Image description

আবারও উত্তপ্ত ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড। দেশে ও বিদেশে অবস্থান করে কলকাঠি নাড়ছে দেশের অপরাধ জগতের গডফাদাররা। চলছে এলাকা নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। রয়েছে প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের নেশা। এতে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়ছে। রক্ত ঝরছে। আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জামিনে মুক্ত হওয়ার পর গত আট মাসে অন্তত তিনজন শীর্ষ সন্ত্রাসী খুন হয়েছেন। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার খুন হলেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম দুর্ধর্ষ ডন নাঈম আহমেদ টিটন। যার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক হত্যা মামলা। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসাবেও তার নামডাক রয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডে। আরেক ভয়ংকর শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সম্বন্ধী ছিলেন তিনি। ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় শত শত মানুষের সামনে এলোপাতাড়ি গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়।

গোয়েন্দারা বলছেন, টিটনের মতো দুর্ধর্ষ এই সন্ত্রাসীকে হত্যা করতে হলে বেপরোয়া শুটারদের ব্যবহার করা হয়েছে। টিটনের বড় ভাই অভিযোগ করে বলেছেন, বসিলার গরুর হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলালের দ্বন্দ্ব চলছিল। এ জন্যই টিটনকে হত্যা করা হতে পারে। তবে টিটন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর জানিয়েছিলেন, তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। ইমনের কারণে তিনি এই অন্ধকারজগতে প্রবেশ করেছেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, নাইম আহমেদ টিটন রাজধানীর পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন। আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণাধীন ও  ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি হচ্ছে আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডাবাজির বেশ কয়েকটি ঘটনায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সরাসরি কানেকশন মিলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের সত্যতা মিলেছে। প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীরা তৎপরতা চালালেও শুধু কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেই পুলিশি তৎপরতা বাড়ে। অন্যদিকে সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া আচরণ ও প্রাণের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী মুখ খুলতে চান না। এমনকি তারা থানায় অভিযোগ ও পুলিশকে বিষয়টি জানান না। পাশাপাশি দাগি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তাদের নজরদারিতে রাখা হয় না। অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অবস্থানও জানে না পুলিশ। এতে দাগি অপরাধীরা বেপরোয়া তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আতঙ্ক ছড়িয়েছে জনমনে।

গত বছর ১১ নভেম্বর পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারেক সাইদ মামুনকে। এরপর আন্ডারওয়ার্ল্ডের উত্তপ্তের বিষয়টি সামনে আসে। হত্যার নেপথ্যে মামুনের সঙ্গে তার এক সময়কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের দ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও মামুন একসময় হাজারীবাগ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার আতঙ্ক ছিলেন। তাদের গড়ে তোলা বাহিনীর নাম ছিল ‘ইমন-মামুন’ গ্রুপ। বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল তারা। খুনের মধ্যে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলা অন্যতম। ২০২৩ সালে মামুন কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে নিজের বলয় তৈরির চেষ্টা করেন। এতেই ইমন গ্রুপের সঙ্গে চরম শত্রুতার সৃষ্টি হয়। ওই সময় কারাগার থেকেই মামুনকে একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করে ইমন। তখন থেকেই মামুন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদের সঙ্গে হাত মেলান। জিসান বিদেশে থাকলেও তার গ্রুপের ক্যাডারদের সঙ্গে নিয়ে নতুন চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য গড়ে তোলে মামুন। রাজধানীর আফতাবনগর, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও এলাকা মামুন ও জিসানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। ইমনের চাঁদাবাজির বাধা হয়ে দাঁড়ায় মামুন ও জিসান। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হত্যা করা হয়। প্রায় একই কায়দায় খুন হন টিটন। মামুন খুন হয়েছিলেন দিনদুপুরে। আর টিটন সন্ধ্যার পর। শত শত মানুষের সামনে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ধানমন্ডি, রায়েরবাজার, মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, নিউমার্কেটের আধিপত্য নিয়েও চলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দ্বন্দ্ব। এসব এলাকা মূলত ইমনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে টিটনের উপস্থিতি ইমন ভালো ভাবে নেননি। এ কারণেও তাকে হত্যা করা হতে পারে। তবে টিটনের পরিবারের অভিযোগের তির পিচ্চি হেলালের দিকে। পুলিশের সূত্র জানায়, পিচ্চি হিলাল বা ইমনের পেছনে যিনি থাকুক না কেন ঘটেছে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে। 

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী মদতপুষ্টরা পালিয়ে যাওয়ায় সেই অন্ধকার জগতে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এই শূন্যতা পূরণে শুরু হয় ‘ডু-অর-ডাই’ প্রতিযোগিতা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শীর্ষ সন্ত্রাসী আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস, শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন, খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু ও আরমান কারাগার থেকে মুক্তি পান। মোল্লা মাসুদও দেশে ফিরে আসেন ভারত থেকে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরেন আমিন রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর। তারা তাদের পুরোনো আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মরিয়া হয়ে ওঠেন। মূলত আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি দখলবাজির জেরেই তাদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। তারা বের হওয়ার পরই শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন, সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ ও ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল গ্রুপের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিষয়টি অনেকের মুখে মুখে। যদিও তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে কুষ্টিয়া থেকে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। নজরদারিতে রাখা হয় আরও কয়েকজনকে। বিষয়টি টের পেয়ে দেশ ছাড়েন পিচ্চি হেলাল। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তেজগাঁও সাত রাস্তায় মামুনকে লক্ষ্য করে গুলি করে ইমন গ্রুপের সদস্যরা। তখন ইমন কারাগারে বন্দি ছিলেন। ওই ঘটনায় তারিক সাইফ মামুন আহত হলেও নিহত হন পথচারী ভুবন চন্দ্র শীল। তবে শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম অপরাধ জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, মোহাম্মদপুরের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ আন্ডারওয়ার্ল্ডে তৎপরতা চালাচ্ছেন। ব্যাংকক আর মালয়েশিয়া থেকে রাজধানীর ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও হাজারীবাগ এলাকায় সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা করছেন সানজিদুল ইসলাম ইমন। মোহাম্মদপুর ও আশপাশ এলাকায় নিজের সন্ত্রাসী বাহিনী চালাচ্ছেন পিচ্চি হেলাল। ইতোমধ্যে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও খুনাখুনিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ইমন, পিচ্চি হেলাল এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও জিডি হয়েছে। গত বছর ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই ইমন ও পিচ্চি হেলাল বাহিনীর মধ্যে আধিপত্যের লড়াই চলছে। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আধিপত্য বিস্তার, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ ও দুর্বল আইন প্রয়োগ-এই তিন কারণেই খুন-সহিংসতা বাড়ছে। আইনের শাসনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।