বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। অনিবার্য হয়ে উঠছে পানিবদ্ধতার ভোগান্তি। সড়ক, বাসা-বাড়ি, দোকানপাট, আড়ত-গুদামে পানি ডুকে পড়ায় ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। তলিয়ে যাওয়া নগরীতে থমকে যাচ্ছে জনজীবন। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে সৃষ্ট পানিবদ্ধতা নগরজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিশেষ করে পরীক্ষার্থীসহ স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, কর্মজীবীদের অন্তহীন দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। পানি সরে যাওয়ার পরও পাহাড় থেকে নেমে আসা বালু, মাটির জঞ্জাল আর নালা নর্দমা উপচেপড়া আবর্জনায় সয়লাব পুরো নগরী।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি কারণে নগরীর প্রধানসড়কসহ কয়েকটি সড়কে কাদা-পানিতে বেহাল দশা। বৃষ্টিতে এসব সড়ক গ্রামীণ কাঁচা রাস্তার রূপ ধারণ করেছে। চট্টগ্রামকে পানিবদ্ধতার এই অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে ১৪ হাজার কোটি টাকায় নেয়া হয়েছে চারটি প্রকল্প। অথচ অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বেপরোয়া দখলবাজি আর সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়নহীতায় এসব প্রকল্পের সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী। কোনটি প্রকল্পই যথাসময়ে শেষ হয়নি।
অগ্রাধীকার ভিত্তিক এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতিতে কেবল জনদুর্ভোগই বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে প্রকল্পের ব্যয়। সিামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে নগরীর বিরাট অংশ। মঙ্গলবারের কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরীর বেশিরভাগ এলাকা কোমর থেকে গলা সমান পানিতে তলিয়ে যায়। সড়ক, বাসা বাড়ি দোকানপাট আড়তে পানি প্রবেশ করে। পানিতে তলিয়ে যায় রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সাগর উত্তাল থাকায় প্রবল জোয়ারের কারণে জমে যাওয়া পানি সরতে দেরি হয়। দুটি খালে বাঁধ দিয়ে রাখার ফলে গতকালও নগরীর প্রবর্তক মোড়সহ কয়েকটি এলাকায় পানিবদ্ধতা অব্যাহত থাকে। এর ফলে নগরীর চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ওই এলাকার হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘিœত হয়।
রোগী এবং তাদের স্বজনদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। বেশিরভাগ ভবনের নিচতলা গতকালও পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখা যায়। নগরীর অন্য অংশে ধীরে ধীরে পানি সরে গেলেও পাহাড়ী ঢলে নেমে আসা বালু মাটির জঞ্জাল আর নালা নর্দমা থেকে উঠে আসা আবর্জনায় সয়লাব হয়ে যায় পুরো নগরী।
গতকাল বুধবার পানিবদ্ধতা কিছুটা কম হলেও বৃষ্টিতে সড়কে সৃষ্টি হওয়া কাদা-পানিতে চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয় নগরবাসীকে। বাসা-বাড়িতে উঠে আসা আবর্জনা সরাতে দিনভর ব্যস্ত সময় পার করেন পানিতে তলিয়ে যাওয়া এলাকার বাসিন্দারা। বাড়ির নিচ তলায় পানি প্রবেশ করায় আসবাবপত্র মালমাল ভিজে যায়। দোকানপাট আর আড়তের মূল্যবান মালামাল বিনষ্ট হয়। কাদা মাটি সরাতে গলদঘর্ম হন ব্যবসায়ীরা। গতকাল নগরীর কয়েকটি এলাকা ঘুরে সীমাহীন জনদুর্ভোগের এমন চিত্র দেখা যায়।
স্থানীয়রা বলছেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএর পানিবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের জন্য হিজড়া খাল ও জামালখান খালে বাঁধের কারণে প্রবর্তক মোড়, চকবাজার, বাদুরতলা, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর, ষোলশহর, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ কয়েকটি এলাকায় নজিরবিহীন পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। নগরীর বেশির ভাগা নালা-নর্দমা ও খাল ভরাট হয়ে আছে। ফলে পানি সরতে না পারায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থায় গলদের কারণে প্রতিদিন পলিথিনসহ হাজার হাজার টন বর্জ্য নালা-নর্দমায় গিয়ে পড়ছে। খাল-নালার দুপাড়ের বাসিন্দাদের অনেকে সরাসরি বর্জ্য খালে ফেলছেন। সড়ক, অলিগলিতে পড়ে থাকা বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে গিয়ে নালা-নর্দমায় পড়ছে। পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকায় বৃষ্টির পানির সাথে পাহাড় টিলা থেকে নেমে আসা বালু আর মাটি নালা-নর্দমা আরো ভরাট করে দিচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে নগরী।
