ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গোপনে ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে অবস্থিত ব্রিস্টল ফার্মা লি.। এক দশক আগেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, লাইসেন্স স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করায় প্রতিষ্ঠানটিকে গুনতে হয়েছিল লাখ লাখ টাকা জরিমানা। এর সামগ্রিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছিল উচ্চ আদালত। এর পরও অনিয়মের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি ব্রিস্টল ফার্মা লি.।
শুধু তাই নয়, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের লেবার ইনস্পেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশনে (লিমা) প্রতিষ্ঠানটির ৩৩-৩০-১-০৪৬-০০০০৮ নম্বরের লাইসেন্সটিও মেয়াদোত্তীর্ণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধের মানের সঙ্গে কোনো আপস করা চলে না। ভেজাল কিংবা নিম্নমানের ওষুধ রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে রোগকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ওষুধ উৎপাদনে অনিয়ম জীবনরক্ষাকারী ওষুধকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও বাড়াতে পারে
জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘ওষুধের মতো জীবনরক্ষাকারী কিছুর সঙ্গে কোনো আপস কিংবা ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ কোনো রোগী নিম্নমানের ওষুধ সেবন করে সুস্থ না হয়ে উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কোনো ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করতে হবে। কারণ ওষুধে ভেজাল কিংবা অসংগতি থাকলে জীবন বিপন্ন হতে পারে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক, ভিটামিন, অ্যালার্জি, গ্যাস্ট্রিকসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির ৮০টির বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করে ব্রিস্টল ফার্মা লি.। তবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
লাইসেন্স স্থগিত, তবু উৎপাদন-বিপণন চলমান: ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের একটি পরিদর্শক দল গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে অবস্থিত ব্রিস্টল ফার্মা লিমিটেড কারখানায় অভিযান চালায়। পরিদর্শনের সময় ১৩টি বড় ধরনের অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়। পরে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলে ১৬ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটি জবাব দেয়, যা সন্তোষজনক নয় বলে বিবেচিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঔষধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির ওষুধ উৎপাদন লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়নি বাস্তবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় ব্রিস্টল ফার্মা লিমিটেড অবৈধ উৎপাদন ও বিপণন চালিয়ে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর নানা অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশনা দিলেও তারা গোপনে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি প্রান্তিক এলাকাগুলোতে এসব ওষুধের বিপণনও চালিয়ে যাচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক।
এ প্রসঙ্গে ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব মো. হালিমুজ্জামান বলেন, ‘ব্রিস্টল ফার্মা লি. আমাদের সমিতির সদস্য নয়। তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারছি না। তবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তারা যদি ওষুধ উৎপাদন করে থাকে, তাহলে সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একজন সহকারী পরিচালক বলেন, অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বেশ কিছুদিন ধরে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সাইটের অনেক তথ্য দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি কোন প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্সপ্রাপ্ত, কোনগুলোর লাইসেন্স স্থগিত করা আছে সে তালিকাও দেখা যাচ্ছে না। এই কারিগরি ত্রুটির সুযোগ নিয়ে অবৈধভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে ব্রিস্টল ফার্মা লিমিটেড।
ওষুধের কারখানায় ভয়াবহ অনিয়ম: ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র। ব্রিস্টল ফার্মার কারখানায় কর্মরতরা নির্ধারিত পোশাক পরিবর্তন না করেই উৎপাদন এলাকায় প্রবেশ করছেন। প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব, ড্রেস চেঞ্জ রুমে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা, জিএমপি নীতিমালার গুরুতর লঙ্ঘন। কাঁচামাল সংরক্ষণেও ছিল চরম বিশৃঙ্খলা। বিভিন্ন কাঁচামাল ট্যাগবিহীন অবস্থায় ছোট পলিথিন ব্যাগে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেখানে ব্যাচ নম্বর, উৎপাদন বা মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখের কোনো উল্লেখ নেই। ডিসপেন্সিং রেকর্ড অনুপস্থিত এবং তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের কোনো তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চরম অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের চিত্র। কারখানার কর্মীরা নির্ধারিত পোশাক পরিবর্তন ছাড়াই উৎপাদন এলাকায় প্রবেশ করছেন। প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ড্রেস চেঞ্জ রুমে মাছি উড়তে দেখা গেছে, নেই পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
কাঁচামাল সংরক্ষণে দেখা গেছে ভয়াবহ অনিয়ম। ট্যাগবিহীন পলিথিন ব্যাগে রাখা কাঁচামালের কোনো ব্যাচ নম্বর, উৎপাদন বা মেয়াদোত্তীর্ণের তথ্য নেই। ডিসপেন্সিং রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়নি, এমনকি তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি। ওয়্যারহাউস, কোয়ারেন্টাইন ও রিসিভিং এরিয়াগুলো ছিল নোংরা ও অপরিষ্কার। ঝুঁকিপূর্ণ দাহ্য পদার্থ যেমন মিথানল সংরক্ষণ করা হয়েছে নিরাপত্তাহীন পরিবেশে, যেখানে অগ্নি নির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। উৎপাদন এলাকাতেও একই চিত্র। এইচভিএসি সিস্টেম অকার্যকর থাকায় ধুলাবালি জমে ক্রস কন্টামিনেশনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন যেমন ব্যাচ ম্যানুফ্যাকচারিং রেকর্ড (বিএমআর) অনুপস্থিত। মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগে থাকা যন্ত্রপাতি কার্যকর ছিল না, যা ওষুধের গুণগত মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
পুরোনো অনিয়মের পুনরাবৃত্তি: ব্রিস্টল ফার্মা লিমিটেডের এসব অনিয়ম এবারই প্রথম নয়। এক দশক আগেও অনুমোদনহীন ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতের অভিযোগে এই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। ২০১৬ সালে র্যাবের অভিযানে ২০ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হয় ব্রিস্টল ফার্মাকে। একই বছরে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনের অভিযোগে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্রিস্টল ফার্মার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০টি কোম্পানির সব ধরনের ওষুধ উৎপাদন এবং আরও ১৪টি কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ দেন, যেখানে ব্রিস্টল ফার্মার নামও ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে আদালত ফের একই নির্দেশ দেন।
এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রিস্টল ফার্মা লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম ভূঁইয়া বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর পরিদর্শন শেষে যেসব বিষয়ে আমাদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন আমরা ওইসব নির্দেশনা প্রতিপালনের কারণে তারা আমাদের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণনের সাময়িক স্থগিতের নির্দেশনা গত বাংলা নববর্ষের আগে তুলে নিয়েছেন। এখন আর আমাদের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। একই সঙ্গে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের লাইসেন্সও নবায়ন করা হয়েছে। তবে এই প্রতিবেদক ওইসব নির্দেশনা দেখতে চাইলে সেগুলো তার কাছে নেই বলে জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো জাহিদ সাহেবের কাছে আছে। কিন্তু জাহিদ সাহেবের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তার কাছেও কাগজপত্র নেই বলে জানান।
ব্রিস্টল ফার্মার হটলাইনে ফোন করা হলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় সম্পৃক্ত দাবি করে জাহিদ হাসান জানান, ব্রিস্টল ফার্মার ওপর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা গত ৯ এপ্রিল তুলে নেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আগে কোনো ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়নি। তবে তার কাছে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার নথি চাইলে তিনি দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহা. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ব্রিস্টল ফার্মার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’