Image description

ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

বৃটেনের মতো একটি ধনী ও বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ অর্থনীতির দেশে ঐতিহাসিকভাবে মাত্র চারটি ক্লিয়ারিং ব্যাংক ছিল। সেগুলো হলো: Barclays, HSBC, NetWest এবং Lloyds. সম্প্রতি এর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। বাকি স্থানীয়, আঞ্চলিক ও বিভিন্ন দেশের শতাধিক ব্যাংক (যেমন: Habib Bank, State Bank of India), বিল্ডিং সোসাইটি (যেমন: Halifax, Nationwide) ও আর্থিক এবং ঋণপ্রদান করার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো এই ক্লিয়ারিং ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই ক্লিয়ারিং করে থাকে। বাংলাদেশে ৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ছাড়াও অর্ধশতাধিক প্রাইভেট ব্যাংক আছে। বাংলাদেশের মতো বিশ্বের অনেক ছোট ও দুর্বল ও পাচার-প্রবণ অর্থনীতির দেশে এত পরিমাণ প্রাইভেট ব্যাংক থাকার যৌক্তিকতা কী তা বুঝে আসে না।

 

বাংলাদেশে আমরা দেখি রাতারাতি বেড়ে গেছে প্রাইভেট ব্যাংকের সংখ্যা।। কোনো কিছুর বাছ বিচার না করে অতীতের সরকারগুলো, বিশেষ করে পতিত সরকার কেবলমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক করার লাইসেন্স/অনুমতি দিয়েছে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। যে রাজনীতিবিদের ২/১ যুগ আগে তেমন কিছুই ছিল না তিনি রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি নাগালের বাইরে । নামে-বেনামে ঋণ নেয়া ঋণখেলাপিদের সংখ্যা বেড়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় বৃটেনে কখনোই ব্যাংক করার অনুমতি বা লাইসেন্স দেয়া হয় না। আর্থিক খাতটি দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। ফলে এটাকে বৃটেনে সব সময় রাখা হয় সব ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে।

Bank of England এবং FCA (Financial Conduct Authority) অত্যন্ত শক্তভাবে ব্যাংকগুলো ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনিটর ও তদারকি করে। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রফেশনাল ওয়েতে ঋণ স্যাংশন করে স্বচ্ছ আইনি ও দালিলিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সত্যিকার আর্থিক সামর্থ্যের উপর ভিত্তি করে। এ ক্ষেত্রে এদিক-সেদিক করার কোনো সুযোগ নেই। ঋণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বৃটেনে অচিন্তনীয়। কখনোই শোনা যায়নি। কোনো রাজনীতিবিদ কোনো প্রভাব খাটিয়েছেন এমন খবর বের হলে ঐ রাজনীতিবিদের ক্যারিয়ারের সেখানেই যবনিকাপাত ঘটবে।

বৃটেনে কেন্দ্রিয় ব্যাংক হলো Bank of England. সরকার তার ম্যান্যুফেস্টোর আওতায় শুধুমাত্র অর্থনীতির পলিসি নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টরে অপারেশনাল ম্যাটারে (যেমন পদায়ন, প্রমোশন, সুপারভিশন, মনিটরিং, তদারকি, ইন্টারেস্ট রেট নির্ধারণ ইত্যাদি) Bank of England স্বাধীনভাবে কাজ করে। এখানে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপারেশনাল ম্যাটারে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। এটা নিশ্চিত করেন Bank of England এর গভর্নর।

অতীতে Bank of England এর গভর্নর অবসরে গেলে তার স্থলাভিষিক্ত করার জন্য প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে বৃটেনে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন কানাডার সেন্ট্রাল ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মার্ক কার্নিকে বৃটিশ নাগরিকত্ব প্রদান করে Bank of England এর গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এ থেকে বোঝা যায় বৃটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ স্থানে ট্র্যাক রেকর্ড আছে এমন যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে বৃটিশ সরকার কতটা বদ্ধপরিকর! মার্ক কার্নি সুচারুভাবে তার দায়িত্ব পালন করে বৃটেনের আর্থিক খাতকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। তার মেয়াদ পূর্ণ হলে কানাডায় গিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বর্তমানে কানাডার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।

বাংলাদেশে কয়েকটি ব্যাংকের গ্রাহকরা সাংঘাতিকভাবে ভুক্তভোগী। তাদেরকে যেন দেখার কেউ নেই। কোটি কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসার পরও এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের ভাষায় অর্থনীতির সুবাতাস বইছে এবং চাহিদা মতো টাকা পেতে অসুবিধা হবে না বলার পরও ন্যাশনাল ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় টাকা দিতে পারছিল না। অথচ সরকার তখন বলছিল ফরেন রিজার্ভে হাত না দিয়েও তারা রেমিট্যান্সের উপর নির্ভর করে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেছেন। ৫,০০০ টাকা টাকা তুলতে গেলেও তারা তুলতে পারছেন না। গ্রাহকদের ভয়ে অনেক ম্যানেজার রীতিমতো অফিস করেন না। ব্যাংক যদি গ্রাহকের টাকা দিতে না পারে এমন ব্যাংকে কেউ টাকা রাখবে বা রেমিটেন্স পাঠাবে? পতিত আওয়ামী লীগ সরকার অর্থনীতি ধ্বংস ও ব্যাংক লুটপাট করে গেলেও তাদের সময় গ্রাহকদের টাকা পেতে অসুবিধা হয়নি। যেভাবেই হোক তারা তো ম্যানেজ করেছিল। ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের সময় গ্রাহকরা প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে পারেনি।

বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর কয়েকটি ব্যাংকের ১২টা বাজিয়েছেন। এই ব্যাংকগুলোর লক্ষ লক্ষ গ্রাহকদের পথে বসানোর জন্য তিনি সরাসরি দায়ী। গ্রাহকরা তাদের টাকা পাচ্ছে না। দেড় বছরে তিনি কি করলেন? আহসান এইচ মনসুর ব্যাংক ও গ্রাহকদের জন্য যথাযথ বিহীত ব্যবস্তা না করে মিডিয়ায় আনাড়ির মতো ব্যাংকগুলোর নাম ধরে তাদের দুর্বলতার কথা বলে সাক্ষাৎকার দিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে প্যানিক সৃষ্টি করেছিলেন। যার ফলে লক্ষ লক্ষ গ্রাহক একসাথে টাকা তুলতে যায় এবং ভয়ে তারা ব্যাংকে আর লেনদেন করতে চাননি। এমন ফলশ্রুতিতে ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার পথ ধরা ছাড়া কি উপায় আছে? অথচ পতিত সরকার টাকা ছাপিয়ে হলেও গ্রাহকদের সমস্যায় ফেলেনি। গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের এই আনাড়ি ভূমিকা ও প্যানিক সৃষ্টির কারণে লক্ষ লক্ষ গ্রাহক পথে বসেছেন।

নামে বেনামে কোম্পানি বানিয়ে, ভূয়া কাগজ ও ডকুমেন্ট দিয়ে, রাজনৈতিক কানেকশনে বা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ঋণ নেয়া, বিদেশে সেই ঋণ নেয়া অর্থ পাচার করা এবং পরবর্তীতে খেলাপি হয়ে পার পেয়ে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির এর গুরুতর সমস্যা। এই সমস্যা শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে না পারলে দেশের অর্থনীতি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। চিন্তা করা যায় এক ব্যক্তি কয়েকটি ব্যাংক থেকে ৮০/৯০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করে ব্যাংকগুলোকে একেবারে ফুটো করে দিয়েছে! পুরো ব্যাংকিং খাতকে হুমকির মূখে ফেলেছে পতিত সরকারের ক্ষমতার আশেপাশে থাকা হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন ব্যাংকখেকো চিহ্নিত ব্যক্তি।

তাছাড়া বাংলাদেশে ঋণখেলাপিদের একেবারে সাধারণভাবে দেখা হয়। এটা যেন এক মামুলি ব্যাপার! অথচ এটি একটি গুরুতর আর্থিক অপরাধ (Financial Crime)। বৃটেনে বাংলাদেশের মতো ঋণখেলাপি নেই বললেই চলে। ঋণখেলাপি জনগণের প্রতিনিধি হওয়া তো দূরের কথা, তার সামাজিক ও বাস্তব জীবন এখানে দুর্বিষহ হয়ে উঠে। ক্রেডিট স্কোর তলানিতে নেমে আসে, বৃটিশ নাগরিকত্ব (না থাকলে) পেতে অসুবিধা হয়, ক্রেডিটররা অতি সহজেই আদালত থেকে ঋণখেলাপির সম্পত্তি দখলের আদেশ (possession order) পেয়ে যান। কদাচিৎ কেউ ঋণখেলাপি হলে তিনি দেউলিয়া হতে বাধ্য হন। ফলে তার সম্পত্তি রিসিভারের কাছে চলে যায় যেখান থেকে ক্রেডিটররা তাদের দেয়া ঋণ উদ্ধার করে। এসব কিছুর বিবেচনায় বৃটেনে ঋণখেলাপি হয়ে ঋণ মেরে দেয়ার নিয়তে কেউ ঋণ নেয় না। এমন সংস্কৃতি বৃটেনে গড়ে উঠেনি।

বাংলাদেশের প্রাইভেট ব্যাংকগুলোর উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় আঞ্চলিক শাখার অনেক ব্যবস্থাপক ও অফিসারদেরকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তাদেরকে দেখেছি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তারা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাদের কাস্টমার কেয়ার, স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও যোগ্যতা দেখলে মনে হয় উন্নত বিশ্বের যেকোনো ব্যাংকিং প্রফেশনের সাথে তারা পাল্লা দিতে পারবেন। কিন্তু উপরের (কেন্দ্রীয় বোর্ড অব ডিরেক্টরস) লেভেলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বা ক্ষমতার প্রভাবে অত্যন্ত অস্বচ্ছভাবে ঋণ মঞ্জুর (Sanction) হলে তাদের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকে না।
সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনের বিপুল ম্যানডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বর্তমান সরকার। তুমুল জনপ্রিয় সরকারের উচিত আর্থিক খাতে কঠিন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে নিয়ে আসা। ব্যাংকগুলোকে শক্ত মনিটরিং ও তদারকির আওতায় নিয়ে আসা আশু প্রয়োজন। যে কোনো মূল্যে সাধারণ গ্রাহকদের টাকা তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা দরকার।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যাশ ধার দিয়ে হলেও সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে তারা চলমান সংকটটি কাটিয়ে উঠতে পারেন। অবস্থা স্বাভাবিক হলে তাদেরকে দেয়া ক্যাশ তারা রি-পে করবে। গ্রাহকরা সরকার অনুমোদিত ব্যাংকে টাকা রেখে কোনো তো অপরাধ করেননি। যে সব ব্যাংক অপারেশনে আছে দেশ ও অর্থনীতির স্বার্থে তাদেরকে বাঁচানো দরকার। না হলে গ্রাহকদের আস্থা ব্যাংকিং সেক্টর থেকে উঠে যাবে যা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক পরিণতি নিয়ে আসবে। আর ভবিষ্যতে যেন রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো ব্যাংকের অনুমতি/লাইসেন্স কেউ না পায় এটা নিশ্চিত করা দরকার।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।