আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, সচিব আখতার হোসেন ও মেজবাহ উদ্দিনের বিজনেস পার্টনার, ছাত্রলীগ নেতা মাসুদ আলম এখন এই বিএনপি সরকারের আমলেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে জাহিদ আহসান রাসেলদের সঙ্গে পালিয়ে কোনো রকমে প্রাণ রক্ষা করেছিলেন এই মাসুদ আলম। কিন্তু পরবর্তীতে ছাত্র সমন্বয়ক ও এনসিপি নেতাদের ম্যানেজ করে ক্রমন্বয়ে আবার প্রকাশ্যে চলে আসেন তিনি। শুধু তাই নয়, মন্ত্রণালয় এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে আবার নতুন করে জায়গা করে নেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে ম্যানেজ করে বাগিয়ে নেন ২৯৭ কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের কাজ, যা ছিল অকল্পনীয়।
এ প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ আমলে। প্রতিমন্ত্রী রাসেলের প্রভাবে মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য টেন্ডারে তখন ভয়াবহভাবে অনিয়ম করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ আমলের টেন্ডার অনিয়মের কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ বিষয়ে নতুন করে টেন্ডার আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পুনঃটেন্ডারের সিদ্ধান্ত দিয়ে দরপ্রস্তাবটি ফেরতও পাঠিয়েছিল। কিন্তু যেহেতু পুনরায় টেন্ডার আহ্বান হলে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা হবে এবং তাতে মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে তাই তিনি দুর্নীতিবাজ উপদেষ্টা সজীব ভুঁইয়াকে বড় অংকের টাকায় ম্যানেজ করে পুনঃটেন্ডার থেকে বিরত রাখেন। সম্পূর্ণ অবৈধভাবে একই দরপ্রস্তাব পুনরায় উপস্থাপন করা হয় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে। ইতিপূর্বের ফেরত পাঠানো এই প্রস্তাবটি ক্রয় কমিটির সদস্যরা পুনরায় নাকচ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদের প্রভাবশালী সদস্য, ছাত্র প্রতিনিধি আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া নিজের প্রভাব খাটিয়ে অনেকটা জোর করেই মাসুদ আলমের অনুকূলে ২৯৭ কোটি টাকার টেন্ডারটি অনুমোদন করিয়ে নেন। এর মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নতুন করে উত্থান ঘটে ফ্যাসিস্ট ও ছাত্রলীগ নেতা মাসুদ আলমের। অবশ্য এই টেন্ডার অনিয়মের বিনিময়ে ৩০ কোটি টাকা ঢুকেছে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের পকেটে। এবং এই টাকার লেনদেন হয়েছে বিদেশে উভয়ের নিজস্ব এজেন্টের মাধ্যমে। অবাক ব্যাপার হলো, দুর্নীতি দমনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এই বিএনপি সরকারের আমলেও মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করতে সক্ষম হয়েছেন ম্যানেজ মাস্টার, ছাত্রলীগ নেতা মাসুদ আলম। যা সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
চতুর্থ শ্রেণি পাস, শরীয়তপুরের মাসুদ আলমের ঢাকায় যেভাবে উত্থান
কথিত আইটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের মালিক মাসুদ আলম ওরফে মাসুদ অভি। শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১৯৯১ সালের ১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন মাসুদ। ৩ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। এখন শত শত কোটি টাকার মালিক হলেও এক সময় দারিদ্রতার কারণে চতুর্থ শ্রেণির বেশি পড়াশোনায় আগাতে পারেননি তিনি।
মাসুদ আলম নিজেই ২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর মাছরাঙা টেলিভিশনে ‘রাঙা সকাল’ নামে একটি সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আমরা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হই। আমার বাবা আজাহার উদ্দিন আওয়ামী লীগ করতেন বলে তখন তিনি পালিয়ে যান। ফলে প্রাইমারি স্কুলের পড়াশোনাও শেষ করতে পারিনি।’ টিভি সাক্ষাতকারেই মাসুদ আলম স্বীকার করেছেন, তিনি মাত্র চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। অথচ, আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে তিনি ছাত্রলীগের ঊর্ধ্বতন পদও পেতে সক্ষম হয়েছেন। মাসুদ আলম ছিলেন ঢাকা মহানগর (উত্তর) ছাত্রলীগ (রবিউল-রানা) কমিটির সহসম্পাদক পদে। গোসাইরহাট উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এবং স্থানীয় সংসদ-সদস্য নাহিম রাজ্জাকের কর্মী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকায় এসে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য মরহুম আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে, সাবেক সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাকের আশীর্বাদে ক্রমান্বয়ে ছাত্রলীগে ঢুকে পড়েন, যদিও আদতে তিনি ছাত্র নন। ছাত্রলীগের ব্যানারে চাঁদাবাজি এবং পরবর্তীতে টুকটাক ঠিকাদারি ব্যবসায় নাম লেখান। মাসুদ আলমের প্রকৃত উথান শুরু হয় তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া সচিব এবং পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র সচিব (জননিরাপত্তা বিভাগ) আখতার হোসেনের হাত ধরে। আখতার হোসেনের বাড়িও শরীয়তপুরে। মাসুদ আলমের একই এলাকার হওয়ায় উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এবং এক পর্যায়ে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে উঠে। এরপরে যুব ও ক্রীড়া সচিব পদে আসেন মেজবাহ উদ্দিন। এই সময় সচিব মেজবাহ উদ্দিন (বর্তমানে কারাগারে আটক) এবং প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেলের ক্যাশিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হন এই মাসুদ আলম। মেজবাহ উদ্দিনের সঙ্গেও মাসুদ আলমের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে উঠে।
আওয়ামী লীগ আমলে যুব উন্নয়নের ২৯৭ কোটি টাকার ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্প সাজানো হয় মাসুদ আলমের পরিকল্পনামতোই
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ২৯৭ কোটি টাকার ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রকল্পের দরপত্র সাজানো হয় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মাসুদ আলমের ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের জন্যই। যার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, ভুয়া সার্টিফিকেট এবং ডিজিটাল প্রতারণার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর জুলাই চেতনার সরকারের আমলেও সেই মাসুদের প্রতিষ্ঠানই এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে। অথচ ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের টেন্ডার যোগ্যতা নিয়েও ছিল প্রশ্ন। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানিকে ১০ বছরের প্রশিক্ষণ অভিজ্ঞতা থাকার শর্তে নির্বাচিত করা হয়েছে-যা টেন্ডার শর্তাবলির সরাসরি লঙ্ঘন। তখনকার প্রকল্প পরিচালক আব্দুল হামিদ খান ও কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড’র কর্ণধার মাসুদ আলমের ঘনিষ্ঠতা এবং তাদের একযোগে বিদেশ সফরের তথ্যও ফাঁস হয়ে গেছে। এই দুজনের ঘনিষ্ঠতা এবং তাদের একযোগে বিদেশ সফর স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি করে। শুধু বিদেশ সফরই নয়, বড় অংকের ঘুষ লেনদেনও হয়। ঘুষ লেনদেন এবং সরকারি অর্থের ভাগবাটোয়ারায় আরও অনেকেই জড়িত হয়েছেন এবং এখনও হচ্ছেন।
মাসুদ আলমের মালিকানাধীন ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের উত্থান সম্পর্কে অনুসন্ধানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দুই সাবেক সচিবের গভীর ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় রয়েছেন সাবেক যুব ও ক্রীড়া সচিব মেসবাহ উদ্দিন। ২০২২ সালে সচিব থাকাকালে মেসবাহ উদ্দিন ৪৬.৭ কোটি টাকার একটি প্রশিক্ষণ প্রকল্পের নকশা করেন। পরের বছর তার ঘনিষ্ঠ মাসুদ আলমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি কাজ পায়। অবসরের কয়েক মাসের মধ্যেই মেসবাহ নিজেই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও শেয়ারহোল্ডার হন। ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ আমলা মেসবাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অতীতে বিচারবিভাগীয় ক্যুর চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। তিনি গত অক্টোবরে ‘জুলাই গণহত্যা’ সংক্রান্ত একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার হন।
