২০১৩ সালে ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ উপলক্ষে আমার ডিউটি ছিল সকাল থেকে। অফিস থেকে একটা সিএনজি অটোরিকশা দিয়েছিল। কাঁঠালবাগানের বাসা থেকে কয়েকটি এলাকা ঘুরে সকাল ১০টার দিকে প্রেস ক্লাবে পৌছান। সেখান থেকে হেঁটে মতিঝিল পৌছাই ১১টার দিকে। ই
সলামী ঐক্যজোট এবং হেফাজতে তৎকালীন নেতা মুফতি ফয়জুল্লাহর সহায়তায় ১১টার দিকে মঞ্চ থেকে শ'খানেক গজ দূরে সোনালী ব্যাংকের সামনে রাস্তার ডিভাইডারে বসি। বক্তাদের বক্তব্য নিচ্ছিলাম। (স্মৃতি থেকে লিখছি, তাই কিছু ভুলভ্রান্তি হতে পারে) সেদিন তীব্র গরম ছিল। গরমে টিকতে না পেরে আধাঘণ্টা পর রাস্তার দক্ষিণপাশের ভবনের সামনে বসি। সেখানে বিনামূল্যে পানির বোতল দেওয়া হচ্ছিল।
সেখান থেকে বেরিয়ে নটর ডেম কলেজ ঘুরে বাফুফে ভবন হয়ে পল্টন থানা পর্যন্ত যাই। সেখানেও মাইক ছিল। সেই যুগে আমার স্মার্টফোন ছিল না। পল্টন থানার সমানে আসার পর প্রথম জানতে পারি, বায়তুল মোকাররম এলাকায় মারামারি হয়েছে। তবে বায়তুল মোকারম দক্ষিণ গেটে যে, ভঙ্গকর পরিস্থিতি তা আমার ধারনাতেও ছিল না। তখন শুনতে পাই, হেফাজতে সমাবেশে আসা কিছু লোক আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের দিকে 'হামলা' করতে যাচ্ছিল, তাদের গুলি করেছে পুলিশ।
বেলা দুইটার দিকে উত্তর গেটে এসে দেখি, যুদ্ধের মত লন্ডভন্ড অবস্থা। মসজিদের সিঁড়ি বিপরীতে দোকান সব জায়গা আগুন জ্বলছে। এতে আইএফআইসি ব্যাংকের গলি দিয়ে বিজয়নগরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু পুলিশের টিয়ার সেল ও রাবার বুলেটে না পেরে আবার মতিঝিলের দিকে চলে যাই। সেখানে তখনও বক্তৃতা চলছিল। এর কিছু আগেই জোহরের নামাজ হয়েছিল। এরপর সমাবেশে আগত লোকজন চিড়া, মুড়ি, কলা খাচ্ছিলেন।
বিকেল চারটা দিকে অফিস থেকে ফোন করে বলা হয়, সমাবেশের নিউজ অফিসে এসে লিখে ফেলতে। আমি জানাই, আহমদ শফী আসেননি তখনও সমাবেশে। উনার বক্তব্য ছাড়া কী লিখব? তখন অফিস বলল, তাহলে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো।
যতদূর মনে পড়ে আসরের জামাত শুরু হয় বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে। এ সময়ে দেখি তিনটি লাশ পল্টনের দিক থেকে মতিঝিলের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মিছিল করে। মিছিলকারীরা জানান, এই ব্যক্তিরা পল্টন মোড়, জিপিও এবং দক্ষিণ গেইটে নিহত হয়েছেন। আরও কয়েকজন নিহত বা গুলিবিদ্ধ রয়েছেন, যাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এই তিনজন স্পট ডেড। পুলিশকে লাশ নিতে না দিয়ে মতিঝিল নেওয়া হচ্ছে।
তখন চরম উত্তেজনা চারদিকে। হেফাজত নেতা আতাউল্লাহ আমীন জানালেন, শিগগির লালবাগ থেকে রওনা হবেন আহমদ শফী। আহমদ শহী কিছুক্ষণের মধ্যে আসবেন- এই রকম ঘোষণা কয়েকবার আসে মঞ্চের মাইক থেকে।
আমি জানতাম, মাগরিবের আজানের সঙ্গে সমাবেশ শেষ হবে। নেতারা আমাকে তাই বলেছিলেন। কিন্তু পৌনে সাতটার দিকে মাইক থেকে ঘোষণা আসে, আহমদ শফীকে পুলিশ আসতে দিচ্ছে না। তাই অনির্দিষ্টকাল অবস্থান চলবে।
