Image description

স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দেশের অর্থনীতি বহুদূর এগিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি শ্রমিক আজও চরম সংকটে। কম মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি; সেইসঙ্গে দানবীয় রূপ ধারণ করেছে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য। ৯৬টি খাতে এখনো ন্যূনতম মজুরি নেই। বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আশঙ্কা-ইরান যুদ্ধসহ নানা কারণে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সবকিছু মিলে যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির দ্বিমুখী চাপে শ্রমিক। কিন্তু এসব সমস্যা নিরসন এবং আগামী দিনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় শ্রমিকবান্ধব কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। প্রতি বছর মে দিবস এলেই শ্রমিকদের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপর সবাই ভুলে যায়। তবে মালিকপক্ষ বলছেন, শ্রমিকদের কল্যাণকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। রপ্তানি আয়ের দশমিক শূন্য তিন শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে দীর্ঘদিন ধরে দুটি বিষয়কে গর্বের সঙ্গে প্রচার করে আসছেন নীতিনির্ধারকরা। এর একটি হলো-দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যটি সস্তা শ্রম। অর্থাৎ অর্থনীতি শক্তিশালী হলেও শ্রমিকরা এর সুবিধা কম পাচ্ছেন। দেশের অর্থনীতির তিন চালিকাশক্তি হচ্ছে-কৃষি, গার্মেন্ট ও রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। সস্তা শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এ খাতগুলোকেই অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয়। তিন খাতের সঙ্গেই শ্রমিকদের সম্পর্ক বেশি। অর্থাৎ শ্রমিকরাই অর্থনীতি টিকিয়ে রেখেছেন। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অর্থনীতির যে হিসাব ছিল, বিভিন্ন প্রেক্ষাপট সবকিছুই পালটে দিয়েছে। শ্রমিকদের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। তার মতে, দেশের অর্থনীতির মূল শক্তি হলো বেশির ভাগ মানুষ কর্মক্ষম। এদের মজুরিও প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কম। তবে সামগ্রিকভাবে বিচার করলে শ্রমিকদের দক্ষতার অভাব রয়েছে। জনশক্তি এখনো সম্পদে পরিণত হয়নি। ফলে শ্রমিকদের যে সম্ভাবনা আছে, তা কাজে লাগানো যায়নি।

শ্রম আইন ২০০৬ সালের ২(৬৫) ধারায় বলা হয়েছে, শ্রমিক হলো ওই ব্যক্তি, যিনি তার চাকরির শর্ত পালন করে কোনো প্রতিষ্ঠানে বা শিল্পে সরাসরি কাজে নিযুক্ত। এছাড়া ঠিকাদারের মাধ্যমে মজুরি বা অর্থের বিনিময়ে দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরি, ব্যবসা উন্নয়নমূলক অথবা কেরানিগিরির কাজে নিয়োজিতদেরও শ্রমিক বলা যাবে। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী মূলত শ্রমিকদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়। অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল) খাত যেমন: দোকানপাট, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিকাজ ইত্যাদি। আর আনুষ্ঠানিক (ফরমাল) ক্ষেত্র হলো-সরকারি অফিস-আদালত, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সেবা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে নিয়োজিত শ্রমিক। আর এই হিসাবে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশিই শ্রমিক। প্রতি বছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে আসছেন। শ্রমিকের ওপর ভর করেই শক্তিশালী হচ্ছে অর্থনীতি। কিন্তু শ্রমিকের ভাগ্য বদলায় না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দে র অর্থ সম্পাদক কাজী মো. রুহুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও দেশে জাতীয় মজুরি কমিশন গঠন করা হয়নি। শ্রমিকদের ১৪২টি খাতের মধ্যে মাত্র ৪৬টি খাত মজুরি বোর্ডের আওতায় আছে। আবার যেগুলো মজুরি বোর্ডের আওতায় আছে, তার মধ্যে ৩০টি খাতে গত ১০ বছরে মজুরি পরিবর্তন হয়নি। তিনি বলেন, জাতীয় মজুরি কমিশন গঠন করে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের জন্য রেশনের ব্যবস্থা এবং তাদের আবাসন ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রম আইন থেকে আইএলও কনভেনশন পরিপন্থি ধারা বাতিল এবং বন্ধ কারখানা খুলে দিতে হবে।

বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, শ্রমিকরা পোশাক শিল্পের প্রাণ। তাদের শ্রমে-ঘামে এ শিল্প বিশ্ব বাজারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ফলে কীভাবে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন করা যায়, তা নিয়ে আমাদের ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। যেমন-নারায়ণগঞ্জে হেলথ সেন্টার করা হয়েছে। এ সেন্টার থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন শ্রমিক বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে মালিকপক্ষ নিজ উদ্যোগে ও শ্রমিককল্যাণ তহবিল থেকে অর্থ সহায়তার সুপারিশ করে থাকেন। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার রয়েছে। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শ্রমিকরা উচ্চতর পদে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

সরকারি তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে বেকার প্রায় ২৭ লাখ। কিন্তু বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে বেকারের সংখ্যা সাড়ে চার কোটি। এটি ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যুদ্ধ অর্থনীতির হিসাব পালটে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৪ শতাংশ। এই হিসাবে এখন দেশে তিন কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। সংস্থাটি বলছে-২০২৬ সালে আরও ১২ লাখ মানুষ দরিদ্র হবে। এদের বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের শ্রমিক।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুসারে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ পণ্যমূল্য যেভাবে বাড়ছে, মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের ক্ষতি ৪ বিলিয়ন ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এরপর চলতি অর্থবছরে সাড়ে ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু গত জানুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছিল প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের কারণে সেটি আরও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল প্রকাশিত পূর্বাভাসে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ইরান যুদ্ধ অর্থনীতির সব খাতেই প্রভাব ফেলেছে। শ্রমিকের উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা অনুসারে, দেশের মোট শ্রমিকের ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। তাদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়নি। খাতগুলোতে শ্রমিকের জন্য কোনো আইনি সুরক্ষাও নেই। সংস্থাটির তথ্য অনুসারে প্রতি বছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে আসছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক মিলিয়ে ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়-প্রাতিষ্ঠানিক খাতের ৫৮টি পেশায় ন্যূনতম মজুরি কাঠামো রয়েছে। প্রতিবেদনে শ্রমিকদের কল্যাণে ২৫টি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-শ্রমিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন উপযোগী জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ, বোর্ডের সক্ষমতা বাড়ানো এবং খাতভিত্তিক মজুরি তিন বছর পরপর মূল্যায়ন।

বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, বর্তমানে দেশে মোট শ্রমশক্তি সাত কোটি ৩৫ লাখ। কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা চার কোটি ৭০ লাখ।

চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬২ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সেবা খাতের অবদান ৫৬ শতাংশ, শিল্পের ৩৩ এবং কৃষি খাতের ১৩ শতাংশ। আবার জিডিপির সঙ্গে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স যোগ করলে হয় জাতীয় আয়। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু আয় দুই হাজার ৭৮৪ মার্কিন ডলার। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে যা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের পর্যায়ে পড়ে। অর্থনীতির এ অর্জনের পেছনে শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের গেজেট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, একটি খাত থেকে আরেকটি খাতের মজুরির বিশাল পার্থক্য। কোনো খাতের মজুরি দুই হাজার টাকা, আবার কোনো খাতে ১৬ হাজার টাকার বেশি। তৈরি পোশাক খাতে সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা।

বাংলাদেশ এমপ্লায়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, সব শিল্প মালিকই চান শ্রমিকরা ভালো থাকুক। মালিকরা শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। হয়তো আর্থিক সক্ষমতার কারণে সব সময় তা সম্ভব হয় না। এদিকে, শ্রম সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে গত এক দশকে আট হাজার ২৯৮ জন কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। যাদের অধিকাংশই যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাননি। রিপোর্টে আরও বলা হয়, বর্তমানে দেশে আয়বৈষম্য ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের জরিপ অনুসারে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের আয় মোট জাতীয় আয়ের ৪৪ শতাংশ। ওই রিপোর্ট বলছে, দেশের তিন ভাগের দুই ভাগ আয় যাচ্ছে ধনী ৩০ শতাংশ মানুষের হাতে। কিন্তু শ্রমিক বঞ্চিত।