‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’-এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ১০ মে শুরু হচ্ছে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬। পুলিশের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে কাজের সমন্বয় এবং আধুনিক সেবামূলক দক্ষ পুলিশিংয়ের অঙ্গীকার থাকছে পুলিশ সপ্তাহে। চলবে ১৩ মে পর্যন্ত। পুলিশের বার্ষিক কার্যক্রমের পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে ৪ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। জনগণের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে সম্পর্ক বৃদ্ধিসহ সেবার মান নিশ্চিতে নানা ধরনের নির্দেশনা থাকবে এবারের সম্মেলনে।
কর্মকর্তারা জানান, পুলিশিং কার্যক্রমে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা, ডিজিটাল ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পুলিশের শারীরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত দক্ষতা যাচাই, বাহিনীতে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ তৈরি প্রভৃতিকে প্রধান্য দেওয়া হচ্ছে এবার। পুলিশ সপ্তাহের আয়োজন বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধি এবং জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পুলিশ সপ্তাহের স্লোগানের মূল লক্ষ্য হলো-ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে দেশ এবং জনগণের সেবাকে স্থান দেওয়া। পুলিশকে দুর্নীতিমুক্ত করা ও সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করার বিষয়ে জোর দেওয়ার তাগিদ রয়েছে এবারের সম্মেলনের স্লোগানের মাঝে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শহাদাৎ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, বহুমুখী উদ্দেশ্য নিয়ে পুলিশ সপ্তাহ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পুলিশকে দুর্নীতিমুক্ত করা ও সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করার বিষয়ে জোর দেওয়ার তাগিদ রয়েছে এবারের স্লোগানে। এটি কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে তা অর্জনে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। কাজের অগ্রগতি পরিমাপ করতে সূচক ব্যবহার করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি, কার্যকরী এবং কৌশলগত পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, পুলিশের আধুনিকায়ন, জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা, পেশাদারত্ব মূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পুলিশের ভূমিকাকে আরও সুদৃঢ় করা এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সাফল্য গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হবে।
পুলিশ সপ্তাহ কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। যেখানে অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তা-সদস্যদের সঙ্গে তাদের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ফ্যামিলি পুনর্মিলনীর মাধ্যমে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বন্ধন দৃঢ় করার প্রচেষ্টা চালানো হয় পুলিশ সপ্তাহে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুলিশ সপ্তাহ কেবল একটি উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি বৃহৎ প্ল্যাটফর্ম যেখানে সাধারণ জনগণ, মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের বিভিন্ন উইংয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরির সুযোগ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে পুলিশ বাহিনী তাদের সেবার মান আরও গতিশীল করতে চায়। একটি জবাবদিহিমূলক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার কার্যকর মাধ্যম হিসাবে কাজ করবে এটি। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও পুলিশ সপ্তাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জানা গেছে, এবারের পুলিশ সপ্তাহের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গত এক বছরের কার্যক্রমের চুলচেরা বিশ্লেষণ। এতে অর্জিত সাফল্য ও সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে আগামী বছরের জন্য নতুন কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে। অনুষ্ঠানমালার প্রথমদিন বার্ষিক পুলিশ প্যারেডে বিভিন্ন উইংয়ের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজ এবং ইউনিফর্ম ও ফিটনেস পরিদর্শন করা হবে। প্রদর্শন করা হবে পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির স্টল। এদিন সারা বছরের সাহসিকতা ও সেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যক্তিগত পর্যায়ে সদস্যদের পদক প্রদান করা হবে।
দ্বিতীয় দিন উচ্চপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদরে উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিন বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুনাক বার্ষিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। পাশপাশি ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় পুলিশের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া উপস্থাপনের পাশাপাশি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে। জেলা পর্যায়ের এসপি, রেঞ্জ ডিআইজি এবং মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারদের মাঝে কর্মক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যের বিষয়টি উঠে আসবে এ আলোচনায়।
তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠানমালার মধ্যে অন্যতম হলো শিল্ড প্যারেড। এই প্রতিযোগিতায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট অংশগ্রহণ করবে। প্যারেডের মাধ্যমে যেমন বাহিনীর শারীরিক সক্ষমতা ও শৃঙ্খলার পরীক্ষা হবে, তেমনি সেরা ইউনিটকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি প্রদান করা হবে। এদিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইজিপির প্রশাসনিক বিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। আইজিজ ব্যাজ পুরস্কার দেওয়া হবে। পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের সম্মেলনও এদিন অনুষ্ঠিত হবে। এ সম্মেলনে অপরাধ দমনে তদন্তকাজ, বিচারকাজ এবং কারা কর্তৃপক্ষের কাজের মধ্যে সমন্বয়সংক্রান্ত আলোচনা হবে। পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্য দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের স্থাপনা তৈরি এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের ওপর বেশি জোর দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
পুলিশ সপ্তাহের শেষ দিন উচ্চপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইজিপির অপরাধ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় এসবি, সিআইডি, পিবিআই, ট্যুরিস্ট পুলিশ, শিল্প পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, বিভিন্ন রেঞ্জ এবং মেট্রোপলিটনসহ নানা ইউনিট তাদের সফলতার গল্প তুলে ধরবে। বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব আসতে পারে এই সম্মেলনে। এতে সিটিটিসি এবং এটিইউর মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলোকে আরও শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হবে। আধুনিক অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকেও ডিজিটাল মাধ্যমে শক্তিশালী করার পরিকল্পনার অংশ হিসাবে প্রান্তিক পর্যায়ে সাইবার পুলিশিং গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেওয়া হতে পারে। মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া অনলাইন জুয়া এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয় এই সম্মেলনে উঠে আসবে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া পুলিশের অতীত ইতিহাস এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক আমলের নেতিবাচক প্রভাবের কথা উঠে আসতে পারে। জনমনে পুলিশের প্রতি যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, তা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হতে পরে।