Image description

দেশের লাখ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও সে টাকার ঠিকঠাক হিসাব দিচ্ছে না ইভ্যালি, দালাল প্লাসসহ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো। শুধু তাই নয়, পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকা অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রমেও চলছে নানা টালবাহানা। অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় দালাল প্লাসের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাচ্ছে না। আরেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের অর্থ ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না মালিকানা দ্বন্দে¦। আর সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারীতে জড়িত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি গ্রাহকদের পাওনা টাকার হিসাবই দিচ্ছে না।

সূত্র জানায়, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলাদিনের প্রদীপের ব্র্যাক ব্যাংকে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং সিটি ব্যাংকে প্রায় ৯০ লাখ টাকা আটকে আছে। মামলার কারণে এসব অ্যাকাউন্ট জব্ধ থাকায় অর্থ ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না। আরেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের গ্রাহকদের ৩৪ কোটি টাকার বেশি আটকে আছে এসএসএল কমার্সের কাছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা দ্বন্দে¦ এই অর্থ ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া দালাল প্লাসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গ্রাহকদের ফেরত দেওয়ার মতো কোনো টাকাই নেই।

সূত্র জানায়, ব্যবসা বন্ধের পর দালাল প্লাস তার মাদার প্রতিষ্ঠান ব্রোকার ডিজিটাল সলিউশন লিমিটেডে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্থানান্তর করে। তবে মামলার কারণে জব্দ রয়েছে ওই মাতৃ প্রতিষ্ঠানটির হিসাবটিও। এ ছাড়া আলেশা মার্টের কাছে বর্তমানে ৮ হাজার ২৮৮ গ্রাহকের প্রায় ১১৬ কোটি টাকা পাওনা আছে। প্রতিষ্ঠানটি এসএসএল কমার্সে আটকে থাকা অর্থ গ্রাহকদের ফেরত দিতে একজন আইনজীবীকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রদান করেছে বলে জানা গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, অর্থ ফেরত প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে ইভ্যালির ক্ষেত্রে। প্রতিষ্ঠানটিতে গ্রাহকদের সর্বমোট কত টাকা পাওনা রয়েছে তার সঠিক হিসাব জানা যায়নি। শুধুমাত্র পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকা অর্থের যে হিসাব দিয়েছে ইভ্যালি, সে অনুযায়ী নগদের কাছে প্রতিষ্ঠানটির ১৭ কোটি ৬৯ লাখ, বিকাশের কাছে ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা, এসএসএল কমার্সের কাছে ৩ কোটি ২৪ লাখ, উপায়-এর কাছে ৬১ লাখ এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকে ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা আটকে ছিল। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ১৩২ জন গ্রাহককে ২১ কোটি ৭৭ লাখ ৭২ হাজার ১৪৯ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সাউথ ইস্ট ব্যাংকে আটকে থাকা অর্থ থেকে ইভ্যালির ১২১ জন গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে যাচাইবাছাই করে ১ কোটি ১৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ব্যাংকটিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকা অর্থের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৩৮৩ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে কিউকম। এ ছাড়া আলোচিত কোম্পানি আলেশা মার্ট প্রায় ৪১ কোটি এবং দালাল প্লাস প্রায় ২৩ কোটি টাকার মতো ফেরত দিয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, দেশের সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি মাত্র ২১ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে। অর্থাৎ বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম অর্থ ফেরত দিয়েছে ইভ্যালি।

সূত্র জানায়, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়েছে। ওই সভায় ই-কমার্স সংক্রান্ত গ্রাহকদের দাবিনামা ও অভিযোগ বিষয়ে একটি ডাটাবেজ প্রণয়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে। তবে ডাটাবেজ করার জন্য গ্রাহকের নাম, মোবাইল নম্বর, ইনভয়েস নম্বর, পেমেন্টের পরিমাণ রিফান্ডের পরিমাণ এবং অবশিষ্ট অর্থ সম্পর্কে নির্ধারিত ছকে তথ্য চাইলেও ব্যাংক ও পেমেন্ট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো এসব তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে।

এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের প্রায় ৬২ হাজার আবেদন যাচাইবাছাই করছে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর। টাকা ফেরত দেওয়া ক্ষেত্রে বড় ঝামেলা হচ্ছে, তথ্যের ঘাটতি। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের তালিকা দিতে গড়িমসি করে। তালিকা পাওয়ার পর আবার পেমেন্ট গেটওয়ে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তথ্য দিতে চায় না। হাজার হাজার আবেদন যাচাইবাছাই করার মতো জনবলও নেই জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের। এতসব জটিলতা মোকাবিলা করে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।