Image description

নিয়ম লঙ্ঘন করে ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আত্তীকরণ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। শুধু তাই নয়; যোগ্যতার মানদণ্ডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের দেওয়া হয়েছে বাড়তি পদোন্নতিও। আত্তীকরণ হওয়া ৪২ জনকে দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত দায়িত্ব। আবার যাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হয়েছে। গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসব অনৈতিক ঘটনা ঘটেছে সংস্থাটিতে। এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চলছে তীব্র অসন্তোষ ও আলোচনা-সমালোচনা। 

জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর একই দিনে বিভিন্ন পদের ৫০ জনকে আত্তীকরণ করে ডিএনসিসি। অভিযোগ আছে, ওই সময় আওয়ামী লীগের আমলে পদায়নকৃত কর্মকর্তারাই ডিএনসিসির শীর্ষ পদগুলোতে দায়িত্বে ছিলেন। তখন ওই সব কর্মকর্তাকে মবের ভয় দেখিয়ে অনেকটা জোর করে সংঘবদ্ধ হয়ে এই আত্তীকরণ করানো হয়। কিন্তু এ-সংক্রান্ত অফিস স্মারকটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি সরকারের অডিট বিভাগ ডিএনসিসিতে অডিট করতে গেলে তারা ৫০ জনের অবৈধভাবে আত্তীকরণের এসব তথ্য পান। তখন করপোরেশনের কাছে অডিট কর্মকর্তারা আত্তীকরণের স্মারকের কপি দেখতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। তখন স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমতিপত্র দেখতে চান। দেখা যায়, আত্তীকরণের ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়ার জন্য কোনো নথিই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি। 

ডিএনসিসির কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭ সালে দুই সিটি করপোরেশনের নতুন অর্গানোগ্রাম প্রণীত হওয়ার পর অনেক পদ বিলুপ্ত করা হয়। তখন অনেকেই পদ শূন্য হয়ে পড়েন। কর্তৃপক্ষ তাদের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করে। 

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, আত্তীকরণ করারও নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সে অনুযায়ী সংস্থার জনপ্রশাসন-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি থেকে অনুমোদন নিতে হয়। স্থায়ী কমিটির অনুমোদনের পর স্থানীয় সরকারের অনুমোদন, পরে জনপ্রশাসন ও সর্বশেষ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের বিধান রয়েছে। নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ সালের ৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত করপোরেশনের নবম সভায় ৭৫ জনকে আত্তীকরণের ব্যাপারে ইতিবাচক মত দেওয়া হয়। শূন্য পদে তাদের দেওয়া যাবে এবং পদ না থাকলে বেতন স্কেলের এক গ্রেড নিচের পদে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত ছিল। তবে সে ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমতির বিধান থাকায় স্থানীয় সরকার বিভাগে অবহিতকরণের সিদ্ধান্ত ছিল।

কিন্তু এবার এর কোনো কিছুই অনুসরণ না করে তাদের আত্তীকরণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, আত্তীকরণের পর যন্ত্রচালক কাজী আলমগীর হোসেনকে দেওয়া হয় হিসাব সহকারীর পদ। কিন্তু একই দিনে তাঁকে আরেক আদেশে রাজস্ব পরিদর্শক করা হয়। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তাঁকে অঞ্চল-৩-এর রাজস্ব পরিদর্শকেরও দায়িত্ব দেওয়া হয়। অথচ এই পদে দায়িত্ব পালনের মতো তাঁর আগে আরও অর্ধশতাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের দায়িত্ব না দিয়ে আলমগীর হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

রাজস্ব পরিদর্শক পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ১৫ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতার বিধান থাকলেও সেটি অনুসরণ করা হয়নি। এভাবে ডিজ ইনফেকশন পরিদর্শক আব্দুল খালেক মজুমদারকে আত্তীকরণের পর তাঁকে ব্যক্তিগত সহকারী করা হয়। পরে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে অঞ্চল-৪-এর স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও সহকারী সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আরও অর্ধশতাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা থাকলেও তাদের দেওয়া হয়নি।