অফিসকে জানানোর পর, আমাকে বলা হলো দ্রুত অফিসে এসে ফার্স্ট এডিশনের জন্য লিখে ফেলতে হবে ৯টার মধ্যে। আমি তখন, হেঁটে বিজয়নগর পৌছাই। সেখান থেকে অফিসে যাই রিকশায়। এতে রাত সাড়ে আটটা বেজে যায়। ফোনে ফোনে খবর নিচ্ছিলাম। অফিসে এসে জানতে পারি, ঢাকায় নিহত হয়েছেন ৬ জন বা ৭ জন।
ফাস্ট এডিশনের রিপোর্ট লিখতে লিখতে সাড়ে ১০টা বেজে যায়। তণ আওয়ামী লীগ বিটের সহকর্মী সাংবাদিকদের কাছ থেকে জানতে পারি, রাতের মধ্যে মতিঝিল খালি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে দিনের প্রথম খাবার খাই।
সাড়ে ১১টার দিকে আবার পৌছাই দৈনিক বাংলায়। সেখানে গিয়ে পুলিশ এবং র্যা বের সঙ্গে বিজিবিকে দেখাতে পাই। দিনের বেলায় বিজিবি ছিল না। র্যা ব সাংবাদিকদের মতিঝিলের দিকে যেতে দিচ্ছিল না। অপেক্ষা আর হাঁটাহাঁটি করতে করতে রাত আড়াইটা বাজে। এর মধ্যে খবর পাই, কাকরাইলে ইসলামী ব্যাংকে সামনেও কয়েকজন নিহত হয়েছেন পুলিশের গুলিতে।
আড়াউটার দিকে পুলিশ-র্যা ব অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে আমাকেও ফকিরাপুলের দিকে পাঠিয়ে দেয়। এ সময় আমি দেখতে পাই, লম্বা লম্বা বাঁশ এনে সাদা পোশকধারী পুলিশ মাইকগুলোর তার টেনে ছিঁড়ছে। এর মাধ্যমে মাইক বন্ধ হয়। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে কারেন্ট চলে যায়। আধাঘণ্টা বা ২০ মিনিটের মধ্যে কারেন্ট ফিরে আসে। সেই সময়ে শত শত সাউন্ড গ্রেনেডে শব্দ শুনি। সেই শব্দের কারণে গুলি চললেও, তা শোনার সুযোগ ছিল ফকিরাপুল থেকে।
রাত তিনটার দিকে সাংবাদিকদের বলা হয়, এবার শাপলার দিকে যেতে পারেন। পুলিশ ও র্যােবের বেষ্টনীর মধ্যে অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে হাঁটা শুরু করি। আমার সঙ্গে ছিলেন সমকালের সহকর্মী নাহিদ তন্ময় আপু। আমিসহ কয়েকজন সাংবাদিক অতিউত্তেজনায় ডিভাইডারের আরেক পাশে গিয়ে দ্রুত হেঁটে মতিঝিলের দিকে এগোতে থাকি।
দৈনিক বাংলা থেকে মতিঝিল যাওয়ার পথে, দিলকুশার যে রাস্তার পর যে পেট্রোল পাম্প রয়েছে, সেখানে আধো অন্ধকারে দেখতে পাই, সেই গলি থেকে অন্তত তিনজনকে দুই হাত এবং পা ধরে তুলে দুইজন করে র্যা ব সদস্য নিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, তাঁরা নিহত হয়েছেন।
আমি সেদিকে এগোনোর ভুল করি। তখন একজন র্যাযব সদস্য এত জোরে লাঠি ঘোরান, সেটা আমার কপালে লাগলে হয়ত বেঁচে থাকতাম না। 'আমি সাংবাদিক, সাংবাদিক' এ চিৎকার করতে করতে পিছু হটতে থাকি। আমার কিছুটা পেছনে ছিলেন, এটিএন বাংলার একজন ক্যামেরা জার্নালিস্ট। ক্যামেরা দেখার পর, র্যা ব আমার বদলে সেই ক্যামেরা জার্নালিস্টকে বেদম পেটাতে থাকেন।
আমি তখন দেখি ডিভাইডারের ওপাড়ে র্যাাব ও পুলিশের সেই বেস্টনী। দৌড়ে সেখানে এসে তনু আপার আশ্রয় নিই। সেখানে প্রথম র্যা বের (বিখ্যাত!) কর্ণেল বা লেফট্যানেন্ট কর্ণেল জিয়াউল আহসানকে (যিনি পরবর্তীতে মেজর জেনারেল হন) দেখি। উনি সাংবাদিকদের খুব হেসে হেসে বলছেন, কীভাবে 'হুজুররা' এক ধাওয়াতে পালিয়েছে।
শাপলা চত্বরে গিয়ে দেখি, ঠিক পশ্চিম পাশে চারটি মরদেহ। একজন বৃদ্ধ মানুষের লাশ নীল রঙের পলিথিনে ঢাকা। তারা সম্ভবত, দুপুরে পল্টন, জিপিও এলাকায় নিহত হয়ছিলেন। একজনের মরদেহ খাটিয়ার ওপরে ছিল। তার মানে দুপুরে নিহত হয়েছিলেন।
