Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় গত ১২ ফেব্রুয়ারি। ওই নির্বাচনে কী ধরনের ত্রুটি, বিচ্যুতি, সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ ছিল-তা এখন খুঁজছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে নির্বাচনের সময়ে সংঘটিত সুনির্দিষ্ট ঘটনাকে ঘিরে নিয়ে নয়, আইনি ও পদ্ধতিগত যেসব সমস্যা ও দুর্বলতা রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সেই প্রস্তাবনাও তৈরি করা হচ্ছে। ইসির অনুসন্ধানে এ পর্যন্ত অন্তত ২৫ ক্যাটাগরিতে প্রায় একশ সমস্যা উঠে এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-যোগ্য রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সংকট, আচরণবিধি ভঙ্গের প্রবণতা ও তা ঠেকাতে আইন প্রয়োগে শিথিলতা, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, বাস্তবে কার্যক্রম নেই এমন নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে আধিক্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে দলীয় মনোভাব। ইসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আরও জানা গেছে, নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিধান না থাকার বিষয়টি সমস্যা হিসাবে উঠে এসেছে ইসির অনুসন্ধানে। অথচ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনীর মাধ্যমে এ বিধান বাতিল করে এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন। এছাড়া নির্বাচন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে (ইএমএস) কারিগরি দুর্বলতার বিষয় উঠে এসেছে। এতে বড় ধরনের সাইবার অ্যাটাক বা সার্ভার থেকে তথ্য চুরির ঝুঁকির আশঙ্কা করা হয়েছে। 

ইসি জানিয়েছে, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। তবে নির্বাচনি আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, রাজনৈতিক দল নিবন্ধন, ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন ব্যয় ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে এখনো কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নির্বাচনের এসব ত্রুটি, সমস্যা, চ্যালেঞ্জ এবং তা প্রতিরোধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার-সেই সংক্রান্ত সুপারিশ পরবর্তী কমিশনের জন্য রেখে যাবে এই ইসি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিবেদনে এসব বিষয় উল্লেখ করা হবে। 

সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করতে কয়েকটি মিটিং-কর্মশালা করছে ইসি। সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের নির্দেশনার মধ্যেই ইতোমধ্যে একটি কর্মশালা হয়েছে হবিগঞ্জের ব্যয়বহুল একটি পাঁচতারকা হোটেলে। ইসির কর্মকর্তারা এটিকে ‘আনন্দ ভ্রমণ’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। এছাড়া আগামী সপ্তাহে ঢাকা এবং পরে কক্সবাজারেও কর্মশালার আয়োজন করতে যাচ্ছে ইসি। এসব কর্মশালায় মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের বিষয় জড়িত থাকায় তা মেটানো হচ্ছে ইসির দুটি প্রকল্প থেকে। একই অনুষ্ঠানের খরচ দুই প্রকল্প থেকে মেটানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার যুগান্তরকে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে তফসিল ঘোষণার আগে এবং তফসিল ঘোষণা থেকে ভোট পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি। আরও কী ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতির সমাধান করা দরকার সেগুলো খতিয়ে দেখছি। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। কর্মশালায় দুই খাত থেকে ব্যয়ের বিষয়ে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, অনুষ্ঠান আয়োজনে আর্থিক অনিয়ম হলে অবশ্যই অডিট আপত্তি আসবে। তখন বিষয়টি দেখা যাবে।

রেওয়াজ অনুযায়ী, প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে ইসি। এতে ওই নির্বাচনের বিভিন্ন ধরনের পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা কত ভোট পেয়েছে-সেটাও প্রকাশ করা হয়। এবার নির্বাচনি প্রতিবেদন শুধু পরিসংখ্যানভিত্তিক নয়, ইসির অনুসন্ধানে যেসব বিষয় উঠে আসছে, সেগুলোও উল্লেখ করতে চায় ইসি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে জমা হওয়া অভিযোগ নিষ্পত্তি না করেই ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করে কমিশন। নিয়ম অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের পর নির্বাচনি অভিযোগ তদন্তের এখতিয়ার ইসির থাকে না।

সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের করা সুপারিশ ইসি গ্রহণ করলে অনেক সমস্যার সমাধান হতো বলে মনে করেন ওই কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে আমরা নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু ইসি প্রস্তাবের আংশিক গ্রহণ করেছে। এ কারণে নির্বাচন ব্যবস্থায় অনেক ত্রুটি রয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তাব ছিল নির্বাচনের ফলাফল ইসিকে প্রত্যয়ন করতে হবে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে। কিন্তু তারা অভিযোগের তদন্ত না করে তড়িঘড়ি করে ফলাফল প্রকাশ করেছে, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার যুগান্তরকে বলেন, সংস্কার কমিশনের অনেক সুপারিশ আমরা গ্রহণ করেছি। কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের জন্য ঐকমত্য কমিশনে পাঠিয়েছি। 