মাসুদ আলমের আরেক ব্যবসায়িক অংশীদার সাবেক সচিব আখতার হোসেনের স্ত্রী মাহবুবা আক্তার। তিনি মাসুদের অন্য কোম্পানি নগদহাট বাংলাদেশ লিমিটেডেরও শেয়ারহোল্ডার। কোম্পানি দুটি গঠিত হয় যথাক্রমে ২০২০ ও ২০২১ সালে। এই সময় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে ছিলেন আখতার হোসেন। আরজেএসসির নথি অনুযায়ী, নগদহাটে সচিব আখতার হোসেনের স্ত্রী মাহবুবা ছাড়াও যুক্ত ছিলেন আরেক সাবেক সচিব মো. নাসির উদ্দিন। আখতার হোসেন ২০২২ সালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসডিজি সমন্বয়ক হন। এ তথ্যগুলো একত্রে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়-প্রকল্পটি তৈরি এবং এর সঙ্গে মাসুদ আলমের সংশ্লিষ্ট হওয়ার পেছনে ছিল ক্ষমতাধর আওয়ামী ঘনিষ্ঠ আমলাদের যোগসাজশ। এই স্বার্থান্বেষী চক্র, যারা সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক সুবিধা নিশ্চিত করেছে।
ক্রয় কমিটিতে উপস্থাপিত তথ্যে দেখা যায়, দরপত্রে ২০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। তবে গ্রহণযোগ্য (রেসপনসিভ) হয় ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড, বাংলাদেশ আইটি ইনস্টিটিউট, এসইও এক্সপেইট বাংলাদেশ লিমিটেড এবং নিউ হরাইজনস সিএলসি অব বাংলাদেশ। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন যোগ করে প্রথম হয় ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের এই জায়গাটাতেই ঘাপলা তৈরি করা হয়। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে মাসুদ আলমের এই প্রতিষ্ঠানটিকে বেশি নম্বর দেওয়া হয়। যদিও অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করার কারণে মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠান শুরুতেই নন-রেসপনসিভ হওয়ার কথা।
আওয়ামী লীগ আমলেই এই কাজগুলো চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু তারমধ্যেই ফ্যাসিস্ট-লুটেরা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। মাসুদ আলমের কাজ পাওয়া সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। টেন্ডারটি বাতিল করে নতুনভাবে টেন্ডার আহ্বান করা হবে, এটা ছিল অনেকটা নিশ্চিত। তবে তাতে দমে যাননি চতুর মাসুদ আলম। ছাত্র সমন্বয়কদের ম্যানেজ করে আওয়ামী লীগ আমলে মূল্যায়িত এই দরপ্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তারমধ্যেই গণমাধ্যমে এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। সাবেক প্রতিমন্ত্রী রাসেলের ঘনিষ্ঠজন হিসাবে পরিচিত মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানকে আইটি প্রশিক্ষণ প্রকল্প দেওয়া নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ২০ অক্টোবর, ২০২৪ ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপিত হলে পুনঃদরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত দিয়ে ক্রয় প্রস্তাবটি ফেরত পাঠায় কমিটি। কিন্তু পরবর্তীতে অন্তর্বর্র্তী সরকারের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ৩০ কোটি টাকার বিনিময়ে নিজের প্রভাব খাটিয়ে ক্রয় কমিটিতে প্রস্তাবটি অনুমোদনের ব্যবস্থা করেন।
ব্যাংক হিসাব জব্দের পরও শত কোটি টাকা তুলেন মাসুদ
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি চাঞ্চল্যকর খবর সবাইকে হতবাক করে দেয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কঠোর নির্দেশনা উপেক্ষা করে জব্দ করা ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা উত্তোলনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠে ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে। সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলার তোয়াক্কা না করে এই বিপুল অর্থ স্থানান্তরের ঘটনায় ব্যাংক ও প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়।
সূত্র জানায়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্পের আওতায় দুই দফায় মোট ৪৮ কোটি টাকা মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। প্রতিটি ধাপে ২৪ কোটি টাকা বিল হিসেবে প্রদত্ত হয়। যদিও সন্দেহজনক লেনদেনের কারণে দুদক ও বিএফআইইউ আগেই মাসুদ আলম, তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ রাখার (ফ্রিজ) নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ২০২৫ সালের ৩০ জুন ও ৩০ সেপ্টেম্বর ভিত্তিক জমাকৃত বিলের টাকা কৌশলে উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, উত্তোলিত অর্থের একটি বড় অংশ সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং কারাগারে থাকা সাবেক সচিব মেজবাহ উদ্দিননের কাছে পাচার করা হয়।
