রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বর সেকশনে ৭.০৫ এমএম মডেলের একটি বিদেশি পিস্তল ডেলিভারি দিতে আসেন সোহেল রানা ও হানিফ নামে দুই অস্ত্র কারবারি। হোয়াটসঅ্যাপে তাদের কাছে প্রি-অর্ডার করা হয় অস্ত্রটি। প্রথমে তারা বেশ কয়েকটি অস্ত্রের মডেল পাঠান। এর মধ্যে ৭.০৫ এমএম মডেলের অস্ত্রটি পছন্দ হওয়ার পর শুরু হয় দর-কষাকষি। ১ লাখ ৯০ হাজার টাকায় দাম চূড়ান্ত হওয়ার পর দুজনে আসেন ডেলিভারি দিতে। একজন প্রথমে টাকা নেন, আরেকজন পিস্তল ডেলিভারি দেন। কিন্তু অস্ত্র ডেলিভারি দিতে এসে ডিবি পুলিশের জালে গ্রেপ্তার হন তারা।
গত ১১ এপ্রিল তাদের গ্রেপ্তারের পর ডিবি পুলিশ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের বিশাল চেইন সম্পর্কে জানতে পারে। যারা সীমান্ত পথে এনে কাটআউট পদ্ধতিতে দেশে অস্ত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ডিবিকে জানান, ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় কিনে ৩০ হাজার টাকা লাভে অস্ত্রটি বিক্রি করতে এসেছিলেন তারা। গত শনিবার রাজধানীর আগারগাঁও থেকে ৭.৬৫ এমএম মডেলের বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিনসহ তিন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, ২ লাখ টাকা দিয়ে অস্ত্রটি কিনেছিলেন এক কারবারির কাছ থেকে। অস্ত্রটি ভারত থেকে সীমান্ত পথে ঢাকা আসে। গ্রেপ্তার আসামিরা এ অস্ত্র বুঝে পাওয়ার পর থেকে তাদের অনুসারীদের কাছে ১০-৩০ হাজার টাকায় ভাড়া দিতেন। যখন কোনো কাজের চুক্তি তাদের অনুসারীদের কাছে আসত-তখন ঝুঁকি বুঝে গ্রেপ্তার আসামিরা টাকা নিতেন। পাশাপাশি নিজেদের চাঁদা ও মাদকের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে এটি ব্যবহার করত। ভালো কন্ডিশনের একটি ৭.৬৫ এমএম অস্ত্রের দাম বর্তমানে আড়াই লাখ টাকা বলে জানা গেছে। রাজধানী ঢাকার অপরাধ জগতে নতুন সংযোজন হিসেবে আলোচনায় এসেছে কলমের মতো দেখতে ছোট আকারের আগ্নেয়াস্ত্র ‘পেনগান’। গত ৩ এপ্রিল পুরান ঢাকায় এক যুবদল নেতাকে গুলির ঘটনার তদন্তে নেমে অত্যাধুনিক এই ক্ষুদ্রাস্ত্রের সন্ধান পায় পুলিশ। পেশাদার কিলার কাল্লু এই পেনগানটি ৮০ হাজার টাকায় কিনে ব্যবহার করতেন। দেশে পেনগানের ব্যবহার এই প্রথম শনাক্ত হওয়ায় এটির উৎস ও কারবারি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে গোয়েন্দারা। ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, মোট ৪টি হাত বদল হয়েছে পেনগানটি। শুরুতে যিনি কেনেন-তখন দাম দেন দেড় লাখ টাকা। এরপর এটির দাম কমতে কমতে সর্বশেষ ৮০ হাজারে বিক্রি হয়। কিন্তু দেশে পেনগান বিক্রি করা এই চক্রের মূল হোতাদের সন্ধান না মেলায়-ধারণা করা হচ্ছে আরও দুষ্কৃতকারীদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক এই পেনগান।
শুধু এ ঘটনাই নয়, আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্ত্র বিকিকিনির এমন চিত্র এখন সারা দেশের। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া অবৈধ অস্ত্রেও স্রোত কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। এর গতি এখন বাড়ছে। সহজেই মিলছে এখন অবৈধ অস্ত্র। প্রায় প্রতিদিনই রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার। কাউকে পথের কাটা মনে হলেই গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। আধিপত্য বিস্তারে প্রকাশ্যে দেওয়া হচ্ছে অস্ত্রের মহড়া। এমন পরিস্থিতিতে যেন অনেকটাই অসহায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনা ঘটলে- অপরাধীরা আইনের আওতায় এলেও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীরা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, বাসায় বসে অত্যাধুনিক অবৈধ অস্ত্রের প্রি-অর্ডার দিলেও ডেলিভারি মিলছে। যা দেশের অপরাধ জগৎকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও উদ্ধার না হওয়া লুটের ১ হাজার ৩২৩টি অস্ত্র ও আড়াই লাখের বেশি গুলি এখনো নিরাপত্তার হুমকি হয়েই রয়েছে। যেগুলো দাগি আসামি ও উগ্রবাদীদের হাতে রয়েছে বলে শুরু থেকেই আশঙ্কা করছে পুলিশ।