Image description

দেশে সরকার বদল হলে প্রশাসনের নানা স্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি-পদায়ন স্বাভাবিক ঘটনা। এর সঙ্গে দীর্ঘ বছর সরকারি চাকরি করা কোনো কোনো কর্মকর্তার ভাগ্যে জোটে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ নামের আইনি খড়্গ। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা থাকেন সেই ভয়ে। বয়স থাকলেও আইনি প্যাঁচে ‘জনস্বার্থে’ চাকরি থেকে বিদায় দেওয়া হলেও সেই কর্মকর্তারা জানেন না চাকরিকালে তারা ‘জনবিরোধী’ কী করেছিলেন!

গত কয়েক মাসে পুলিশ ও প্রশাসনে ২৫ বছর চাকরি সম্পন্ন হয়েছে—এমন কয়েকজন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর ঘটনায় ফের আলোচনায় এসেছে বাধ্যতামূলক বা অকাল অবসরের বিষয়টি। ১০ দিনের মধ্যে ৩০ পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর পর চাকরিতে ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ নিয়ে নানা আলোচনাও চলছে। তাদের অনেকেই রয়েছেন ‘২৫ বছর’ আতঙ্কে।

তবে গতকাল সোমবার সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের রুটিন ফাংশন যেগুলো—নিয়োগ, বদলি, প্রমোশন, রিটায়ারমেন্ট; সবই আইনানুগভাবে করা হয়েছে। এটা নতুন কোনো বিষয় নয়।’

যাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল কি না—এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এগুলো ডিপার্টমেন্ট যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়। এটা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এগুলোর জন্য কমিটি আছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, অভিযোগ তো অনেকের বিরুদ্ধেই আছে, এগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়। যাতে ইনজাস্টিস না হয়, সেভাবে দেখা হয়। বিধি মোতাবেক দেখা হয়।’

মূলত সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৫৭ নম্বর আইন) এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী চাকরির বয়স থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর দিয়ে থাকে সরকার। ওই ধারায় বলা হয়েছে, যে কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার ওই কর্মচারীকে ‘জনস্বার্থে’ যে কোনো সময় অবসরে পাঠাতে পারে। এ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর প্রয়োজনও নেই। ওই ধারায় অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক বা অকাল অবসর হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন।

বিভিন্ন ক্যাডারে ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সাধারণত চাকরিতে নানা অপরাধ বা অনিয়ম করলে আইন অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরিচ্যুত বা বরখাস্ত হন। তবে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারায় চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানতে পারেন না, তাদের কেন চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হলো।

একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারাটি মূলত চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার হয়ে আসছে। যে সরকার বিদায় নেয়, ওই সরকারের ‘অনুগত’ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাধারণত ৪৫ ধারায় অবসরে পাঠানো হয়। যদিও টানা ২৫ বছর ধরে এসব কর্মকর্তা কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকেন। রাষ্ট্রীয় খরচে তারা নানা প্রশিক্ষণও নেন কর্মকালে। ফলে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে না লাগিয়েই সার্ভিসের সময় থাকলেও বিদায় দেওয়া হয়। তবে এমন ঘটনাও ঘটে, এক সরকারের আমলে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলে পরের সরকারের আমলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, পুরোনো বেতন-ভাতা নিয়ে ফের চাকরিতে ফিরে আসছেন।

অন্যদিকে ভেতরে ভেতরে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে অনেক কর্মকর্তা যোগ্যতা থাকার পরও পদোন্নতি বঞ্চিত হন। এক সরকারের আমলে পুরো সময়ই অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট বা পদে চাকরি করতে বাধ্য হন। সরকারের বিদায়ের পর ওই সরকারের অনুগতদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে শূন্যপদে বঞ্চিতদের পদোন্নতি ও পদায়ন করতেও দেখা যায়।

জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢালাওভাবে বাধ্যতামূলক অবসর বা সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারার ব্যবহার হতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রশাসনের জন্য কালো নজির তৈরি হবে। তবে আগের সরকারের পক্ষে সরকারি চাকরির নীতিনৈতিকতা বাদ দিয়ে অন্ধভাবে কাজ করাদের খুঁজে বের করে নিয়ম অনুযায়ী শাস্তি দিতে হবে। অন্য কর্মকর্তাদের সতর্ক করে কাজে লাগানো জরুরি।

প্রশাসন বিশ্লেষক ও প্রশাসনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থের প্রণেতা মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া কালবেলাকে বলেন, ভোটে দায়িত্ব পালনকারী যেসব ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং যাদের অবসরে পাঠানোর পরিকল্পনা হচ্ছে, তা খুবই খারাপ নজির স্থাপন করবে। এটি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্যও কঠিন পথ তৈরি করছে। কারণ যে সরকারই যাদের ডিসি বানাক না কেন, সবচেয়ে যোগ্য কর্মকর্তাদের বাছাই করে ডিসি বানায়।

তিনি আরও বলেন, যারা ডিসি পদে রাজনৈতিক কর্মীর মতো আচরণ করেছেন এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে অন্যায়ভাবে ভোট কারচুপিতে অংশ নিয়েছে তাদেরকে অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু ঢালাওভাবে সবাইকে শাস্তির মধ্যে নিয়ে এসে প্রশাসনে আতঙ্ক তৈরি করা উচিত নয়।

পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রভাবের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ কালবেলাকে বলেন, কোনো চৌকস কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠালে, তার প্রভাব কিছুটা বাহিনীর ওপর পড়ে। কিন্তু আইনগত বিষয়টিও দেখতে হবে। যিনি সরকারি চাকরিতে আসেন, তিনি একটা চুক্তির মাধ্যমে আসেন। চুক্তিতে আছে যে, একটা সময় পরে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ মনে করলে তাকে বিদায় করতে পারে। আপনি যখন চুক্তির মাধ্যমে আসবেন, তখন চুক্তি মানতে হবে।

তিনি আরও বলেন, চাকরিকে রাজনীতিকীকরণ থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে এটা (বাধ্যতামূলক অবসর) চলতে থাকবে। যারা সরকার চালায়, তারা যদি মনে করে আমাদের মতাদর্শের লোকদের চাকরিতে নেব, তাহলে এটা চলতেই থাকবে। নির্মোহভাবে নিয়োগ দিতে হবে। যারা নিয়োগ পাবে, তাদেরকেও নির্মোহভাবে, নিরপেক্ষ থেকে কাজ করতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নব্বই-পরবর্তী এরশাদ সরকার থেকে শুরু করে সব সরকারের আমলেই কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে দেওয়া হয়েছে। কোনো সরকার দায়িত্ব নিয়েই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শী কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের নানা মেয়াদে বাধ্যতামূলক অবসরের রীতি চলছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সরকারি চাকরি আইনের সেই ৪৫ ধারার ব্যবহার চালাতে থাকে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রথম এক বছরে প্রশাসন ক্যাডারের ২৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এ ছাড়া ওই সরকার বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদমর্যাদার ৩১ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। তাদের বেশিরভাগই ২০১৪ ও ১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ নানাভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ছাড়াও ওই সরকার এক প্রজ্ঞাপনেই জুডিশিয়াল সার্ভিসের ১৮ জন বিচারকসহ বিভিন্ন সময় পুলিশের ৫১ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়।

বর্তমান সরকারও ৪৫ ধারা অনুযায়ী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। কর্মকর্তাদের বিভিন্ন স্তরে কথা বলে জানা গেছে, বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের চাকরির বয়স চলতি মাসের ২৮ তারিখে ২৫ বছর পূর্ণ হবে। আগে থেকেই এ ব্যাচের ওএসডি থাকা কর্মকর্তারা আদৌ চাকরিতে থাকতে পারবেন কি না তা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা ডিসিদেরও চাকরির বয়স ২৫ বছর হলেই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হতে পারে বলে প্রশাসনে গুঞ্জন রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান সরকারের আমলে তিন দফায় পাঁচ অতিরিক্ত আইজিপিসহ ৩৫ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। সর্বশেষ গত রোববার পুলিশের ১৬ ডিআইজিকে সরকারি আইনের ৪৫ ধারায় অবসরে পাঠায় সরকার।

পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে পুলিশের ৩ জন ওএসডি ও ১১৩ কর্মকর্তা বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত রয়েছেন। তাদের মধ্যে যারা ২৫ বছর চাকরির মেয়াদ পূর্ণ করেছেন, সেই কর্মকর্তাদের অতীত কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব কর্মকর্তাদের অতি উৎসাহী কোনো কর্মকাণ্ড রয়েছে কি না এবং বিতর্কিত নির্বাচনগুলোতে তাদের ভূমিকা কেমন ছিল, তা দেখা হচ্ছে। ‘দোষ’ পেলেই তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হবে। সেসব পদে দীর্ঘ বছর ধরে বঞ্চিত যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়ন দেওয়া হবে।

যদিও পুলিশ বিভাগে আলোচনা রয়েছে, এই কর্মকর্তাদের অনেকেই বিগত সরকারগুলোর আমলে অনেকটা ‘নিরপেক্ষ’ ভাবমূর্তি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। চাকরিজীবনে অনেকের দক্ষতা ও সততাও রয়েছে। হয়তো অনেক কর্মকর্তা সততার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভালো পোস্টিং পেয়ে থাকতে পারেন। এ কারণে তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলে সততা ও দক্ষতা নিয়ে চাকরি করা বর্তমান কর্মকর্তাদের মধ্যেও ভবিষ্যতে চাকরি নিয়ে শঙ্কা কাজ করতে পারে।

সাবেক সচিব ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার কালবেলাকে বলেন, ঢালাওভাবে নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ঠিক নয়। যারা সত্যিকারভাবে অন্যায় করেছেন এবং আওয়ামী কর্মীর মতো আচরণ করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সব কর্মকর্তা এমন আচরণ করেছেন বলে মনে হয় না। ঢালাও অবসরে পাঠালে ভবিষ্যতে সরকার ও প্রশাসন বিপদে পড়বে। বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তারাও একদিন বিপদে পড়বেন, এটি মনে রাখা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনগুলো হয়েছিল তৎকালীন সরকারের ইচ্ছায়। সেখানে ডিসিসহ অন্য কর্মকর্তাদের পক্ষে সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ কি ছিল? ছিল না। সুতরাং একতরফাভাবে কর্মকর্তাদের শাস্তি দেওয়া ভালো লক্ষণ নয়। এতে ভবিষ্যৎ প্রশাসন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।