‘আমার খুব কাছের বন্ধু প্রথম বর্ষ থেকেই, ন্যূনতম কোনো মনমালিন্য নাই তার সাথে। আমি শাহবাগ থানায় পৌছানো মাত্রই দেখি সে ইশারায় কাকে যেন আমাকে দেখিয়ে দিচ্ছে, সাথে সাথে আমি ওর হাত ধরে ফেলি, বলি কি দেখায় দেস বন্ধু? ও বলে, “আরে কিছু না”। তখন আমি ফোন কানে নিয়ে এক ছোট ভাইকে কল দেই ও কই এটা জানার জন্য, কল রাখারও সুযোগ পাই নাই। এর মাঝে দেখি অতর্কিত হামলা।’
কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হল সংসদের নির্বাচিত সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক জুলহাস ইসলাম। গত ২৩ এপ্রিল রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে (বৃহস্পতিবার) ডাকসু ও শিবির নেতাদের ওপর ছাত্রদল নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। সেই হামলায় জুলহাস গুরুতর আহত হন। ইতোমধ্যে মেডিকেল টেস্টে ধরা পড়েছে, মারধরের ফলে তার এক কানের পর্দা ফেটে গেছে, ফলে তিনি ওই কানে খুব একটা শুনতে পাচ্ছেন না।
ভুক্তভোগী জুলহাসের দাবি, তার ওপর হামলা হয়েছে তার হলের ও খুব কাছের বন্ধু সাজ্জাদ হোসাইন রবিনের ইশারায়। শুধু তাই নয়, তিনি অংশ নেন হামলায়ও।
জানা গেছে, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী, একইসাথে মুহসীন হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। তাছাড়া, তিনি গত ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে হলে সমাজসেবা সম্পাদক পদে নির্বাচন করেছিলেন।
জুলহাসের দেওয়া তথ্যমতে, ঘটনার দিন থানায় ঢুকে তিনি রবিনের সঙ্গে কুশল বিনিময় করার সময়ই ছাত্রদলের অন্য নেতাকর্মীদেরকে জুলহাসের ওপর হামলা করার ইঙ্গিত করেন তিনি (রবিন)। মুহূর্তেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে জুলহাস বিষয়টি হলের শিক্ষার্থীদেরকে জানান এবং হলের ফেসবুক গ্রুপে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়।
এর মাঝে সাজ্জাদ হোসাইন রবিন গ্রুপে দাবি করেন, তিনি হামলার ইশারা করেননি এবং হামলাও করেননি। সেসময় তিনি গ্রুপে দেওয়া এক পোস্টের কমেন্টে বলেন, ‘ওরে (জুলহাসকে) বাঁচানোর জন্য আমি আর ইফাত ভাই টানাটানি করে বের করলাম। এসব মিথ্যা বলবেন না। শুধুশুধু বিভ্রান্তি ছড়াবেন না।’
পরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তিনি (রবিন) অন্যান্য ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সঙ্গে জুলহাসকে আঘাত করার পর ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়ছেন।
এ বিষয়ে অভিযোগ জানিয়ে ভুক্তভোগী জুলহাস ইসলাম নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গতকাল রবিবার (২৬ এপ্রিল) লেখেন, ‘সাজ্জাদ হোসেন রবিন; যুগ্ম আহবায়ক, মুহসীন হল ছাত্রদল। আমার খুব কাছের বন্ধু প্রথম বর্ষ থেকেই, ন্যূনতম কোনো মনমালিন্য নাই তার সাথে। আমি শাহবাগ থানায় পৌছানো মাত্রই দেখি সে ইশারায় কাকে যেনো আমায় দেখায় দিচ্ছে, সাথে সাথে আমি ওর হাত ধরে ফেলি, বলি কি দেখায় দেস বন্ধু? ও বলে আরে না কিছু না। তখন আমি ফোন কানে নিয়ে এক ছোট ভাইকে কল দেই ও কই এটা জানার জন্য, কল রাখারও সুযোগ পাই নাই এর মাঝে দেখি অতর্কিত হামলা।’
তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে ভাবছিলাম সে শুধু দেখায় দিছে কিন্তু ভিডিওটার ১৫ সেকেন্ড পর দেখেন আমায় কিভাবে হিট করে হেটে চলে যাচ্ছে। এর চেয়ে কষ্টের কি হতে পারে বলেন, রাজনীতিটাই তার কাছে বড় হয়ে গেছে। তার জন্য শরীরের একটা পার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলো। যাইহোক, এখানে কাউকে চিনতে পারলে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন দয়া করে, অন্তত চিনে রাখা ভালো।
মুহসীন হল সংসদের এ নেতা আরও লেখেন, ‘অসুস্থতায় ভিডিও কালেক্ট করার সুযোগ পাই নাই, আজকে একটা পাইলাম, পেয়ে অবাক হয়ে গেছি। হাম/লার শুরু থেকেই ভালো ভিডিও খুজছি। একটা স্ক্রিনশট কমেন্টে দিচ্ছি, দেখেন কিভাবে অস্বীকার করছে এই দুইদিন।’