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সম্প্রতি অবৈধ অস্ত্রের দাম ৩-৪ গুণ বেড়েছে। চাহিদা বাড়ায় আগে যে অস্ত্র ৩০-৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হতো-এখন সেটির দাম এক-দেড় লাখ টাকা হয়ে গেছে। চাহিদা অনুযায়ী সহজেই অত্যাধুনিক অস্ত্রও অর্ডার করা যাচ্ছে। এসব অবৈধ অস্ত্র বেশি অর্ডার দিচ্ছেন বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। ব্যবসায়ীরাও পাল্টে ফেলেছেন তাদের কৌশল। সীমান্তের পুরোনো রুটে অস্ত্র দেশে প্রবেশ করলেও পরিবহন করা হচ্ছে ভিন্ন পথে। আগে বেনাপোল-যশোর-ঢাকা রুটটি অবৈধ অস্ত্রের অন্যতম রুট হলেও বর্তমানে বেনাপোল থেকে খুলনা হয়ে ঢাকায় আনা হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অবৈধ অস্ত্রের কোনো হালনাগাদ তালিকা না থাকায় অস্ত্রের কারবার ঠেকাতে মাঠ পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে সারা দেশে কমপক্ষে শতাধিক অস্ত্র ব্যবসায়ী সক্রিয়। কাটআউট পদ্ধতিতে অস্ত্র সরবরাহ করায় অল্প সময়ে মূল ব্যবসায়ীদের হালনাগাদ তথ্য করাটা দুরূহ কাজ হওয়ায় সক্রিয় শুটারদের তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। শুটারদের সূত্র ধরে ব্যবসায়ীদের বিষয়ে তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুর অবস্থার সুযোগে দেশে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র ঢুকেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র ঠেকাতে পুলিশকে সেভাবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ এখনো নিতে দেখা যায়নি। রাজনৈতিক মেরূকরণের সুযোগে এই অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। জিরো টলারেন্স নীতিতে চালান ঠেকানো না গেলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, অবৈধ অস্ত্রের চালান প্রতিরোধে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি। রাজধানীর যেসব এলাকায় সন্ত্রাসীদের বিচরণ বেশি-সেসব এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও বহন রোধে পুলিশ সারা দেশেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অস্ত্রধারী ও সরবরাহকারী চক্র শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ তদারকি বাড়ানো হয়েছে।
ঢাকায় ৮ রেডজোন, সন্ত্রাসী আতঙ্ক
ডিএমপি সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত তিন মাসে ডিএমপি ৭২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে ২৫টিই বিদেশি পিস্তল। এ সময়ে পল্লবীতে সবচেয়ে বেশি ৬টি, মোহাম্মদপুরে ৪টি, উত্তরা পূর্ব থানা, ওয়ারী, কাফরুল, গেন্ডারিয়া, তুরাগ ও যাত্রাবাড়ী থানায় ৩টি করে অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে। মামলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই আট থানা এলাকাকে রেডজোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডিএমপি। এসব এলাকার সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে নির্দেশনা দিয়েছে ডিএমপি সদর দপ্তর। জানা গেছে, টার্গেট কিলিং, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের লড়াইকে কেন্দ্র করে অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে দেওয়া হচ্ছে অস্ত্রের মহড়া। এতে জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সীমান্তের পুরোনো রুটেই ঢুকছে অস্ত্র
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত তিন মাসে সারা দেশে অস্ত্র আইনে ৫৯৭টি মামলা হয়েছে। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সীমান্ত এলাকা থেকে ১৬টি রাইফেল, ৫টি রিভলবার ও ৯০টি পিস্তল জব্দ করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ১৪টি বিদেশি পিস্তল জব্দ করে সংস্থাটি। একাধিক সূত্র বলছে, সীমান্তের পুরোনো রুটগুলো দিয়ে দেশে অস্ত্র প্রবেশ করছে। যার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উল্লেখ সংখ্যক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করছে। যশোরের বেনাপোল, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের খড়ের দ্বীপ, জাফলংয়ের কাটরি, সাতক্ষীরার কলারোয়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা অন্যতম।