নগরীর জুবিলি রোড, বাটালি রোড, পাঠানটুলি, আগ্রাবাদ এক্সেস রোডসহ কয়েকটি সড়কে চট্টগ্রাম ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের পাইপ লাইন স্থাপনের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। পতেঙ্গা থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণ কাজ চলছে ধীরগতিতে। নগরীর ফকিরহাট, মাইলের মাথা, চট্টগ্রাম ইপিজেড, স্টিল মিল এলাকায় চলছে র্যাম্প নির্মাণের খোঁড়খুঁড়ি। এক্সপ্রেসওয়ের নীচে সড়ক সম্প্রসারণ নালা-নর্দমা সংস্কার কাজও চলছে একই সময়ে। এইসব কাজের জন্য রাস্তা কেটে রাখা হয়।
বৃষ্টি হতেই এসব এলাকায় কাদা-মাটিতে নালা নর্দমা ভরাট হয়ে পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পানি সরে গেলেও কাদায় ভরাট হয়ে গেছে এসব এলাকার সড়ক। ইপিজেড এলাকায় সড়কের দুইপাশে থৈ থৈ পানি। নগরীর প্রধান সড়ক কাটগড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত অংশ এখন কাদা-পানিতে সয়লাব। হঠাৎ বৃষ্টিতে নগরীর এমন বেহাল দশায় ক্ষুদ্ধ নগরবাসী। তারা সিটি কর্পোরেশন, সিডিএসহ সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন।
তবে সিটি মেয়র বলছেন, সিডিএর আওতাধীন খাল সংস্কার কাজ- বিশেষ করে হিজরা খাল ও জামালখান খালের সংস্কার কাজ চলমান থাকায় কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। যার ফলে বিভিন্ন স্থানে পানিবদ্ধতা দেখা দেয়। জামালখান খালের বাঁধ কেটে দেয়া হলেও হিজড়া খালের বাঁধ কাটা যায়নি। এ কারণে প্রবর্তক মোড়ে এখনও পানিবদ্ধতা রয়ে গেছে। নগরীর খাল নালা ভরাট হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, বর্ষা সামনে রেখে এসব খাল নালা সংস্কার শুরু হয়েছে। তবে নগরবাসীর একটি অংশের অসচেতনতার কারণে আবর্জনা ফেলায় খাল নালা আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেন, হিজড়া খাল ও জামালখান খালে সংস্কার কাজ চলছে। আমাদের লক্ষ্য ছিল কিছু কাজ এগিয়ে তারপর
কেটে দেব। কারণ খালের ভিতর বাঁধ দিতে সময় লাগে। কিন্তু এখন হঠাৎ করে ভারি বৃষ্টি হয়েছে। তাই দুই খালের বাঁধ কেটে দেয়া হচ্ছে।এদিকে পানিবদ্ধতা নিরসনে নেয়া প্রকল্পগুলোও চলছে কচ্ছপ গতিতে। নগরীর ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টি নিয়ে ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট একনেকে পানিবদ্ধতা নিরসনের ‘মেগা প্রকল্প’ অনুমোদন হয়। পরের বছর ২৮ এপ্রিল চশমা খালের আবর্জনা অপসারণের মধ্যে দিয়ে এর কাজ শুরু করে সিডিএ। প্রকল্পটির পূর্ত কাজ করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। প্রকল্প শেষের সময় ধরা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুন।
পরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সংশোধন শেষে প্রকল্প ব্যয় আরো তিন হাজার ১০ কোটি টাকা বেড়ে হয় মোট আট হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। মেয়াদ ঠিক করা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। সিডিএর তরফে দাবি করা হয়েছে এ প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। অথচ এর কোন সুফল নেই। পানিবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এক হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, সিডিএ দুই হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড এক হাজার ৫০৮ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সবকয়টি প্রকল্প চলছে ধীরগতিতে।
গত বছর জানুয়ারি থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশে চারজন উপদেষ্টার সমন্বয়ে পানিবদ্ধতা কমাতে নগরীর খাল নালা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপি এবং জামায়াত কর্মীরা খাল পরিষ্কারে মাঠে নামে। এর সুফলও পাওয় যায, গেল বর্ষায় পানিবদ্ধতা সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসে। এবার আগাম এমন কোন কর্মসূচি নেয়নি সিটি কর্পোরেশন।
কর্পোরেশনের তরফে বলা হচ্ছে বাজেটের অভাবে নালা নর্দমা পরিষ্কার কাজ শুরু করা যায়নি। চলতি মাসে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়ার পর মাঠে নামে চসিক কর্মীরা। গত সপ্তাহে জামালখান থেকে নালা নর্দমা পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়। তবে এর মধ্যে একদিনের ভারি বর্ষণে নগরীর বিরাট অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। দ্রুত নালা নর্দমা পরিষ্কার করা না হলে সামনের বর্ষায় পানিবদ্ধতা আরো ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।