নেত্রকোণার মদন উপজেলায় ১২ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী শিশুটি বর্তমানে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষক বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’ তিনি অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্য ও নানাবাড়ি নিয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম আমান উল্লাহ সাগর, তিনি স্থানীয় মহিলা কওমি মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষক। গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী শিশুর মা মদন থানায় আমান উল্লাহ সাগরকে একমাত্র আসামি করে মামলাটি করেন।
এ ঘটনার পর থেকে আমান উল্লাহ আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন তিনি। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
ভিডিও বার্তায় অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ বলেছেন, ‘আমি যদি কিছু না বলি তাহলে আপনারা হয়তো আমাকে সন্দেহ করতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাকে নিয়ে একটি বিষয় ভাইরাল হইছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রচার হচ্ছে। আমি এই বিষয়টির সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত না। আমি এর বিষয়ে কিছুই জানি না।’
তিনি বলেন, ‘মেয়েটা আমাদের এখানে পড়াশোনা করেছে। গত বছর পড়েছে এবং আগের বছর শুরু করেছে। এর আগের বছর সে আমাদের মাদ্রাসা থেকে চলে যায়। খবর নিয়ে জানতে পারলাম সে ঢাকা চলে গেছে। তারা বাবা-মার সাথে থাকে। সৎ বাবা এবং মা অন্য কোথাও আগে বিয়েতে বসছিল।’
‘কিছুদিন যাওয়ার পরে দেখলাম আবার মেয়েটা আমাদের মাদ্রাসায় আসছে। কোথা থেকে আসছে জানতে চাইলে সে বলল যে, ঢাকায় চলে গেছিলাম, এখন নানা ভাই জোর করে নিয়ে আসছে আমারে। আসতে চাইছিলাম না। যে মেয়েটা এখানে আসতে চাইছিল না, তাকে কেন জোর করে আনা হলো? তাকে জোর করে আনার পেছনে কি কারণ ছিল বা তার কি স্বার্থ ছিল’, প্রশ্ন রাখেন তিনি।
শিক্ষক আমান উল্লাহর ভাষ্য, ‘পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি যে মেয়েটি তার এই নানার সাথে রাতের বেলা ঘুমায়, সে নিজেই বলছে। কেন বলছে? যখন আমরা জিজ্ঞাসা করলাম যে, তুমি হিজাব পর না, অন্য মেয়েরা পরে। তুমি বোরখা পর না, অন্য মেয়েরা পরে। তার চলা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। আপনারা চাইলে গ্রামে গিয়ে কথা বলে দেখতে পারেন। আমরা তাকে কন্ট্রোল করতে পারছিলাম না।’
কিছুদিন থাকার পরে তাকে রাখতে পারবে না, এমন চিন্তাভাবনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হয়তো মেয়েটা অন্য কোথাও গিয়ে যদি কন্ট্রোলে থাকতে পারে, তাই আমরা তার গার্জেনের (অভিভাবক) কাছে পড়লাম। তার মাকে আমরা বুঝিয়ে বললাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল যে, তার মা যেন তাকে বুঝিয়ে বলে যায় যে, হুজুরের কথা মেনে চলবা। মাদ্রাসার নিয়ম-কানুন মেনে চলবা।’
কিন্তু তিনি মেয়েকে নিয়ে চলে যাবেন জানিয়ে শিক্ষক বলেন, ‘প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে আমাদের মাদ্রাসা থেকে নিয়ে চলে গেছে। পরবর্তীতে খবর নিয়ে জানতে পারলাম, সিলেটে নিয়ে গেছে। কিছুদিন আগে আবার এসে বলছে যে এই দুর্ঘটনা, খুব বড় সমস্যা। যে কথাটা শোনার পরে আমি আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি, অসুস্থ হয়ে পড়ছি। কারণ আমার ফ্যামিলি আছে, বাচ্চা আছে, বিবি আছে, আত্মীয়-স্বজন আছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার নামে যে বিষয়টি প্রচার হচ্ছে, এটা আমার ফ্যামিলির লোকেরা দেখে আমাকে কি বলছে? কি ভাবছে? আপনারা সঠিক তদন্ত করুন। আমি কখনোই দেশের আইনের প্রতি অবাধ্য না। আমি শ্রদ্ধাশীল। দেশের আইন আছে, সে আইন সঠিক অপরাধী যে, তাকে খুঁজে বের করবে।’
‘অপরাধী খুঁজে বের করার আগেই যদি আমাকে অপরাধী বানিয়ে ফেলেন, তাহলে তো আসল অপরাধী পার পেয়ে যাবে। আসল অপরাধী তো ছাড়া পেয়ে যাবে। আপনাদের কাছে আমি অনুরোধ করে বলি, আপনারা আসল অপরাধীকে খুঁজে বের করুন। টেস্ট করা হোক যে, আসলেই এ বাচ্চার বাবা কে?, যোগ করেন তিনি।
শিক্ষক আমান উল্লাহ বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে শুধু এই কথাগুলো বলব যে, আল্লাহ তাআলার বিচারের ওপরে যদি শ্রদ্ধাশীল থাকেন, এই বিশ্বাস করেন, তাহলে আমাকে নিয়ে আর এরকম কাজ করবেন না। আপনারা সঠিক তদন্ত করে সঠিক অপরাধী খুঁজে বের করুন। আমি আপনাদের সামনে আর কথা বলতে পারতেছি না। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন।’
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শিশুটির বাবা পরিবার ত্যাগ করার পর তার মা জীবিকার তাগিদে সিলেটে গৃহ পরিচারিকার কাজ করতেন। শিশুটি তার নানির কাছে থেকে ওই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতো। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর তাকে ধর্ষণ করেন এবং ঘটনাটি জানাজানি করলে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
ভুক্তভোগী শিশুটি গত পাঁচ মাস ধরে মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। সম্প্রতি তার শারীরিক পরিবর্তন দেখে পরিবারের সন্দেহ হলে শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত করেছেন যে, শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা।
গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়মা আক্তার জানান, শিশুটি বর্তমানে প্রচণ্ড রক্তশূন্যতায় ভুগছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, জীবনের প্রথম মাসিকের অভিজ্ঞতার আগেই শিশুটি গর্ভবতী হয়ে পড়েছে, যা তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এদিকে অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর গত ১৮ এপ্রিল থেকে মাদ্রাসায় অনুপস্থিত রয়েছেন বলে জানা গেছে।