এরপর আমি এবং তনু আপু সোনালী ব্যাংকে সিঁড়িতে যাই। সেখানে শুধু জুতা আর জুতা ছিল। তখন পুলিশ আবিস্কার করে, সিঁড়ি নীচে অনেক আশ্রয় নিয়েছে। আমি সেদিন সেই কিশোরদের চোখে মৃত্যু ভয় দেখেছিলাম। কয়েকজন পুলিশ মারাত্মক মারমুখী ছিল আশ্রয় নেওয়া মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতি মারাত্মক মারধর শুরু লাঠিপেটা শুরু করে। তবে কয়েকজন পুলিশ সদয় ছিলেন। তারা এই শিক্ষার্থীদের বেরে হয়ে হাত তুলে ইত্তেফাকের দিকে রাস্তা দিয়ে যেতে বলে।
সোনালী ব্যাংকে সিঁড়িটি পানিতে ভেজা ছিল। মানে জলকামান ব্যবহার করা হয়েছিল। লম্বা এবং প্রশস্থ সিঁড়িটি সেখানে মোড় দিয়েছে, সেখানে দুইজনের মরদেহ দেখি। একটি ছিল ১২-১৩ বছর বয়সী কিশোরের। মোবাইলের আলো ফেলে দেখি, প্যান্ট এবং শার্ট পরা ছেলেটির গলা থেকে বুক পর্যন্ত রাবার বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। আরেকটি ছেলে উল্টো হয়ে নিথর পড়ে ছিল। পুলিশকে বলেছিলাম, একটু চেষ্টা করে দেখবেন ছেলেগুলো বেঁচে আছে কী না?
সেই রাতে আমি মোট ৯টি মরদেহ দেখি। যাদের চারজন দিনের বেলায় নিহত হয়েছিলেন বলে ধারনা করি। বাকিরা রাতের অভিযানে নিহত হন। আমার চোখে দেখা। এর বাইরে আরও অনেক কিছু থাকতে পারে। কারণ, শাপলাচত্বরের উত্তর, পূর্ব এবং দক্ষিণ পাশে আমি যেতে পারেনি। শুধু পশ্চিম পাশ দেখেছি। তো কোনো সাংবাদিক, সম্পাদক যদি বলেন, সেই রাতে একটি লাশও দেখেনি, তাহলে সে মিথ্যা বলছে। নয়ত ঘটনাস্থলে যায়নি।
মতিঝিল থেকে সকাল ৭টার দিকে বাসায় আসি। এরপর খবর পাইম, মতিঝিল থেকে পিছু হটার সময় সংঘর্ষে সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী এলাকায় সকালে অনেকে নিহত হয়েছে। পরে তো ব্রাক্ষণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, হাটহাজারীসহ কয়েক জায়গায় অনেকে নিহত হন।
হেফাজ, স্থানীয় সাংবাদিক ও সংবাদপত্র সূত্রে আমার হিসাব ছিল, ৫ এবং ৬ মে সারাদেশে ৬২ জন নিহত হয়েছেন। ঢাকার মতিঝিল, পল্টন, জিপিও, কাকরাইল, যাত্রাবাড়ী, সাইনবোর্ড মিলিয়ে সংখ্যাটি ৩২ এর এর কম হবে না।
তবে অবশ্যই একাধিক নিখোঁজও রয়েছেন। (এত বছরে না ফেরায়, তারা নিহত হয়েছেন বলে মনে করি)। এর একজন আমার পরিচিত। আজো নিখোঁজ।
সে থাকত আমাদের ময়মনসিংহের নয়াপাড়ায়। তাঁর বড় ভাইয়ের নাম নুরুল ইসলাম। তাদের বাবা খুন হয়েছিলেন ১৯৯৮ বা আশেপাশের বছরে। তারা তখন নান্দাইল ছেড়ে আমাদের এলাকায় এসেছিল। আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। সেই সময়ে নুরুল ইসলামের ভাই ছোট্ট শিশু ছিল। পরে হাফেজি মাদ্রাসায় পরে, কওমিতে ভর্তি হয়েছিল। ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে এসেছিল। সে ছেলেকে আর কখনও পাওয়া যায়নি। লাশও নয়।
৬২ জন নিহতের তথ্য, সেই ২০১৩ সালেও নিউজে ছোট্ট করে লিখেছিলাম। সাংবাদিক আজাদ মজুমদারের মাধ্যমে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাতকার দিয়েছিলাম। তাদেরকে এই পুরো ঘটনা বলেছিলাম।
-রাজিব আহমেদ