প্রতিদিনের রান্নায় দরকারি ভোজ্যতেলে ভোক্তার ভোগান্তি দিনদিন বেড়েই চলেছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের খোঁজে ঘুরতে হচ্ছে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে। বিকল্প খোলা তেলও কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বেশি দামে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা নিরুপায়। বিশেষ করে পাঁচ লিটারের বোতলের সংকট দেখা দেওয়ায় ক্রেতাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
গতকাল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মিরপুর-১২ নম্বর আলুব্দী বাজারের চারটি দোকান ঘুরেও পাঁচ লিটারের বোতলের দেখা পাননি বেসরকারি চাকরিজীবী মো. এনামুল হক। দোকানিরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বড় বোতলের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। খালি হাতে ফেরার পথে এনামুল কালবেলাকে জানান তার দুর্ভোগের কথা।
তিনি বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতেও এলাকার দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়েছি, পাইনি। এক দোকানে যদিও এক বোতল দিতে পারবে বলেছিল। কিন্তু দাম ৯৭০ টাকা শুনে নিইনি। আজ (গতকাল শুক্রবার) সকাল সকাল বাজারে এসেছি, ভাবলাম এখানে মিলবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাইনি। সয়াবিন নিয়ে বারবার এমনটা হচ্ছে। দাম বাড়াতেই এমনটা করা হয়। আর আমাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এই অনিয়ম বন্ধ করতে কোনো কঠোর পদক্ষেপও নেই। আমরা যেন বাজারে জিম্মি হয়ে আছি।
বোতলের দেখা না পেয়ে খোলা তেলে ঝুঁকেছেন কদমতলী এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম। কিন্তু সেখানেও আরেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। সাইফুল বলেন, বাজারে খোলা তেল আছে। কিন্তু বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। প্রতি লিটার ১৯৫ টাকা। কোনদিকে যাব, সবদিকেই বিপদ।
জানতে চাইলে এ এলাকার বৈশাখী জেনারেল স্টোরের খুচরা বিক্রেতা মো. খোকন ইসলাম বলেন, আমরা বোতল না পেলে ক্রেতাদের দেব কীভাবে। কোম্পানির কাছে চাহিদা দিয়েও বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। যারা তেলের সঙ্গে অন্য আইটেম অর্ডার দিচ্ছে তাদের বোতল দিচ্ছে। তাও কম পরিমাণে।
মালিবাগ বাজারের গাজী স্টোরের মো. হারুন ও বিল্পব স্টোরের খুচরা বিক্রেতা সোলেয়মান হোসেন কালবেলাকে জানান, দুই লিটারের অল্প কিছু বোতল থাকলেও তাদের দোকানে পাঁচ লিটারের (সয়াবিন) বোতল নেই। কোম্পানি থেকে সরবরাহ কমেছে। চাহিদা দিয়েও বোতল পাচ্ছেন না তারা।
রাজধানীর নিউমার্কেট বনলতা বাজারেও একই চিত্র। এখানেও খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, চাহিদা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে তেল পাচ্ছেন না তারা। পেলেও তা বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।
এখানকার সাথী এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়ী মো. আলী আলমগীর কালবেলাকে বলেন, রূপচাঁদা, তীরের মতো কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন সরবরাহ একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা তাদের কাছ থেকে তেল পাচ্ছি না। পুষ্টি ব্র্যান্ডের কাছ থেকে পেয়েছি, তাও অল্প কিছু। সেগুলোও কিনতে হয়েছে আগের চেয়ে বেশি দামে।
পাঁচ লিটারের বোতলের উদাহরণ দিয়ে এ বিক্রেতা বলেন, পাঁচ লিটারের বোতলের গায়ে এমআরপি (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) ৯৬০ টাকা। আগে এই তেল ৯১০ টাকায় কিনতে পারতাম আমরা। বিক্রি করতাম ৯২০-৯৩০ টাকা। এখন এই বোতল আমাদেরই কিনতে হচ্ছে ৯৪০-৯৫০ টাকা; বিক্রি করতে হচ্ছে ৯৫০ টাকা।
তিনি আরও বলেন, বাড়তি দাম দিয়েও বোতলজাত তেল পাচ্ছি না। বড় সমস্যা হলো, তেলের বোতল স্বল্পতায় ক্রেতা হারাতে হয় আমাদের। এতে অন্য পণ্যের বিক্রিও কমে যাচ্ছে।
রাজধানীর বেশিরভাগ দোকানেই এখন বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যাদের কাছে আছে তারাও আড়ালে সরিয়ে রাখছেন বোতল। পুরোনো ক্রেতাদের ধরে রাখতে সেগুলো লুকিয়ে বিক্রি করছেন। অনেক ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি দাম। এতে পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৬০ থেকে ৯৭০ টাকা পর্যন্ত পড়ছে। যেখানে সরকার নির্ধারিত দাম অনুযায়ী এ বোতল ৯৫৫ টাকা বিক্রি হওয়ার কথা। এক ও দুই লিটারের বোতলেও ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। অন্যদিকে খোলা সয়াবিনের লিটারও ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা নির্ধারিত দাম অনুযায়ী ১৭৬ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে পাম অয়েলও।
জানতে চাইলে কদমতলীর সাদ্দাম মার্কেটের এক ডিলার জানান, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও দেশে সমন্বয় হচ্ছে না। এতে কোম্পানির লোকসান হচ্ছে। তাই আগের তুলনায় তেল কম দিচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে দেড়-দুইশ কার্টন দিত, সেখানে এখন ১০০ কার্টনও দিচ্ছে না। কমিশনও কমিয়ে দিয়েছে।
খোলা তেলের বিষয়ে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমানে তেলের সংকট চলছে। এতে বাজারদর চড়া। এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে।
এদিকে, গত মঙ্গলবার নিত্যপণ্যের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গঠিত ১১তম টাস্কফোর্স কমিটির বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, আমরা নিত্যপণ্যের বর্তমান দাম এবং আমদানির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছি। এখন পর্যন্ত আমাদের মূল্যায়ন বলছে যে, আমদানির অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। অন্য কথায়, এমন কোনো বড় সমস্যা এখনো দেখা দেয়নি, যার জন্য বড় ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে।
বাজারে নজর রাখা হচ্ছে এবং অনিয়মের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।জীদ