Image description
এসআই পদে সরাসরি নিয়োগ কার্যক্রম

পুলিশে উপপরিদর্শক (এসআই) পদে সরাসরি নিয়োগের সিদ্ধান্তে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিজেদের ‘কপাল পোড়া’র শঙ্কা দেখছেন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ও কনস্টেবলরা। সরাসরি এ নিয়োগ বাস্তবায়ন হলে পদ শূন্য না থাকায় তারা পদোন্নতি পাবেন না বলে মনে করছেন। এতে কনস্টেবল থেকে এএসআই পর্যন্ত বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তারা পুলিশ রেগুলেশন-১৯৪৩ (পিআরবি হিসেবে পরিচিত) অনুযায়ী নিয়োগ ও পদোন্নতি আশা করছেন। পদোন্নতি প্রত্যাশী এএসআই ও কনস্টেবলদের কাছ থেকে মিলেছে এ তথ্য।

সম্প্রতি সরকারের মৌখিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুলিশ বাহিনীতে সরাসরি চার হাজার এসআই নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে পুলিশের পলিসি গ্রুপের বৈঠকে সরাসরি এ নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। তবে পুলিশ রেগুলেশন-১৯৪৩ বা পিআরবির ৭৪১ (খ) ধারা অনুযায়ী এসআই শূন্য পদ পূরণের ক্ষেত্রে সরাসরি শতকরা ৫০ ভাগ নিয়োগের বিধান রয়েছে। বাকি ৫০ ভাগ বাহিনীতে কর্মরত এএসআইদের পদোন্নতি দিয়ে পূরণের বিধান রয়েছে। তবে পলিসি গ্রুপের বৈঠকে চার হাজার এসআই নিয়োগের জন্য পুলিশ রেগুলেশনের ধারা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতেই মূলত বাহিনীতে কর্মরত এএসআই ও কনস্টেবলদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ শূন্য পদে এএসআইরা পদোন্নতি পেলে কনস্টেবলদের মধ্য থেকে এএসআই পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাহিনীতে প্রয়োজন হলে সরাসরি নিয়োগ দিতে পারে। তবে তা হিসাব করে দেওয়া উচিত, যাতে যোগ্য কারও পদোন্নতিতে জটিলতার সৃষ্টি না হয়। উপরের পদে সরাসরি নিয়োগ দিলে নিচের পদগুলোতে ভবিষ্যতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তা ছাড়া এতে বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামোর ভারসাম্য বিনষ্ট হতে পারে। পদোন্নতি বঞ্চিতরা হতাশ হতে পারেন, যার প্রভাব পড়বে দৈনন্দিন কার্যক্রমে।

অবশ্য সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা কালবেলাকে বলেন, এ পদগুলোতে নিয়ম আছে সরাসরি যত নিয়োগ হবে, সেই অনুপাতে বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষার মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। তবে সরাসরি নিয়োগ যদি হিসাব করে দেওয়া হয় অর্থাৎ কত পদ খালি আছে, কত নিয়োগ দেওয়া হবে, কীভাবে পদোন্নতি দেওয়া হবে—এসব হিসাব করে দিলে প্রভাব পড়ার কথা নয়।

গত ৬ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত পুলিশের পলিসি গ্রুপের সভাতেও এসআই পদে সরাসরি নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়। তাতে পুলিশ সদর দপ্তরের অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি মাহবুবুল করিম সভায় অবহিত করেন, পুলিশের ক্যাডার ও অধস্তন সব পদে যৌক্তিক হারে পদ সৃষ্টি না করে শুধু এন্ট্রি পদে পদ সৃষ্টি করা হলে ভবিষ্যতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামোর ভারসাম্যও বিনষ্ট হবে।

পুলিশে সরাসরি এসআই নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে গতকাল বুধবার অতিরিক্ত ডিআইজি (অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট) মাহবুবুল করিম কালবেলাকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের পর চার হাজার এসআই নিয়োগের প্রস্তাবটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সেটি অনুমোদন পেয়ে এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

সরাসরি এ নিয়োগের ক্ষেত্রে বাহিনীতে থাকা এএসআইদের বিভাগীয় পদোন্নতিতে কোনো জটিলতা হবে কি না, জানতে চাইলে পুলিশের এ কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে এএসআই থেকে এসআই পদে পদোন্নতি পরীক্ষায় পাস করে অপেক্ষায় থাকা সদস্যরা দাবি করছেন, সরাসরি নিয়োগ হলে এসআই পদে আর পদ শূন্য থাকবে না। এতে তাদের পদোন্নতি আটকে যাবে। বছরের পর বছর ধরে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পদোন্নতি পরীক্ষা দিয়ে পাস করার পরও পদের অভাবে এমনিতেই তাদের পদোন্নতি হয় না। এর মধ্যে আবার উপরের পদে সব সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের পদোন্নতির আশা একেবারেই নষ্ট হয়ে যাবে।

