Image description

হৃদয়ে ক্ষরণ হচ্ছে ফ্লোরিডায় নিহত বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থীর বন্ধুদের। তারা এই হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও। তারা বলেছেন, প্রবাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা পরিবার হিসেবে একসঙ্গেই থাকেন। তাদের একজন আবির আল হাসিব সৌরভ বলেন, আপনাদের বুঝতে হবে, আমরা বাংলাদেশিরা এখানে পরিবারের মতো থাকি। আমরা একসঙ্গে খাই, ঘুরি, একসঙ্গে থাকি। মঙ্গলবার ফ্লোরিডার টাম্পা শহরে আদালতে জড়ো হন তারা। পিএইচডি করতে এই শহরের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় যোগ দিয়েছিলেন জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। সম্প্রতি তারা নিখোঁজ হন। পরে লিমনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, বৃষ্টিকেও হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ২৬ বছর বয়সী অভিযুক্ত হিশাম আবুঘারবিয়েহকে হত্যা মামলায় জামিন ছাড়াই আটক রাখার নির্দেশ দেন বিচারক। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাম্পা বে ২৮।

বাংলাদেশি ওই দুই শিক্ষার্থীর পরিবার বাংলাদেশে থাকায়, সহপাঠী ও বন্ধুরাই আদালতে উপস্থিত হয়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব করেন মঙ্গলবার। তারা আদালতে গিয়ে বিচার প্রক্রিয়া নিজের চোখে দেখতে এবং তাদের সম্প্রদায়ের অন্যদের জানাতে চান। তাদের একজন সালমান সাদিক শুভ বলেন, আমরা জানতে চাই আমাদের বন্ধুদের কী হয়েছে। আমরা নিজেদের দায়িত্ব মনে করি। রিফাতুল ইসলাম বলেন, ৮ হাজার মাইল দূরে এসে আমরা একে অপরের পরিবারের মতো। কিন্তু যেটা ঘটেছে, সেটা মেনে নেয়া যায় না। আমাদের নিরাপদ জায়গা- আমাদের বাসা। আমাদের ঘরেই তাদের হত্যা করা হয়েছে। এর নিন্দা জানানোর কোনো ভাষা নেই।

স্টেট অ্যাটর্নি সুজি লোপেজ বলেন, এত সংখ্যক বন্ধুর উপস্থিতি তিনি আশা করেননি। তিনি বলেন, তারা যেভাবে একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে, তা সত্যিই শক্তিশালী। হিলসবরো কাউন্টির বিচারক জে. লোগান মারফি নির্দেশ দেন, অভিযুক্ত যেন কোনো সাক্ষী বা ভুক্তভোগীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না করে। এদিন আবুঘারবিয়েহ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তার আইনজীবী জেনিফার স্প্র্যাডলি তার উপস্থিতি মওকুফ করেন এবং প্রি-ট্রায়াল আটক মেনে নেন। তার বিরুদ্ধে দু’টি প্রথম-ডিগ্রি হত্যা ছাড়াও আরও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। অন্যান্য অভিযোগে জামিন নির্ধারণ করা হলেও হত্যার অভিযোগে তিনি জামিন ছাড়াই আটক থাকবেন। প্রসিকিউটররা জানান, মামলাটি ৭ই মে গ্র্যান্ড জুরিতে তোলা হবে। দোষী প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে তার।

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা নিহত দুই শিক্ষার্থীর স্মরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশি স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, মরণোত্তর ডিগ্রি প্রদান এবং বার্ষিক স্মরণ অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছে। লিমনের সুপারভাইজার ও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গো-ফান্ডমি’তে তহবিল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। চালু হওয়ার পর থেকেই ৮০ হাজার ডলারের বেশি সংগ্রহ হয়েছে। আবির আল হাসিব সৌরভ বলেন, এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ শুরু করেছি। তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটাই- ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

ওদিকে জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়া নিয়ে ভয়াবহ ও নৃশংস কিছু তথ্য প্রকাশ করেছেন তদন্তকারীরা। এর মধ্যে লিমনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃষ্টি এখনো নিখোঁজ। তবে এরই মধ্যে একটি জলাশয় থেকে একখণ্ড দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তা বৃষ্টির। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত করেনি তদন্তকারীরা। তদন্তকারীরা মনে করছেন, বৃষ্টিকেও হত্যা করা হয়েছে। কিছু তথ্য প্রকাশ করেছেন তারা। তার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে অনলাইন সিএনএনে।

এতে বলা হয়, ৭ ও ১১ই এপ্রিল আবুঘারবিয়েহ অ্যামাজন থেকে ডাক্ট টেপ, ময়লার ব্যাগ, লাইটার ফুয়েল এবং আগুন ধরানোর সরঞ্জামসহ বিভিন্ন জিনিস কেনেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ১৩ই এপ্রিল চ্যাটজিপিটির সঙ্গে তার কথোপকথন হয়। প্রি-ট্রায়াল আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আবুঘারবিয়েহ চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেন- ‘যদি কোনো মানুষকে কালো ময়লার ব্যাগে ভরে ডাম্পস্টারে ফেলে দেয়া হয়, তাহলে কী হয়?’

চ্যাটবট উত্তরে জানায়, এটি বিপজ্জনক শোনাচ্ছে। এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তারা কীভাবে এটা জানতে পারবে?’
১৬ই এপ্রিল দিনের বেলায় বন্ধুদের সঙ্গে লিমন ও বৃষ্টির যোগাযোগ ছিল। কিন্তু পরে আর তাদের পাওয়া যায়নি। তারা কয়েকবার ফোনে সংক্ষিপ্ত কথা বলেন। সিসিটিভিতে দেখা যায় দুপুরে বৃষ্টি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হাঁটছেন। কিন্তু সন্ধ্যায় বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি যাননি এবং ফোনও ধরেননি।

লিমনের ফোন লোকেশন দেখায়, তিনি বাড়ি ও ক্যাম্পাস এলাকায় ছিলেন। পরে রাত ৭টা ৪৩ মিনিটে ক্লিয়ারওয়াটারে যান, যা তার বাসা থেকে প্রায় ৩২ মাইল দূরে। প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে আবুঘারবিয়েহর সাদা হুন্ডাই জেনেসিস জি-৮০ গাড়িকেও একই এলাকায় দেখা যায়। ফোন ও ট্রাফিক ডাটা অনুযায়ী, সারারাত তাদের অবস্থানের মধ্যে মিল পাওয়া যায়। রাত প্রায় ১০টা ৩০ মিনিটে আবুঘারবিয়েহর ফোন থেকে ডোরড্যাশে ময়লার ব্যাগ, লাইসোল ওয়াইপস, ফেব্রিজ ইত্যাদি অর্ডার করা হয় এবং আধা ঘণ্টার মধ্যে তা অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে যায়। লিমনের আরেক রুমমেট দেখেন, আবুঘারবিয়েহ একটি কার্ট ব্যবহার করে নিজের রুম থেকে কার্ডবোর্ড বাক্স ডাম্পস্টারে নিয়ে যাচ্ছেন।