ইলিশের অভয়াশ্রম রক্ষায় মার্চ-এপ্রিলে পদ্মা নদীতে মাছ শিকার নিষিদ্ধ। এই সময়ের জন্য শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার নিবন্ধিত ১৫ হাজার ৮১৮ জেলের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৭০৫.৪৪ টন চাল। এই চাল বিতরণ শুরু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। জেলেরা অভিযোগ করেছেন, প্রকৃত জেলেদের অনেকেই চাল পাননি। যারা পেয়েছেন, তারাও চার-পাঁচ কেজি করে কম পেয়েছেন। বিপরীতে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতাদের বিশেষ স্লিপ নিয়ে অন্য পেশার লোকেরা চাল তুলেছেন।
উপজেলার কাঁচিকাটা ইউনিয়ন, উত্তর তারাবুনিয়া ইউনিয়ন, ডিএমখালি ও চরভাগা ইউনিয়ন থেকে এসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ পাওয়া গেছে চরভাগা ইউনিয়ন থেকে। এ ইউনিয়নে নিবন্ধিত ১২০০ জেলের জন্য ৯৬ টন চাল বরাদ্দ হয়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এসব বিতরণ করা হয়। স্থানীয় দুই ইউপি সদস্য বিশেষ স্লিপের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের লোকের মধ্যে চাল দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুই মাসের জন্য ৪০ কেজি করে ৮০ কেজি চাল পাওয়ার কথা জেলেদের। কিন্তু বৃহস্পতিবার চরভাগা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে রতন মিয়াকে (৩০) দেওয়া হয় ৭৫ কেজি চাল। এদিন সকালে তিনি বলেন, তাকে পাঁচ কেজি চাল কম দেন ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বাচ্চু প্রধানিয়া। বাকি চাল নাকি তিনি (মেম্বার) অন্য জেলেদের দেবেন। রতন মিয়া এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে চাল বিতরণ বন্ধ করে দেন বাচ্চু প্রধানিয়া।
রতন মিয়ার অভিযোগ, প্রকৃত জেলেদের চাল না দিয়ে টাকার বিনিময়ে স্লিপের মাধ্যমে চাল বিক্রি করে দেন ইউপি সদস্যরা। যারা বৃহস্পতিবার চাল নিতে আসেন তাদের অর্ধেকের বেশি মানুষ পেশায় জেলে নন। কিন্তু স্লিপ নিয়ে চালের জন্য এসেছেন।
তাঁর কথার সত্যতা মেলে খানিক পরই। বাচ্চু প্রধানিয়ার সই করা স্লিপ নিয়ে চালের লাইনে দাঁড়িয়েছেন পেদাকান্দির সজীব আহমেদ (২২)। জেলে কার্ড আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এই তরুণ বলেন, ‘আমার কাছে কার্ড নেই। আমাদের পরিবারে কেউ জেলে নেই। আমার বাবা বলল, বাচ্চু মেম্বার কার্ড দেবে, সেই কার্ড নিয়ে পরিষদে গেলে ৮০ কেজি চাল দেবে; তাই আমি চাল নিতে এসেছি। এখন সাংবাদিক আসাতে আমাদের চাল দেওয়া বন্ধ।’ এ সময় তাকে বাচ্চু প্রধানিয়া বলেছেন, ‘একটু দাঁড়াও! সাংবাদিক গেলে তোমার চাল আগে দিয়ে দিমুনে।’ তাই তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে চালের অপেক্ষায় আছেন।
এদিন সকাল ৮টার দিকে এসে বেলা ১১টা পর্যন্ত চাল পাননি চরভাগা গ্রামের জেলে জসিম উদ্দিন (২৮)। তাঁর অভিযোগ, ‘ইব্রাহীম মেম্বার ও বাচ্চু মেম্বারের সই করা স্লিপ ছাড়া কাউকে চাল দেয় না। জেলেদের কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের মারধর করে। আমার ভাই কিছুক্ষণ আগে চাল পাইছে, তাকে ৭৫ কেজি চাল দিছে। সে প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর করে পরিষদে আটকে রাখে।’
তিনি বলেন, যাদের স্মার্ট কার্ড নেই তাদের চাল দেওয়ার কথা নয়। কিন্তু টাকার বিনিময়ে স্লিপের মাধ্যমে চাল দেওয়া হচ্ছে তাদের। এখানে (লাইনে) অনেকেই আছে ঢাকা থাকে, ব্যবসা করে, জেলে নয়, তবুও তাদের চাল দেওয়া হচ্ছে। আর জেলেরা চাল নিতে আসলে বলে, এইবার চাল কম এসেছে পরেরবার আসলে পাবেন।
জসিমের ভাষ্য, ‘পরিবহন খরচ বাবদ ১০০ টাকা করে আদায় করেছেন আমাদের কাছ থেকে। প্রকৃত জেলেদের বঞ্চিত করে নিজের ভাই ও আত্মীয়-স্বজনদের চাল দিয়েছেন বাচ্চু মেম্বার।’
এদিন স্লিপ নিয়ে চালের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বকাউলকান্দির আব্দুল সাত্তার (৩৫)। পেশায় তিনি মুদি দোকানি। জেলে কার্ড আছে কিনা, প্রশ্ন করলে বলেন, ‘আমাকে বিএনপি পক্ষ থেকে ইব্রাহীম মেম্বার স্লিপ দিয়ে চাল নিতে পাঠিয়েছেন। আমি এর বেশি কিছু বলতে পারব না। আমার কাজ চাল নিয়ে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। আমাকে একা নয়, এই স্লিপ আরও বিশ-পঞ্চাশ জনকে দিয়েছেন ইব্রাহীম ভাই। আমি মুদি দোকান করি ভাই, আমার জেলে কার্ড থাকবে কীভাবে।’
