সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বেশ সক্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ অহনা। নিজের ভালো লাগার বিভিন্ন মুহূর্ত কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার ছবি-ভিডিও তিনি ফেসবুকে শেয়ার করতে পছন্দ করেন। সেভাবেই একদিন সনাতন ধর্মের এক বন্ধুর সঙ্গে তোলা একটি ছবি তিনি ফেসবুকে শেয়ার করেন। কিন্তু এই ছবি নিয়ে শুরু হয় গুজবের ডালপালা ছড়ানো।
কালের কণ্ঠকে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অহনা বলেন, ‘আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে তোলা একটি ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেছিলাম। ছবিটি বিশেষ একটি গ্রুপে শেয়ার করে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়, আমি সনাতন ধর্মের ওই বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কে আছি। হিজাব পরে কিভাবে আমি এসব ধর্মবিরোধী কাজ করি!’
অহনা আরো বলেন, ‘সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, আমি নিরাপত্তার জন্য বিষয়টি নিয়ে যখন আইনি সহায়তা চাইতে যাই, তখন সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাই।
ফেসবুক খুললে প্রায় প্রতিদিনই অহনার মতো অসংখ্য নারীকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেনস্তার শিকার হতে দেখা যায়। নারীদের শেয়ার করা পোস্ট, ছবি-ভিডিওর নিচে বাজে মন্তব্য কিংবা হুমকি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন বট আইডি (ফেক আইডি) থেকে নারীদের এই হেনস্তা করা হয়। সব সময় যে এসব হেনস্তার পেছনে ধর্মীয় কারণ টেনে আনা হয় তা নয়। অনেক সময় ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতে কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে প্রতিপক্ষকে হেনস্তা করতে বট আইডি ব্যবহার করা হয়।
আগে থেকে এই প্রক্রিয়া চলে এলেও এটি প্রকট আকার ধারণ করে জুলাই আন্দোলনের সময়। এরপর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনেও নারী প্রার্থীদের বিভিন্ন ধরনের হেনস্তার শিকার হতে দেখা গেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের মনোবল নষ্ট করে দিতে বট আইডি ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালানো হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নওরীন সুলতানা। এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে তাঁকে প্রায়ই প্রতিপক্ষের কাছে হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে।
অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নওরীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফেসবুকে শেয়ার করা আমার কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কারো পছন্দ না-ই হতে পারে। কিন্তু তার যুক্তিযুক্ত কোনো কারণ না দেখিয়ে একজন নারী হিসেবে আমাকে হেনস্তা করা হচ্ছে, যেন নারীদের জন্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। আমার কর্মকাণ্ডের জবাব না দিয়ে আমাকে বডি শেমিং করা হচ্ছে।’
অহনা কিংবা নওরীনের এসব অভিজ্ঞতার চিত্র পাওয়া যায় অ্যাকশন এইডের ২০২২-২৩ সালের এক গবেষণায়। তাতে দেখা গেছে, ওই সময়ে ৬৪ শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে নেটজ বাংলাদেশের আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের আটটি জেলায় পরিচালিত সংস্থাটির গবেষণায় উঠে এসেছে ৭৮ শতাংশের বেশি নারী অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়্যারনেস ফাউন্ডেশনের (সিসিএ ফাউন্ডেশন) ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে অন্তত ৫৯ শতাংশ নারী সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছেন। অনলাইন হয়রানি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ভুক্তভোগী অনেক নারী আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে বাধ্য হচ্ছেন।
২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বাংলাদেশে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের জরিপ অনুযায়ী, ৮.৩ শতাংশ নারী প্রযুক্তির সহায়তায় লৈঙ্গিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম ব্ল্যাকমেইল ও ছবির অপব্যবহার।
অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের ২০২২ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী ২০২১ সালে অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন ৫০.১৯ শতাংশ নারী। আর নেক্সাস বাংলাদেশের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে অনলাইন হেনস্তার শিকার হয়েছেন ৭৮.৭ শতাংশ নারী। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৬৩.৫১ শতাংশ।
অন্যদিকে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ২০২২ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬৫.০৭ শতাংশ নারী অনলাইন হেনস্তার কারণে মানসিক অবসাদ ও হতাশায় ভোগেন।
২০২৫ সালের সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশে যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি এবং ক্ষতিকর এআই-নির্মিত কনটেন্টকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এতে অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত বা একান্ত ছবি প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ধরনের অপরাধ মোকাবেলায় ২০২০ সালের শেষ দিকে নারীদের জন্য পুলিশ সাইবার সাপোর্ট সেন্টার চালু করা হয়। শুরু থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারী সহায়তা চেয়েছেন। শুধু ২০২৪ সালেই ৯ হাজার ১১৭টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সর্বাধিক অভিযোগ পাওয়া যায়।
তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগী নারীরা। অ্যাকশনএইডের তথ্যে দেখা গেছে, অভিযোগ করা নারীদের অন্তত ৬৫ শতাংশের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারের অ্যাডিশনাল এসপি মোবাশ্বেরা হাবিব খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনলাইন কিংবা অফলাইনে এখন নারীর প্রতি সহিংসতার হাজারো পদ্ধতি আছে। আমাদের কাছে নতুন নতুন ধরনের অভিযোগ আসছে। তদন্ত করতে গিয়ে দেখেছি এসব সহিংসতা বা হয়রানি দেশের বাইরে থেকেও হচ্ছে। আবার কেউ কেউ অপরাধ করে দেশের বাইরেও পালিয়ে যাচ্ছে। তখন আমাদের আর কিছু করার থাকে না। আবার যাঁরা অভিযোগ করেন, তাঁদের বড় অংশ সামাজিক কারণে শেষ পর্যন্ত তদন্তে সহযোগিতা করেন না। অনেকে নিজেকে আড়াল করে রক্ষা পেতে চান। তার পরও আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করছি এসব অপরাধ প্রতিরোধের।’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের প্রতি হেনস্তামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পারিবারিক শিক্ষাকে দায়ী করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আইনের দিক থেকে দেখতে গেলে অপরাধকে ছোটো প্রমাণ করে কখনো অপরাধ দমন করা যায় না। একটা সমাজে ধর্ষণ যেমন অপরাধ, তেমনি অনলাইন হেনস্তাও অপরাধ। আমাদের ল অ্যান্ড অর্ডার নিশ্চিত করা উচিত। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে, শুধু আইনের বাঁধনে মানুষের নৈতিক উন্নতি সম্ভব নয়। আমাদের পরিবারগুলোকে নৈতিকতা শিক্ষার জায়গায় কাজ করতে হবে। একটি পরিবারে ছেলে বা মেয়েকে শিশুকাল থেকেই শেখাতে হবে অন্য জেন্ডারের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে। তাহলেই সম্ভব সামাজিক এই অবক্ষয় প্রতিরোধ করা।’
সাইবার অপরাধের কবল থেকে রক্ষায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রবিউল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাইবার বুলিং বা হয়রানির শিকার নারীরা তীব্র উদ্বেগ ও হতাশায় নিমজ্জিত হন। অপরিচিত কারো কাছ থেকে আসা ঘৃণ্য মন্তব্য বা হুমকি একজন ভুক্তভোগীর আত্মবিশ্বাসকে তছনছ করে দিতে পারে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণ অত্যন্ত যন্ত্রণার। রাতের পর রাত তারা ঘুমহীন থাকে। বারবার ফোন চেক করে দেখে নতুন কোনো আক্রমণ এলো কি না। এই মানসিক ক্ষতগুলো বাইরে থেকে দেখা যায় না বলে সমাজ একে গুরুত্ব দিতে চায় না। কিন্তু ভেতরের রক্তক্ষরণ একজন নারীকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়। এর জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। আর এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়লে শুরুতেই আইনের আশ্রয় নিতে হবে।’