তালিকা করে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনও বিষয় নয়। কারা দাগি অপরাধী, গ্যাংস্টার কিংবা শীর্ষ সন্ত্রাসী—এ সংক্রান্ত তথ্য দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিতে সংরক্ষিত আছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ প্রথম নেয় ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার। ওই বছরের ২৬ ডিসেম্বর পুলিশের প্রস্তুত করা তালিকায় দেশের ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম প্রকাশ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালের ১৬ মার্চ জাতীয় সংসদে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ৪২ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর আরেকটি তালিকা প্রকাশ করেন। এরপর আর নতুন করে কোনও আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ না হলেও বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকে।
সম্প্রতি ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীদের’ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় খুনোখুনি বেড়েছে। তালিকাভুক্ত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন গত ২৬ এপ্রিল খুন হওয়ার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। এরপর গত ২ মে কাওরান বাজারে একটি পুলিশ ক্যাম্প উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার সাংবাদিকদের জানান, অপরাধ দমনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা নতুন করে হালনাগাদ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আগের মতো বড় শীর্ষ সন্ত্রাসী না থাকলেও তাদের সহযোগী ও নতুনভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কীভাবে করা হয় তালিকা
নতুন করে সন্ত্রাসীদের তালিকা করার খবরে প্রশ্ন উঠেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা কোন প্রক্রিয়া ও মানদণ্ডে তৈরি বা হালনাগাদ করা হয়? পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকলেই কাউকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয় না। অপরাধের ধরন, বিস্তৃতি ও প্রভাব বিশ্লেষণ করেই এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে খুন, অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার, চাঁদাবাজি, মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, সংঘবদ্ধ সহিংসতা ও সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনার মতো অভিযোগ গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন, অপরাধ নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ, এলাকায় প্রভাব বলয় ও আধিপত্য, ক্যাডার নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব, মামলা ও অপরাধের ইতিহাস, আন্তজেলা বা আন্তর্জাতিক সংযোগ, সীমান্ত অপরাধ, অস্ত্র ও মাদক পাচার এবং বিদেশে অবস্থান করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা করা হয় অপরাধ ও অপরাধীর সক্ষমতার মানদণ্ডের ভিত্তিতে। হত্যা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। বিদেশেও এ ধরনের তালিকা থাকে। কিন্তু দেশে দেখা যায়, সন্ত্রাসী বাহিনীর নেতৃত্ব একজন দিচ্ছে এক এলাকায় থেকে, লাশ পড়ছে অন্য এলাকায়। কেউ মিরপুরে অবস্থান করলেও ঘটনা ঘটছে আজিমপুরে। এমনকি জেলে থেকেও অনেক সময় অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাই অপরাধের ম্যাপিং এখানে গুরুত্বপূর্ণ।’
কেন আবার শীর্ষ সন্ত্রাসী তালিকা
২০০১ সালের আগে-পরে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্রবাজি ও রাজনৈতিক সহিংসতা চরমে পৌঁছায়। এরপর ওই বছরের ২৬ ডিসেম্বর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধারাবাহিক অভিযান চালায়। এতে অনেক সন্ত্রাসী গ্রেফতার, নিহত বা আত্মগোপনে চলে যায়।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী কারাগার থেকে বের হয়ে আসে এবং সরাসরি অপরাধ জগতের নেতৃত্বে সক্রিয় হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। এর মধ্যে কোরবানির পশুর হাট ইজারা নিয়ে বিরোধের জেরে খুন হন ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় দুই নম্বরে থাকা খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। এর আগে ২০০৪ সালের ২৬ জুন র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন আব্দুল হান্নান ওরফে পিচ্চি হান্নান। একই সময়ের কাছাকাছি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়; এরপর থেকে তার আর কোনও হদিস মেলেনি।
২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনেকেই বর্তমানে দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম ইন্টারপোলের রেড নোটিশ তালিকাতেও রয়েছে।
পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে আরও রয়েছেন সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, ইমাম হোসেন, জিসান, হারিস আহমেদ, মুরসালিন, জাফর আহমেদ, তাজুল ইসলাম, মামুন, শামীম আহমেদ, খোরশেদ আলম ওরফে রাসু, মোল্লা মাসুদ, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, শাহাদাত হোসেন, ছোট জিসান, মশিউর রহমান কচি, রফিক, আব্দুল জব্বার মুন্না, সেলিম, ফ্রিডম সোহেল, কামাল পাশা, আমিনুর রসুল সাগর, খন্দকার তানভীর ইসলাম, কাজী আতাউর রহমান লিটু, সাজিকুর রহমান হিরু, মুন্না ওরফে বিহারি মুন্না, নূর মোহাম্মদ, টিঅ্যান্ডটি বাবু, আশিক ওরফে আশিকুল ইসলাম, শহিদুল্লাহ ওরফে লেবু শহিদ, সুমন, তৌহিদুজ্জামান খান ওরফে টিক্কা, আরিফ হোসেন ওরফে বাদল, মিয়া দেলোয়ার হোসেন, আবুল কাশেম ওরফে হাদী, জসিম ওরফে জসি, দুলাল ওরফে মোটকা দুলাল, গোলাম মোস্তফা পাপ্পু, মোহাম্মদ সেলিম ওরফে সেইল্লা, মনু মিয়া ওরফে মুন্না, মামুন ওরফে মফিজুর রহমান, রবি, টুকু খান ও মামুন ওরফে মিয়া মামুন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, এদের খোঁজ-খবর নিয়েই তালিকা হালনাগাদ করতে চায় পুলিশ।
সোমবার (৪ মে) এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্ত হয়েছেন। জামিন দেওয়া সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার। তবে তারা যদি আবার অপরাধে জড়ায়, তাহলে অভিযোগ ও মামলার ভিত্তিতে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
তিনি বলেন, ‘কেউ শীর্ষ সন্ত্রাসী হোক বা সাধারণ ব্যক্তি, হত্যাকাণ্ড মানেই অপরাধ। মামলা হলে তদন্ত হবে এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার কাজ করছে।’