অসময়ের বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পানিতে ডুবে গেছে হাওরাঞ্চলের হাজারো কৃষকের স্বপ্ন। বছরের একমাত্র ফসল ঘরে তুলতে না পেরে দিশাহারা তারা। হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন হাওরের কৃষকের মাঝে এখন কেবলই হাহাকার। একই অবস্থা খাগড়াছড়িসহ দেশের অন্যান্য এলাকায়ও। গত ক’দিনের টানা বর্ষণে অথৈই পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ওই সব এলাকার বোরো ফসল।
স্টাফ রিপোর্টার, মৌলভীবাজার থেকে জানান, চোখের সামনেই ডুবে গেছে সোনালি ফসল বোরো। সেইসঙ্গে ঘটছে কৃষকের স্বপ্নের সমাধি। গেল ক’দিনের টানা ভারী বর্ষণে পানিতে টইটম্বু্বর নদী ও হাওর। হঠাৎ অতিবৃষ্টিতেই বোরো ধানচাষিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। জ্বালানি ও শ্রমিক সংকটসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পাকা আধাপাকা বোরো ধান কর্তন শুরু করলেও গেল ক’দিনের ভারী বর্ষণে ধীরে ধীরে তা পানিতে তলিয়েছে।
যে ধান কাটা হয়েছে সেই ধান ও খড়ও ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষক। কারণ হঠাৎ ভারী বৃষ্টিতে পানি বেড়ে যাওয়ায় হাওরের জমির পাশের কিছুটা উঁচু জায়গায় তা রাখা হলে এখন সেখানেও গ্রাস করেছে পানি। প্রতিকূল আবহাওয়া বৃষ্টি ও বজ্রপাত উপেক্ষা করে পানিতে ডুবে যাওয়া সোনালি ফসল ঘরে তোলার প্রাণপণ প্রচেষ্টা এখন হাওর পাড়ের কৃষকদের। দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি হাওরের বাদে ভূকশিমইল, ভূকশিমইল, জাবদা, কালেশার, মদনগৌরি, মোক্তাদিপুর, খামাউরা, নওয়াগাঁও, শশারকান্দি, বেড়কুঁড়ি, কানেহাত, শাহপুর, জায়ফরনগরসহ পুরো হাওর জুড়ে এখন কৃষকদের এমন ব্যস্ততা ও দুশ্চিন্তার দৃশ্য লক্ষণীয়। এ বছর বোরো ধানের ফলন ভালো হলেও হঠাৎ এই দুর্যোগে তাদের সবই শেষ।
স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ থেকে জানান, কিশোরগঞ্জের বেশির ভাগ হাওর এখন জলমগ্ন। নদীর পানির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার কৃষকের বোরো ফসলের মাঠ। ফসলি জমি, গোচারণ ভূমি, হাওরের পথ-ঘাট সবই এখন তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম। অব্যাহত বৃষ্টির কারণে বর্ষা নেমেছে ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলীর হাওর জনপদে। অসময়ের এই বর্ষা সেখানকার কৃষককে সংকটে ফেলছে।
পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পরও ফসল সংগ্রহের প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন কৃষক। কিন্তু ধান কাটার শ্রমিক ও ধান কাটার মেশিনের অভাব এক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়তি টাকা খরচ করে অনেক কৃষক ধান কাটালেও সেসব ধান পরিবহন নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন। হাওরের মেঠোপথগুলো জলমগ্ন ও কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় এই বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে। ফলে ছোট-বড় নৌকাই হয়ে ওঠছে কৃষকের একমাত্র কাণ্ডারি। যে কৃষকের নৌকা আছে, তারা হাওর থেকে কাটা ধান বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। নিজের নৌকা না থাকায় অসহায় অনেক কৃষক নিজের জমির ফসলের আশা ছেড়ে দিয়ে আহাজারি করছেন।
এদিকে ধানের খলা তলিয়ে যাওয়ায় কাটা ধান মাড়াই ও শুকানো নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান অনুসারে, এ বছর কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরের উপজেলাগুলোতেই আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর।
বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী এই চার উপজেলার ৫ হাজার হেক্টরের মতো জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে ইটনা উপজেলায় সর্বাধিক দুই হাজার হেক্টর, অষ্টগ্রাম উপজেলায় ১৩০০ হেক্টর, মিঠামইন উপজেলায় ৪০০ হেক্টর এবং নিকলী উপজেলায় ৩০০ হেক্টর জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। তবে সরকারি এই পরিসংখ্যানকে শুভঙ্করের ফাঁকি বলছেন কৃষক। তাদের দাবি, হাওরের সিংহভাগ জমির বোরো ধানই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফসল হারানোর শোকে হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে এখন শুধুই কৃষকের কান্না।
বানিয়াচং (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, বানিয়াচংয়ে দিগন্তজোড়া হাওর জুড়ে এখন কেবলই পানির হাহাকার আর কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। যে সোনালি ধানের ঘ্রাণে এখন কৃষকের আঙিনা ম ম করার কথা ছিল, সেই ধান আজ বানের জলের নিচে পচে নষ্ট হচ্ছে। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেছে হাজারো কৃষকের সারা বছরের লালিত স্বপ্ন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বুধবার পর্যন্ত বানিয়াচং উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের প্রায় ২ হাজার ১৪ হেক্টর জমির পাকা ধান সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সরকারি হিসেবে এখন পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও বাস্তবে এই ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও ভয়াবহ। স্থানীয়দের মতে, বেসরকারিভাবে এই ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকা স্পর্শ করতে পারে। হাওরে সরজমিন গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে আধা-পাকা ধান কাটার বৃথা চেষ্টা করেছেন শত শত কৃষক। কেউ কেউ পচে যাওয়া ধানের শীষ হাতে নিয়ে অঝোরে কাঁদছেন। কারণ, এই একফসলি ধানের ওপরই নির্ভর করে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া, পরিবারের আহার এবং সারা বছরের বেঁচে থাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্তনাদ আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলছে। তারা জানান, চড়া সুদে মহাজন আর এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তারা আবাদ করেছিলেন।