যেসব ত্রুটি-চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইসির সক্ষমতা ও কার্যপরিধির অনেক দুর্বলতা ও ত্রুটি উঠে এসেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের ব্যয় পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা; নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় অভিযোগ ইসির দৃষ্টিগোচর ও প্রতিকার না হওয়া; নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, বিশেষ করে প্রতিপক্ষ ও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বন্ধ করতে না পারা; পরিবহণের সময় ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনি মালামাল অদলবদল হওয়া; ব্যালট পেপারসহ সংবেদনশীল মালামালে ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকা; ইসির জনবল সংকট ও পদ আপগ্রেডেশন না হওয়া এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে (ইএমএস) কারিগরি দুর্বলতা। সংশ্লিষ্টরা জানান, এ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সাইবার অ্যাটাক বা সার্ভার থেকে তথ্য চুরির ঝুঁকি রয়েছে। বেসরকারি কোম্পানি এটি দেখভাল করে। 

সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সংগ্রহ ও পরিবেশনে যেসব ত্রুটি চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-কেন্দ্র থেকে ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব এবং কেন্দ্র থেকে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছানোর মাঝপথে ফল পরিবর্তনের সুযোগ। ফলাফল তৈরি ও পাঠানোর ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ডাটা এন্ট্রিতে ভুল হওয়া, নেটওয়ার্ক সমস্যা ও অনিরাপদ মাধ্যমে তথ্য প্রেরণ। ফলাফল ও নির্বাচনি ডকুমেন্ট সংরক্ষণের জন্য ইসির নিজস্ব মানসম্মত গুদাম না থাকা। বিভিন্ন উৎসে ফলাফলের ভিন্ন তথ্য এবং ফলাফল দেরিতে আপডেটের কারণে গুজব ছড়িয়ে পড়া।

প্রশাসনের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে-রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগে যোগ্য ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের অপ্রতুলতা; আচরণবিধি প্রতিপালনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট স্বল্পতা এবং আইন প্রয়োগে শিথিলতা; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যের মধ্যে দলীয় মনোভাব থাকা এবং আইন-বিধি সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞান না থাকা।

ভোটার তালিকা ও ভোটকেন্দ্র স্থাপনে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি পাওয়া গেছে, তার মধ্যে রয়েছে-অল্প সময়ে হালনাগাদ প্রক্রিয়া এবং জনবল স্বল্পতা ও অদক্ষতা; হালনাগাদ কার্যক্রমের যন্ত্রাংশের স্বল্পতা; মৃত ভোটারের নাম নিয়মিত কর্তন না করা; এনআইডি সার্ভারের সঙ্গে পাসপোর্ট ও শিক্ষা বোর্ড ও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের মধ্যে রিয়েল টাইম সংযোগ (এপিআই) না থাকা। অন্য যেসব বিষয় উঠে এসেছে, এর মধ্যে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন প্রক্রিয়া অন্যতম। নির্বাচন এলেই নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দলের আধিক্য বাড়ে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো আরপিওর শর্ত পূরণ করছে কি না-তা খতিয়ে দেখে না ইসি। এছাড়া নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয় খতিয়ে দেখা, নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়ার মতো কার্যক্রম মনিটরিং করে না কমিশন। এমনকি এবার রাজনৈতিক দল নিবন্ধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে পড়ে ইসি। 

মাঠ কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ে হবিগঞ্জে একটি পাঁচতারকা হোটেলে সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুজন নির্বাচন কমিশনার, ইসির সিনিয়র সচিবসহ ৭০ জন অংশ নেন। ওই কর্মশালায় অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা সেখানকার আলোচনার বিষয়ে জানান, অনেক ব্যক্তি উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার ভোটার স্থানান্তর করেন। নির্বাচন সামনে রেখে তারা এ কাজটি করে থাকেন। তাই ভোটার স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা দরকার। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন কার্যক্রম শুধু নির্বাচনের আগেভাগে না করে, বছরব্যাপী করা যেতে পারে। তারা জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অনেকগুলো ব্যালট বাতিলের বিষয়টিও সেখানে উঠে আসে। ভোটার এডুকেশনের ওপর জোর দেন তারা। 

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনি অভিজ্ঞতায় আমরা অনেক নতুন নতুন বিষয় পাচ্ছি। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, এখনো অনেক বিষয় সংশোধন ও পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে বা বিদেশে কোথাও প্রশ্ন ওঠেনি। সামনের নির্বাচনগুলো আরও কীভাবে ভালো করা যায়, সেই উদ্দেশ্যে আমরা বিগত নির্বাচন পর্যালোচনা করছি।