ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) একই ঘটনার প্রেক্ষাপটে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ভিন্নতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালে ‘জুলাই আন্দোলন বিরোধী’ ভূমিকার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি একপক্ষকে ‘সাজা’ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও অরেকপক্ষ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭১তম সিন্ডিকেট সভা। ওই সভায় ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানবিরোধী ভূমিকার অভিযোগে ১৯ জন শিক্ষক ও ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
একই অভিযোগে ৩৩ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধেও ওই সভায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে যাদের পড়াশোনা শেষ হয়েছে তাদের সনদ বাতিল এবং অধ্যয়নরতদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়।
চলতি বছরের ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত জরুরি সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বরখাস্তের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয় কর্তৃপক্ষ। তাদেরকে কর্মজীবনে সচল করার এক মাস পার হয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে নীরব ভূমিকায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, সিদ্ধান্ত নিলেও শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার ও সনদ বাতিল কার্যকর করা হয়নি। তাদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। অধিকাংশ শিক্ষার্থী নোটিশের জবাব দিয়েছেন। বহিষ্কার কার্যকর না হওয়া শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেকে শিক্ষার্থীকে ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। কিছু শিক্ষার্থী একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। তাদের প্রশ্ন– একই অপরাধে বরখাস্ত শিক্ষক-কর্মকর্তারা যদি নির্দোষ বিবেচিত হন, তাহলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কেন একই ধরনের সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হচ্ছে না?
সনদ কার্যকর করা হয়নি–বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমন দাবি করলেও ভিন্ন কথা বলছেন শাস্তি পাওয়া শিক্ষার্থী তানভীর হাসান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তার অভিযোগ, মাস্টার্সের প্রথম সেমিস্টার চলাকালীন অনার্সের সনদ বাতিল করে তাকে বহিষ্কার করা হয়। সহপাঠীরা মাস্টার্সের শেষ পর্যায়ে থাকলেও তিনি শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন।
তানভীর হাসান বলেন, আমি জুলাই আন্দোলন বা ছাত্রলীগ—কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম না। জুলাইয়ের প্রতি মৌন সমর্থন ছিল। জুলাই আন্দোলনের পর সব কিছু স্বাভাবিকই চলছিল। কিন্তু অর্থনীতি ক্লাবের নির্বাচনে সেক্রেটারি পদে প্রার্থী হওয়ায় আমার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, আমাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হুমকি দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই। কিছু দিন পর বহিষ্কৃত ৩০ জনের তালিকায় আমার নাম দেখতে পাই। ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। এখন আমার শিক্ষাজীবন হুমকিতে।
কেন তানভীর হাসানকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি—এ বিষয়ে অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি ড. পার্থ সারথি লস্কর বলেন, ‘এ মুহূর্তে কিছু বলা সম্ভব নয়। ডকুমেন্ট দেখেই বলতে হবে।’
শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হলে শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কী ভাবছে– এমন প্রশ্নের জবাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক বলেন, ‘তাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটি এখনও কার্যকর করা হয়নি। সিদ্ধান্তটি বর্তমানে ঝুলে আছে। আগামীতে সিন্ডিকেট সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ‘বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া শিক্ষার্থীদেরও ভবিষ্যৎ চিন্তা করে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করা হবে। অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’