিনি।’

 

এমন প্রেক্ষাপটে বার্লিনের বাংলাদেশ দূতাবাস পরিদর্শনে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব ও পশ্চিম দপ্তরের সচিব ড. নজরুল ইসলাম। আগামী ১৩ মে বার্লিনের উদ্দেশে তার ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে। এই পরিদর্শনের উদ্দেশ্য তানভীর কবিরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত কি না, এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি নজরুল ইসলাম।

 

ড. নজরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি আইজিও (ইন্সপেক্টর জেনারেল অপারেশন্স)। আমার কাজ হচ্ছে মিশন ইন্সপেকশন করা। আমি মিশন ইন্সপেকশনে যাচ্ছি। ওই বিষয়টি (তানভীর) মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং ‘কনফিডেন্সিয়াল’। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে আছে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রণালয় যা করার করবে। আমার সফরের সঙ্গে এটার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।