ফসল হারিয়ে তারা এখন নিঃস্ব। ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি অনতিবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে ‘দুর্গত এলাকা’ ঘোষণা করে সরকারি বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হোক। পাশাপাশি ঋণের কিস্তি স্থগিত এবং আগামী মৌসুমের জন্য বিনামূল্যে সার ও বীজ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে বানিয়াচং উপজেলা কৃষি অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহাদুল ইসলাম এই মানবিক সংকটের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, অকাল বন্যায় হাওরের পাকা ধান নিমজ্জিত হওয়ায় কৃষকরা অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ বর্তমানে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ করছেন। এই তালিকা চূড়ান্ত হলে দ্রুত সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা হবে।
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৪০০ হেক্টর বোরো ধানের পাকা ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। হাওর অঞ্চলে গত দু’দিনের অব্যাহত বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে আগাম বন্যা হয়েছে অনেক এলাকায়। এতে হাওরের পাশাপাশি উপজেলার নিম্নাঞ্চল এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ছোট ছোট হাওরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় পাকা ফসল ঘরে তুলতে না পেরে কৃষকের মাথায় হাত পড়েছে।
উপজেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নবীগঞ্জ উপজেলার ৪০০ হেক্টর পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর হাওর এলাকায় চাষ করা হয়েছে। হাওরে প্রায় ৬৭ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বাকিটুকু নন হাওর এলাকায় চাষ করা হয়েছে। নবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফজলুল হক মনি বলেন, গত দু’দিনের মুষলধারের বৃষ্টির ফলে হাওরের প্রায় ৪০০ হেক্টর বোরো ধানের পাকা ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
রাজনগর (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি জানান, গত চারদিনের প্রবল বর্ষণ ও উজানের পানিতে রাজনগরের কাউয়াদীঘি হাওরের অর্ধেকেরও বেশি পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। তবে, কৃষকদের অভিযোগ-কাশিমপুর পাম্প হাউজের গাফিলতি ও সেচ পাম্পগুলো নিয়মিত ও সবক’টি পাম্প সচল না রাখায় হাওরের ধান তলিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বারবার বলে আসছে তারা পানি নিয়মিত সেচ দিচ্ছে। এদিকে শ্রমিক সংকট, বৃষ্টিতে পানি বাড়ার পাশাপাশি বজ্রপাতের ভয়ে মাঠে ধান কাটতে নামতে পারছেন না কৃষকরা। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। হাওরে ঘুরে দেখা যায়- এবারের বোরো মৌসুমে উপজেলায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কাউয়াদীঘি হাওরে ৬ হাজার ২৩৭ হেক্টর রয়েছে। হাওরের বিস্তীর্ণ মাঠে আগেও যেখানে ধান বাতাসে দুলছিল। পাকা ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কৃষকরা। শ্রমিক জোগাড়ে ব্যস্ত ছিলেন তারা।
বোরো ধানের পাশাপাশি অর্ধশতাধিক হেক্টর জমির বিভিন্ন সবজি, পাটক্ষেত এবং আউশ ধানের বীজতলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জেলার কেন্দুয়া, কলমাকান্দা, আটপাড়া, মদন, বারহাট্টা ও খালিয়াজুড়ি উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি। স্থানীয় কৃষকরা জানান, হাওরের অধিকাংশ ধান পেকে গেছে। কিন্তু অনেক জমি তলিয়ে যাওয়ায় সেই ধান আর কাটা সম্ভব হচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেতে পানি জমে থাকায় ধান কাটার যন্ত্র ব্যবহার করা যাচ্ছে না, আবার শ্রমিক সংকটও দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত থাকায় কৃষকরা মাঠে নামতেও শঙ্কা বোধ করছেন।
জেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩৪টি হাওর রয়েছে। আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৮ কিলোমিটার অস্থায়ী ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩১ কোটি টাকা। এসব বাঁধের ওপর প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নির্ভরশীল।
গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বোরো ধানের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৮৫ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে স্থানীয়দের মতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। কৃষকরা জানান-চলতি মৌসুমে উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বাজারে ধানের দাম কম থাকায় তারা দ্বিগুণ লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন। অনেক ক্ষেতেই পাকা ধান কাটার আগেই পানির নিচে চলে গেছে। নিচু এলাকার শাকসবজি ক্ষেত ও মাছের খামারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে স্থানীয় বাজারে সবজির দাম বেড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা দ্রুত সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন।
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, খাগড়াছড়িতে কালবৈশাখী ঝড় ও হঠাৎ শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে কৃষকদের স্বপ্ন এক নিমিষেই ভেঙে পড়েছে। মাঠের পর মাঠ পাকা ধান ও কেটে রাখা ফসল পানিতে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ঝড়ের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন ফলদ বাগানও। সবমিলিয়ে জেলায় প্রায় ৮৩০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এর মধ্যে ২২১ হেক্টর জমির বোরো ধান, ৫৪৮ হেক্টর জমির ফলদ বাগান এবং ৬৩ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়েছে। গত মঙ্গলবার বিকাল থেকে শুরু হওয়া ঝড়ো হাওয়া ও টানা বৃষ্টিতে জেলা সদর, দীঘিনালা ও পানছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। অনেকেই ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু আকস্মিক দুর্যোগে তাদের সেই আশা ভেঙে যায়।