দুজন এএসআই বলেছেন, চার হাজার এসআই সরাসরি নিয়োগে তাদের কোনো আপত্তি নেই। সরকার প্রয়োজন মনে করলে আরও বেশি নিয়োগ দিতে পারে। তবে বাহিনীতে থাকা সদস্যরা নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি না পেয়ে বঞ্চনার শিকার হলে নিশ্চিতভাবেই এর প্রভাব পড়বে দৈনন্দিন কাজে। দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি করেও পদোন্নতি না পেলে কনস্টেবল পদে নিয়োগেও তরুণরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। তাই পুলিশ রেগুলেশন অনুযায়ী তারা পদোন্নতি চান। সেখানে শূন্যপদে মোট নিয়োগের ৫০ ভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের কথা থাকলেও প্রয়োজনে তা কম হলেও তাদের আপত্তি নেই। তবে নিয়মটা থাকা উচিত।

কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে পদে পদোন্নতির আশায় থাকা সদস্যরাও একই কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, বাহিনীতে থাকা এএসআইরা পদোন্নতি পেয়ে এসআই হলে তারাও ওই শূন্যপদে এএসআই হতে পারবেন। কিন্তু উপরের সব পদে সরাসরি নিয়োগ হলে তারা বঞ্চনার শিকার হবেন।

পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছরই এএসআই থেকে এসআই এবং কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে বিভাগীয় পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা নেয় পুলিশ সদর দপ্তর। প্রথমে এমসিকিউতে পাস করলে লিখিত পরীক্ষা ও তৃতীয় পর্যায়ে ভাইভা এবং মাঠ প্যারেডে পাস করে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। এ পদোন্নতি পরীক্ষার যোগ্যতা অর্জনের জন্য একজন এএসআইকে ওই পদে ১৩ থেকে ১৪ বছর এবং কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে পদোন্নতির পরীক্ষা দিতে ৬ বছর চাকরি করতে হয়। তবে চাকরি জীবনে কারও কোনো গুরুদণ্ড, ফৌজদারি অপরাধ এবং যে কোনো অভিযোগ তদন্তনাধীন থাকলে তারা পদোন্নতি পরীক্ষা দিতে পারেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ বাহিনীতে বর্তমানে এএসআই (নিরস্ত্র) ২২ হাজার ৭৩৮ পদ রয়েছে। অন্যদিকে কনস্টেবল রয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। তাদের মধ্য থেকে পরীক্ষার প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জনের পর প্রায় প্রতি বছর এসআই পদে পদোন্নতি পরীক্ষা দিতে অন্তত ১২ হাজার এএসআই পরীক্ষায় অংশ নেন। সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এ পরীক্ষায় ৯৪৬ জন এএসআই চূড়ান্তভাবে পদোন্নতির জন্য মনোনীত হন। আগের বছর চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছিলেন ৬১৬ জন।

তবে কনস্টেবল থেকে এএসআই এবং এএসআই থেকে এসআই পদে পরীক্ষার এ পাসের মেয়াদ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১ বছরের। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে কোনো কারণে শূন্যপদে পদোন্নতি দেওয়া না হলে তাদের ফের পদোন্নতি পরীক্ষার টেবিলে বসতে হয়। যদিও এসআই থেকে ইন্সপেক্টর বা অন্যান্য ঊর্ধ্বতন পদে পদোন্নতির জন্য জীবনে একবার পরীক্ষা দিতে হয়। এরপর পদ শূন্য থাকা সাপেক্ষে পদায়ন করা হয়ে থাকে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডিতে কর্মরত তিনজন এএসআই কালবেলাকে জানান, তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। এরপর পরিবারকে সময় দিতে হয়। এসব করেই তাদের পদোন্নতির পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করতে হয়। সেই পাসের মেয়াদ এক বছর হলেও পদ শূন্য না থাকায় প্রতি বছর পদোন্নতি মেলে না। এজন্য তাদের কাউকে কাউকে তিন থেকে চার বছর ধরে পদোন্নতি পরীক্ষায় পাস করতে হয়। এরপরও পদ না থাকায় পদোন্নতি মেলে না। এখন সেই পদে সরাসরি এসআই নিয়োগ দিলে তাদের পদোন্নতি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

তবে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন কালবেলাকে বলেন, সরাসরি চার হাজার এসআই নিয়োগের উদ্যোগ বাহিনীর কার্যক্রম ও জনসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ। এতে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ কমে যাবে—এমন আশঙ্কার কারণ নেই।

তিনি বলেন, পদোন্নতি একটি নির্ধারিত নীতিমালা, যা যোগ্যতা ও শূন্যপদের ভিত্তিতে চলমান থাকবে। নতুন নিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ পদোন্নতি—দুই প্রক্রিয়াই সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে, যাতে বাহিনীর সক্ষমতা যেমন বাড়ে, তেমনি সদস্যদের ন্যায্য ক্যারিয়ার অগ্রগতিও নিশ্চিত হয়।