এর আগে, ঘটনার দিন অর্থাৎ গত ২৩ এপ্রিল রাতে দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে ভুক্তভোগী লেখেন, ‘আমি কোনোদিন কাউকে আঘাত করার কথা ভাবতেই পারি না, কারো বিন্দুমাত্র ক্ষতি হোক এটাও চাই না, এই নীতিতেই চলার চেষ্টা করি, একবার একটা ঝামেলায় গেছিলাম যদিও আমার দ্বারা কারো ক্ষতি হয় নাই, সেটা নিয়ে এখনো গিল্টি ফিল করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে আমার হলের ছাত্রদলের এক কাছের বন্ধু ইশারায় আমায় দেখায় দেয় আমি মুহসীন হলের সংস্কৃতি সম্পাদক এবং ছাত্রদল বিএনপি নিয়ে সমালোচনা করি, এবং ছাত্রদলের মধ্যে একমাত্র সেই জানে ভালো করে আমি বর্তমান কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নাই, এতোটা ভালো বন্ধু আরকি। এর প্রেক্ষিতে আমায় ২০-৩০ জন ছাত্রদল একযোগে আক্রমণ করে,অর্থাৎ ক্যাম্পাসের ছোট ভাই, বড় ভাইরা আমায় আক্রমণ করছে আমার কাছের ছাত্রদল বন্ধুর ইশারায়, এখন মেডিকেলে ভর্তি আছি।’
এরপর, গত ২৫ এপ্রিল নিজের শরীরের অবস্থা জানিয়ে জুলহাস ফেসবুকে লেখেন, ‘Finally got the medical report, my eardrum has burst. Thanks to JCD for making it happen.Probably this is good news for you and also for my haters. চাইলে উল্লাস করতে পারেন।’
তিনি আরও লেখেন, ‘স্পেশাল ধন্যবাদ আমার ছাত্রদলের আহবায়ক বন্ধুকে, তার প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নাই, তবে একদিন এটা নিয়ে গিলটি ফিল করবে আমার বিশ্বাস, যদি মনুষ্যত্ব থেকে থাকে। Pray for me, all my well-wishers.’
অন্যদিকে, ‘জুলহাস ইসলামের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিন দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে মুহসীন হল সংসদ। হল সংসদের এজিএস মোহাম্মদ আবদুল মজিদ স্বাক্ষরিত এ বিবৃতিতে বলা হয়, শাহবাগ থানার অভ্যন্তরে সংঘটিত ন্যাক্কারজনক ও পরিকল্পিত মব হামলার ঘটনায় হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের সংস্কৃতি সম্পাদক মোঃ জুলহাস ইসলাম গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। সর্বশেষ চিকিৎসা প্রতিবেদনে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, তার কানের পর্দা ফেটে গেছে যা অত্যন্ত গুরুতর, উদ্বেগজনক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।’
এতে বলা হয়, ‘প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, উক্ত হামলার সময় মোঃ জুলহাস ইসলামকে পরিকল্পিতভাবে চিহ্নিত করে হামলাকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে সাজ্জাদ হোসাইন রবিন (শিক্ষাবর্ষ: ২০২০–২০২১, বিভাগ: পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন)। তার প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও নেতৃত্বে হামলাটি আরও ভয়াবহ ও নির্মম রূপ ধারণ করে, যা স্পষ্টতই পূর্বপরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ইঙ্গিত বহন করে।’
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘এই ঘটনায় একই ধরনের সহিংসতায় মুহসীন হলের ভিপি সাদিক শিকদার, এজিএস আব্দুল মজিদসহ ডাকসুর ও অন্যান্য হল সংসদের নেতৃবৃন্দরা ও সদস্যরা হামলার শিকার হয়েছেন; এমনকি দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকরাও রেহাই পাননি। এই ধারাবাহিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হলের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করছে।’
অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান ও বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদ হোসাইন রবিনকে একাধিকবার কল দেওয়ার পর তিনি রিসিভ করে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিলে তিনি জানান, কথা না বলে তিনি লিখিত বক্তব্য দেবেন। এরপর তাকে বারবার কল দিয়ে ও বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি এবং তার কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।