বাকি বিষয়ের জন্য তিনি ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ইব্রাহীম মল্লিকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। এ সময় জানা যায়, আব্দুল সাত্তার সকালেও একবার চাল নিয়েছেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমাকে তিনটা স্লিপ দিয়েছে। আমি আগে দুইটা নিছি। এখন একটা নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি। ওনারা না দিলে তো আমি নিতে পারতাম না। কীভাবে নিছি সেটা তাদের জিজ্ঞেস করেন।’
সাংবাদিক দেখে জেলেরা অভিযোগ করেন, তাদের জন্য বরাদ্দ চাল স্লিপ বিনামূল্যে দেওয়ার কথা। কিন্তু প্রতিটি স্লিপ বিক্রি করা হচ্ছে মোটা টাকার বিনিময়ে। পুরো ঘটনাই ঘটছে সরকারি কর্মকর্তাদের সামনেই। পরে জেলেদের পক্ষ থেকে এসব অনিয়মের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়। উপজেলা প্রশাসন তদন্তের কথা বলে চাল বিতরণ বন্ধের নির্দেশ দেন।
ঘণ্টাখানেক বিতরণ বন্ধ থাকলেও দুপুর একটার দিকে একইভাবে স্লিপের মাধ্যমে চাল বিতরণ করেন দায়িত্বে থাকা ট্যাগ কর্মকর্তা উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুনতাসীর মামুন।
অনিয়মের প্রসঙ্গে মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘আমার অনুপস্থিতিতে কেউ নিতে পারে। তবে আমি জেলে কার্ড ছাড়া কাউকে চাল দেব না। কেউ যদি লাইনে দাঁড়ায়, এতে আমার কিছু করার নেই। আমি তো আর চাল দিচ্ছি না। কিছুক্ষণ আগে একটু হট্টগোল হয়েছিল। আমি চাল দেওয়া বন্ধ রেখেছি। এখন ইউএনও স্যারের নির্দেশে আবার চাল বিতরণ শুরু করেছি।’ ওজনে কম দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।
বক্তব্য জানতে ইউপি সদস্য ইউপি সদস্য ইব্রাহীম মল্লিকের নম্বরে দফায় দফায় কল দিলেও ধরেননি। অপর ইউপি সদস্য বাচ্চু প্রধানিয়া শনিবার সকালে বলেন, ‘অনিয়ম বলতে কিছু নেই। এটা সারাদেশে হচ্ছে। আমাদের কিছু নেতাকর্মী আছে, তাদের দেখতে হয়। তা ছাড়া সবার তো স্মার্ট কার্ড নাই, তাই স্লিপ দিয়েছি। এখানে ট্যাগ অফিসার ছিলেন তিনি ভালো বলতে পারবেন।’
এ প্রতিনিধিকে লক্ষ্য করে বাচ্চু প্রধানিয়া আরও বলেন, ‘এগুলো দেখার দায়িত্ব আপনার না। ট্যাগ অফিসার আছে, ইউএনও আছে, মৎস্য কর্মকর্তা আছে– তারা দেখবে। আপনি আমাদের মানিক বকাউলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই ইউপি সদস্যরা সবাই সখিপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মানিক বকাউলের ঘনিষ্ঠ। তাঁর প্রভাব খাটিয়েই চাল বিতরণে অনিয়ম করছেন তারা। বক্তব্য জানতে গতকাল রোববার বিকেলে মানিক বকাউলের নম্বরে কল দিলে তিনি বলেন, ‘আমি ইউনিয়ন পরিষদের কেউ না। পরিষদের বিষয় আমি কথা বলতে চাই না। রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা তাদের সহযোগিতা করে মাত্র। বাচ্চু মেম্বার কি বলল না বলল, এটা তাঁর বিষয়। তিনি আমার আত্মীয় হয় তো, তাই আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য বলছে। আপনি কাছাকাছি থাকলে এসে দেখা করেন।’
ভেদরগঞ্জ উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ইমরান বলেন, ‘এগুলো জাটকা ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদের জন্য বরাদ্দ চাল। এখানে কার্ড ছাড়া কাউকে এক কেজি চাল দেওয়ার সুযোগও নেই। স্লিপের মাধ্যমে চাল বিতরণ করা যাবে না। ওখানে আমাদের অফিসের লোক আছে, ট্যাগ অফিসার আছে– তাদের দায়িত্ব জেলেদের চাল বিতরণ করা।’ তিনি ইউএনওর কাছ থেকে অনিয়মের বিষয়ে জানতে পেরেছেন। খোঁজ নিচ্ছেন, কেউ জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হক শনিবার সমকালকে বলেন, কার্ড ছাড়া কাউকে চাল দেওয়ার সুযোগ নেই। যে পরিমাণ বরাদ্দ আছে, সেটাই বিতরণ করতে হবে। ৫ কেজি করে কম দেওয়ার বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।