চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের গোডাউনে পরিণত হয়েছে নগরীর বায়েজিদ এলাকা। পাহাড়ঘেরা এ এলাকার ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে অবৈধ অস্ত্রের বিশাল মজুত গড়ে তুলেছে সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো। তারা অবৈধ অস্ত্রের কারবারের পাশাপাশি অস্ত্র ভাড়া এবং নিজেরাই ব্যবহার করে থাকে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে। গত দেড় বছরে বায়েজিদ ও এর আশপাশের এলাকা থেকে সাব-মেশিনগান (এসএমজি), বিদেশি পিস্তল, পাইপগান এবং বিপুল পরিমাণ তাজা গুলি উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক অভিযানে মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসীরা ধরা পড়লেও, অভিযোগ রয়েছে নেপথ্যের গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। তবে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, বায়েজিদ এলাকায় প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানগুলোতে প্রচুর অস্ত্র উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে যাদের নাম উঠে আসছে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
সিএমপির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বায়েজিদের সন্ত্রাসীরা এখন কেবল গোলাগুলিতেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা ‘হোয়াইট কলার ক্রাইম’ বা ছদ্মবেশী অপরাধের দিকে ঝুঁকছে। প্রবাসে বসে হোয়াটসঅ্যাপ বা ইন্টারনেটের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির নেটওয়ার্ক। অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ এলাকায় পুরোনো সন্ত্রাসীরাই নতুন খোলসে অবতীর্ণ হয়েছে। তারা প্রথাগত অপরাধের বাইরে গিয়ে যুক্ত হয়েছে অস্ত্র কারবার ও অস্ত্র ভাড়া দেওয়ার মতো অপরাধে। দেশ-বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী, আন্তজেলা অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা গডফাদাররাই নিয়ন্ত্রণ করছে অস্ত্রের বাজার। তাদের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের প্রধান উৎস হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারের দুর্গম সীমান্তের কুখ্যাত ‘ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল’। অন্ধকার এ জগতে তৈরি হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার হয়েই প্রবেশ করছে রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজারে। এ তিন জেলার কমপক্ষে ১৫টি রুট হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে অবৈধ অস্ত্র। পরে তা বিভিন্ন হাত বদল হয়ে চলে আসে বায়েজিদ এলাকার অস্ত্র কারবারিদের হাতে। বায়েজিদ এলাকার অস্ত্র কারবারে ঘুরে ফিরে উঠে আসছে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ ও তার অনুসারী ছোট সাজ্জাদের নাম।
পুলিশের তথ্যমতে, বায়েজিদ ও আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজি এবং আধিপত্য বিস্তারের জন্যই সাজ্জাদ সিন্ডিকেট গড়ে তোলে অবৈধ অস্ত্রের বিশাল মজুত। কেবল নির্দিষ্ট এ গ্রুপ নয়, বায়েজিদ এলাকাকে রুট হিসেবে ব্যবহার করছে আন্তজেলা অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেটও। গত ২৯ ও ৩০ এপ্রিল বায়েজিদ লিংক রোড, ওয়াজেদিয়া ও ড্রিমল্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, ২৮ রাউন্ড গুলি ও চায়না রাইফেলের গুলিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া অস্ত্র ব্যবসায়ীরা বৃহত্তর চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কাছে অস্ত্র সরবরাহ করত দাবি পুলিশের। গত ১৮ এপ্রিল ইউএসএর তৈরি ৭.৬৫ ক্যালিবারের বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করা হয় সাইফুল ইসলাম নামে এক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে।
তিনি বায়েজিদের চালিতাতলী, অক্সিজেন ও মুরাদপুর এলাকায় অস্ত্র ব্যবসার নিয়ন্ত্রক। বায়েজিদ এলাকায় অস্ত্রের কারবারের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটি সামনে আসে চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি। চালিতাতলী বাজার এলাকায় পুলিশের এক বিশেষ অভিযানে অবৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডারের সন্ধান মেলে। সেখান থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে ছিল এসএমজি, বিদেশি পিস্তল, দেশীয় পাইপগানের সঙ্গে ৪৫৫ রাউন্ড তাজা গুলিসহ শর্টগানের কার্তুজ। বায়েজিদের অস্ত্র কারবারে যুক্ত রয়েছে কমপক্ষে ১৫টি গ্রুপ উপগ্রুপ। অস্ত্র কারবারের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে- সাইফুল ইসলাম ওরফে বার্মা সাইফুল, ইশতিয়াক হাসান ইমন, মহিউদ্দিন ফরহাদ, মিঠুন চক্রবর্তী, মো সবুজ ওরফে বার্মা সবুজ, মোবারক হোসেন ইমন, ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম, দিদারুল আলম চৌধুরী, মফিজ আলম ওরফে বাংলা মফিজ, সোহেল ওরফে গুটি সোহেল, মোহাম্মদ দুলাল ওরফে লাল দুলাল, পিস্তল হাসান, রাব্বি ওরফে কানা রাব্বি, হৃদয় ওরফে পিস্তল হৃদয়, বাবু ওরফে লেংড়া বাবু মতো সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে।