Image description
আবু সালেহ ইয়াহিয়া
 
আজ ৫ই মে। ঐতিহাসিক শাপলা গণ*হত্যা দিবস। এই নামে কেউ কোন দিবস পালন করছে কি? জানিনা। করলে ভাল।
৫ই মে ২০১৩- এর ঠিক ৩ মাস ১২ আগে আমি হাসিনার মেহমান বাড়িতে চলে যাই। জামিন হচ্ছিলনা। এদিকে নিয়মিত বিরতিতে রিমান্ড চলছিল। বাহিরের আপডেটের জন্য আরেক কারাবন্দী মজলুম সাজ্জাদ ভাই (ঢাকা মহানগর পশ্চিমের তখনকার সভাপতি) একটা রেডিও ম্যানেজ করেছিলেন। রেডিওর নিউজই ছিল আমাদের ভরসা। মাঝে মাঝে যুগান্তর পত্রিকা পড়ার সুযোগ হত। রেডিওতে সরকারি বয়ানে শুনছিলাম বাহিরে কি হচ্ছে। তাছাড়া কারও কোন আত্মীয় বা সংগঠনের কোন ভাই কারও সাথে সাক্ষাতে আসলে তার থেকেও বাহিরের আপডেট পেতাম আমরা। দেশের ইসলাম প্রিয় জনতার ঢাকা আসার আহবান, ঢাকার আসার পথে মোড়ে মোড়ে আওয়ামীলীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগ ও পুলিশলীগের সন্ত্রা*সীদের হাম*লা, একের পর এক শাহা*দাত, র*ক্তে ভিজে যাওয়া ঢাকার অলির গলির খবর পাচ্ছিলাম আমরা। রেডিওর সরকারি বয়ান আমরা আমাদের ভাষায় অনুবাদ করে বুঝে নিতাম। আর এমন ভয়া*নক পরিস্থিতে মজলুম ভাইদের সাথে বাইরে ময়দানে না থাকতে পারার জন্য মন অস্থির হয়ে ছটফট করছিল।
 
ফাইনালি শুনলাম, বেগম জিয়া সন্ধায় সবাইকে ঢাকার রাজপথে নেমে আসতে আহবান জানিয়েছেন। আশায় বুক বাধলাম-এইবার বুঝি কিছু একটা হবে। রাত পর্যন্ত খবর পেলাম-ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশ পথেবাঁধা মোকাবেলা করে জনতা শাপলা চত্বরে এসে জড়ো হচ্ছে। মোড়ে মোড়ে আমাদের ভাইয়েরা সরকারী বিভিন্ন বাহিনীকে সাহসের সাথে মোকবেলা করে তাওহীদী জনতাকে শাপলা চত্বরে পৌঁছাতে ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। ঢাকাবাসী বিভিন্ন ধরণের খাবার সামগ্রী নিয়ে মতিঝিল চলে যাচ্ছেন। রাতে অবস্থান করার প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। আমাদের ভাইয়েরা গেল। জড়ো হওয়া জনতার পাশে দাঁড়ালো।
 
খালেদা জিয়ার বক্তব্যে ঢাকাবাসী সাহস পেল। কিন্তু বিএনপির নেতা-কর্মী তাদের নেত্রীর বক্তব্য শুনলোনা। তারা ঘর থেকে বের হলোনা। তারা না আসায় সরকার ও পুলিশ বেশী সাহসী হয়ে উপস্থিত জনতাকে যে কোন উপায়ে দমন করে সমাবেশ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার পণ করলো। বেনজির বাহিনী মধ্যরাতে অন্ধকারের মাঝে ক্লান্ত শ্রান্ত সাধারণ তাওহীদী জনতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। নির্বিচারে গু*লি চালালো। শুট টু কি*ল। ফিল্ড থেকে লাইভ দিচ্ছিল দিগন্ত টিভি। রাতের মধ্যে ইনু দিগন্ত টিভি বন্ধ করে দিল। সাথে ইসলামিক টিভিও। ভোর না হতেই মতিঝিল শাপলা চত্বর জনমানবহীন হয়ে গেল। চারপাশে শুধু ছোপ ছোপ র*ক্ত, আহ*তদের ছিন্ন*ভিন্ন হওয়া শরীরের অংশ । এ যেন রক্ত*ভেজা জামা ও আর স্তুপকৃত জোতা-সেন্ডেলের নীরব নিথর এক যু*দ্ধ বিদ্ধ*স্ত স্থান। ভোর হওয়ার আগেই শত শত লা*শ রাজধানীর ডেমরাসহ বিভিন্ন বড় বড় ময়লার বাগাড়ে ডাম্প করে দেয়া হলো।
সম্মিলিতভাবে নামাজ পড়ে-দোয়া করে সেলের ভেতর অল্প সময়ের জন্য ঘুমাতে গিয়েছিলাম বুক ভরা আশা নিয়ে। সকালে ফজরের নামাজের জন্য জেগে উঠে শুনি-শাপলা খালি করে দিয়েছে বেনজির বাহিনী। মনটা আবারও শোকে বিহ্বল হয়ে গেল। হাসিনার কবল থেকে মজলুম দেশবাসীর মুক্তি আবারও প্রলম্বিত হলো। সেই সাথে আমাদের মুক্তিও।
 
২০০৬ এর ২৮ পক্টোবর থেকে শুরু করে পরবর্তীতে হাসিনা আমলে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যত ঘটনা রাজপথে ঘটেছে, তার প্রায় সবগুলিতেই স্বশরীরে ময়দানে থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন মহান মাবুদ। তবে জেলের ভেতরে থাকায় শাপলার ঘটনায় ময়দানে থেকে সাক্ষী হওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হলো। একই ভাবে এ ঘটনার মাত্র ২ মাস ৫ দিন আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩-তে আল্লামা সাঈদীর ফাঁ*সির রায়ের পর গণ*হত্যার ঘটনায়ও একই কারণে মাঠে থাকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
 
৫-ই মে শাপলা নিরীহ-নিরাপরাধ-সাধারণ মানুষ মে*রে, গণ*হত্যা করে রাষ্ট্রীয় গোলাম সর্দার বেনজিরের এক সাকসেসফুল অপারেশন করলো । হাফ ছেড়ে বাঁচলো হাসিনা। হাফ ছেড়ে বাঁচলো তারাও যারা শাপলায় যাবে বলেও যায়নি। তাদের ব্যাংক ব্যালেন্স নাকি ঠিকঠাক মত বড়ো হচ্ছিল। সময়ের আগেই জমা হয়ে যেত একাউন্টে। যাইহোক, এই ঘটনা ছিল জাতির সাথে, দেশের ইসলাম প্রিয় জনতার সাথে এক বড় রকমের মশকরা। (এটাই আসলে মোনাফেকি। তবে অনেকে রাগ করতে পারেন, তাই এটাকে আমি মোনাফেকি বললাম না, মাননীয় স্পীকার! ব্রাকেট দিয়ে দিলাম আর কি। )
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, খালেদা জিয়া কি শাপলায় লাশের স্তূপ দেখে সেদিন নীরবে কান্না করেছিলেন? আজকের বিএনপি হয়তো বলবে- আমরা জানতাম সরকারের পতন এভাবে হবেনা- তাই আমরা যাইনি। দেখো! আমরা কত চালাক। আমরা গেলে খামাখা আমাদেরও কত লাশ পড়ত। কিন্তু তারা কি এই লাশের স্তূপের দায় থেকে মুক্তি পাবে? কিভাবে পাবে ?
 
বিএনপি যদি নাই যেত- সেটা আগেই বলে দিত যে আমরা এই আন্দোলনের সাথে নাই। তাহলে হেফাজত হয়তো ভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে শাপলা থেকে চলে যেত। খালেদা জিয়া হয়তো ঢাকা বাসীকে আহবানও করতেন না। তাঁদের নেতারা নিশ্চয়ই খালেদা জিয়াকে আশ্বাস দিয়েছিলেন। তাই তিনি সাহস করে এমন আহবান করেছিলেন। ঢাকাবাসী অনেকেই তার আহবানে সাড়া দিল। শাপলায় গেল এবং র*ক্ত দিয়ে গোসল করলো। সেদিন সবাই বসে যেতে পারলে, ঢাকাবাসী দলে দলে আসত। পরের দিন সারা দেশের লোকজন আসত। জমায়াত-বিএনপির বাকী লোকজনও আসত। শাপলা চত্বর জনতার চত্বরে রূপান্তরিত হত। হাসিনা হয়তো তখনই আলোচনায় এসে নির্বাচন দিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিতে পারত। অথবা দেশের রাজনীতি কিছুটা হলেও দিক ফিরে পেত। হ*ত্যা-গু*ম-ক্রস্ফা*য়ার অনেকটা কমে যেত। অনেক মায়ের বুক খালি হওয়া থেকে বেঁচে যেত। কিন্তু হলো না। এমন সুযোগ মিস করায় বিএনপিকে ক্ষমতার জন্য অপেক্ষা করতে হলো ২০২৬ পর্যন্ত। মাঝখান দিয়ে জুলাইয়ের মত আরেকটি বড় গণ*হত্যার সাক্ষী হলো দেশবাসী। আবারও আ*হত ও ভিক*টিম হলো দেশের গণতন্ত্র।
এটাই ইতিহাস। বহু র*ক্ত দিয়ে লেখা ৫ ই মে'র শাপলার ইতিহাস। মুছে দেয়ার যতই চেষ্টা করা হোক, ইতিহাস এভাবেই লিখিত হতে থাকবে বিভিন্ন সময়ে, প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের মাধ্যমে। আর নতুন প্রজন্ম যুগ যুগ ধরে নেফাকীর সর্বোচ্চ নমুনা সম্পর্কে ধারণাও পেতে থাকবে, ইন শা আল্লাহ।