চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলন দমনে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী অস্ত্রাগার থেকে চায়না রাইফেলের গুলি ও সিসা গুলি ঘটনাস্থলে পৌঁছে দিয়েছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন পুলিশের বেতার কনস্টেবল নাহিদ মিয়া। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি এসব কথা বলেন।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউশনের ১২তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করেন তাকে। এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ১০ মে দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। জবানবন্দিতে কনস্টেবল নাহিদ মিয়া জানান, গণ অভ্যুত্থানের সময় থেকে এখন পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী থানার বেতার অপারেটর হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি। নাহিদ মিয়া ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের কয়েকটি ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন জবানবন্দিতে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় তৎকালীন এসি (ডেমরা জোন) নাহিদ ফেরদৌস ওয়্যারলেসে সিসা গুলি চান। বিষয়টি তিনি তৎকালীন ওসি (যাত্রাবাড়ী) আবুল হাসানকে জানালে লোকবলের অভাবে আমাকে গুলি নিয়ে যেতে বলা হয়। নিরুপায় হয়ে আমি থানার সামনে থেকে ২০০টি সিসা গুলি এসি নাহিদ ফেরদৌসের কাছে পৌঁছে দিই।
তিনি আরও বলেন, পরদিন ১৯ জুলাইও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ওই দিন যাত্রাবাড়ী মাছবাজার-সংলগ্ন আউটগোয়িং ফ্লাইওভারে ডিউটিরত পার্টি কমান্ডার ব্রাভো ট্যাংগো-২৮২ (এসি ট্রাফিক ডেমরা) ওয়্যারলেসে চায়না রাইফেলের গুলি চান এবং মাছবাজার-সংলগ্ন ইনকামিং ফ্লাইওভারে ডিউটিরত পার্টি কমান্ডার যাত্রাবাড়ী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির চায়না রাইফেলের গুলি চান। বিষয়টি ওসিকে জানালে তিনি অস্ত্রাগার থেকে গুলি দিতে নির্দেশ দেন। বারবার নিষেধ করার পরও নির্দেশ থাকায় আমি অস্ত্রাগার থেকে ৪০০টি গুলি নিই। এর মধ্যে ৩০০টি এসি ট্রাফিক ডেমরা ও ১০০টি ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকিরের কাছে পৌঁছে দিই। গুলি নিয়ে যেতে দেরি হওয়ায় ওয়্যারলেসে পার্টি কমান্ডারদের অশোভন কথাবার্তার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন এই কনস্টেবল।
জবানবন্দিতে নাহিদ মিয়া বলেন, পরে ২০ জুলাই আমি কানাঘুষা শুনতে পাই, ১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির একজনকে গুলি করে হত্যা করেছেন। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে আমি সেই ঘটনার ভিডিও দেখেছি। তিনি বলেন, ওই ভিডিওতে জাকিরকে গুলি করতে দেখা গেছে। যে ছেলেকে গুলি করা হয়েছে, তার নাম তাইম। গণ অভ্যুত্থানের সময় মারা যাওয়া ইমাম হাসান তাইম রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উপপরিদর্শক মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে। তাইম নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজীনগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
এ মামলায় মোট ১১ জন আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯ জন পলাতক এবং দুজন কারাগারে। কারাগারে থাকা দুই আসামি হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান ও সাবেক এসআই মো. শাহদাত আলী। গতকাল এ দুই আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
শাপলা চত্বর : ঢাকাতেই ৩২ জনের প্রাণহানির তথ্য মিলেছে : চিফ প্রসিকিউটর
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, রাজধানীর শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তদন্ত প্রায় শেষের দিকে। শুধু ঢাকাতেই ৩২ জনকে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, তদন্ত শেষ পর্যায়ে, আশা করছি আগামী ৭ জুন নির্ধারিত তারিখেই এ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারব।
শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মের ওই ঘটনা নিয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর অভিযোগ করেছিলেন হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় কয়েক দফা বাড়িয়ে ৭ জুন দিন ঠিক করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। গত ৫ এপ্রিল তিনি এ আদেশ দেন।
১৩ বছর আগে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়ে আলোচনায় এসেছিল কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ ও নারী নীতির বিরোধিতা করাসহ ১৩ দফা দাবি তুলে হেফাজতে ইসলাম ওই কর্মসূচি নিয়েছিল। দিনভর উত্তেজনা ও সহিংসতা ছড়িয়েছিল ওই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। সেই রাতে রাজধানীর অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে পুলিশ-র্যাব ও বিজিবির বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে খালি করা হয়েছিল সমাবেশস্থল।