এভাবে বিল সহকারী মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে রেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্টের দায়িত্ব দেওয়ার পর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অঞ্চল-১-এর বাজার সুপারভাইজারের। এভাবে আত্তীকরণকৃত ৫০ জনের মধ্যে তিনজন ছাড়া বাকি সবার ক্ষেত্রে ঘটেছে এসব অনিয়মের ঘটনা। 

ওই সময়ে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন অতিরিক্ত সচিব মীর খায়রুল আলম এবং সচিবের দায়িত্বে ছিলেন মাসুদ আলম সিদ্দিক। ডিএনসিসি জনপ্রশাসনে বদলি হওয়ার পরই অবসরে যান খায়রুল আলম। এ ছাড়া সিদ্দিক বর্তমানে ওএসডি হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত আছেন। এ বিষয়ে মাসুদ আলম সিদ্দিক কোনো কথা বলতে না চাইলেও মীর খায়রুল আলম সমকালকে বলেন, ওই সময় একেক গ্রুপ একেক দাবি নিয়ে হাজির হতো। কাউকে চাকরি থেকে বাদ দিতে হবে, কাউকে চাকরি দিতে হবে। কিন্তু এ ঘটনায় নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। 

এ বিষয়ে ডিএনসিসির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, তখন আমি দায়িত্ব ছিলাম না। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।

যাদের আত্তীকরণ করা হয়

গবেষণা কর্মকর্তা দিলবাহার আহম্মেদ, সাজেদা সুলতানা সীমা, সহকারী সার্জন, ডা. আজিজুন নেছা, ডিজ ইনফেকশন পরিদর্শক আবদুল খালেক মজুমদার, যন্ত্রচালক কাজী আলমগীর হোসেন, বিল সহকারী এমএ হাসান, ম. সহিদুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম, অভ্যর্থনাকারী মোহাম্মদ দীন ইসলাম, আব্দুর রহমান, মীর আক্কাছ আলী, বিল সহকারী মিজানুর রহমান, হুইল ট্যাক্স সুপারভাইজার মো. মহিউদ্দিন, সহকারী কেয়ারটেকার আব্দুল ওয়াহেদ খান, টেলিফোন অপারেটর রুদাবা তাবাসসুম বেগ, ভিডব্লিউ অ্যাসিস্ট্যান্ট আনোয়ারুল ইসলাম, সিনিয়র সুপারভাইজার নজরুল ইসলাম হাওলাদার, নিম্নমান সহকারী মিজানুর রহমান ভুঁইয়া, সহকারী ভলকানাইজার অপারেটর বজলুর রহমান, নার্সিং এইড আমেনা খাতুন, সহকারী ওয়েল্ডার আমির হোসেন, বৈদ্যুতিক সহকারী আব্দুল ছালাম, সহকারী মিস্ত্রি ফারুক মিয়া, বৈদ্যুতিক সাহায্যকারী নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া, হাবিবুর রহমান, মিলন মিয়া, হেলপার মেরাজুল ইসলাম, জালাল আহমেদ, সহকারী বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি সেলিম মিয়া, সহকারী মেশিন অপারেটর আবু বকর সিদ্দিক, মো. ইসমাইল, মেজবাহ উদ্দিন, সহকারী মিস্ত্রি রেজাউল করিম, নাসির উদ্দিন, রওশন আলী, কৃষ্ণ চক্রবর্তী, আব্দুল জাহের, মোশারফ হোসেন, আব্দুল সামাদ, আবু হানিফ, দিদার হোসেন সরকার, আব্দুর রহিম সরকার, শাহ আলম, এমদাদুল ইসলাম ভুঁইয়া, মো. ইকবাল, বশির উদ্দিন, মো. সানী, মো. ইসমাইল ও কহিনুর ইসলাম।