এই ঘটনার পর সিআর মামলা নং-৪৯৯/২০২৫ এবং দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ৩২৬, ৩০৭, ১১৪ ও ১০৯ ধারাসহ বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি নির্দেশ অমান্য করে জব্দ হিসাব থেকে টাকা বের করা নজির খুব কম দেখা যায়। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে মাসুদ আলম এমন বেপরোয়া কাণ্ড ঘটাতে সক্ষম হন বলে ধারণা করা হচ্ছে
মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা, বহু অভিযোগ
মাসুদ আলমের অতীতও যথেষ্ট বিতর্কিত। জানা গেছে, তিনি একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তার বিরুদ্ধে উসকানি, হত্যা এবং সরকারি সম্পদ ধ্বংসের অভিযোগে অর্ধশতাধিক মামলা হয়। এমনকি গণহত্যার মতো গুরুতর অভিযোগেও তার নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। তবু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তিনি ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যান, যা প্রশাসনিক মহলেও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ব্যবসায়িক দিক থেকে মাসুদ আলম ‘প্রমিস গ্রুপ’-এর কর্ণধার হিসেবে পরিচিত। তার ‘নগদহাট বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামে এমএলএম ব্যবসা খোলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে। পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে ‘প্রমিস মার্ট’, ‘প্রমিস অ্যাসেট’, ‘প্রমিস টেক’সহ প্রায় ১৫টি কোম্পানি খুলে তিনি একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
সম্পদের দিক থেকেও তার কর্মকাণ্ড রহস্যময়। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে লড়ার সময় যে হলফনামা জমা দিয়েছিলেন, তাতে তার নিট সম্পদ দেখানো হয় ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা এবং বার্ষিক আয় মাত্র ২১ লাখ টাকা। কিন্তু দুদকের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ হলফনামার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। তিনি কৌশলে বিপুল সম্পদ গোপন করেছেন।
দুদক ইতিমধ্যে মাসুদ আলম ও তার স্ত্রীর বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। দেশের সব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তাদের সম্পদের বিস্তারিত তথ্য তলব করা হয়। প্রমিস গ্রুপের সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদের নজরদারিতে রাখা হয়। মাসুদ আলম সব কিছু ম্যানেজ করে ফেলেন বিপুল অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে।
আইটি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আগে থেকেই ভুয়া বিল ভাউচার, নিম্নমানের প্রশিক্ষণ এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। এরপরও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প দেওয়া এবং জব্দ হিসাব থেকে টাকা উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়া রাষ্ট্রের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
তদন্তে দুদক ও বিএফআইইউর কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, জব্দ হিসাব থেকে কীভাবে টাকা উত্তোলন করা হলো, তা খতিয়ে দেখতে ব্যাংকগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু মাসুদ আলমের ক্ষমতা, প্রভাবে সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।
সূত্র আরও জানায়, মাসুদ আলমের প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংযোগ তাকে আর্থিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সুবিধা দিয়ে চলেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে দিয়ে এমন বড় পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ব্যাংকিং খাতের সতর্কতা সত্ত্বেও, কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী পক্ষের সহায়তায় এই কৌশল সম্পন্ন হয়েছে।
আইটি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গুণগত মানহীন প্রতিষ্ঠানকে বড় প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া, ঘুষ ও প্রভাবশালী তদবির এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি। তারা সতর্ক করছেন, এই ধরনের ব্যবস্থাপনায় প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত, মানহীন প্রশিক্ষণ, এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না দেওয়া সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শীর্ষনিউজ