Image description

দেশের এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজে শিক্ষকের শূন্যপদ রয়েছে ৬০ হাজার ২৯৫টি। শিক্ষক সংকটে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যত খুঁড়িয়ে চলছে। অথচ এসব শূন্যপদে নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন লক্ষাধিক চাকরিপ্রত্যাশী। নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও দীর্ঘ প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নিয়োগ ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তারা শিক্ষকতায় যোগ দিতে পারছেন না।

অনেক শূন্যপদ দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা। ফাইলগত জটিলতা ও নিয়মের প্যাঁচে প্রতিটি নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা সময়মতো যোগদান করতে পারছেন না। ফলে শিক্ষা খাতে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হয়েছে। এনটিআরসিএ (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) কেন্দ্রিক এই নিয়োগ ব্যবস্থাকে ঘিরে চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলনও নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

সমপ্রতি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংসদে জানান, সরকারি কলেজে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত প্রভাষক পদের ৬৫৬টি এবং সদ্য সরকারিকৃত কলেজে নন-ক্যাডার প্রভাষক পদের ২ হাজার ৪১০টি শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি এমপিওভুক্ত কলেজে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের ১ হাজার ৩৪৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এমপিওভুক্ত কলেজে শিক্ষক নিয়োগের জন্য আরও ১ হাজার ৩৪৪টি পদে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সব মিলিয়ে এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজে মোট শূন্যপদ ৬০ হাজার ২৯৫টি।

এনটিআরসিএ সূত্রে জানা যায়, ১৯টি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় প্রার্থী ছিলেন এক কোটি ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ২৯৬ জন। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ প্রার্থী সনদপ্রাপ্ত হয়েছেন। ১ম থেকে ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭১ জনকে নিয়োগ সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭ম গণবিজ্ঞপ্তিতে আরও প্রায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার শিক্ষক যোগদান করেন।

তবে বিভিন্ন গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশপ্রাপ্তদের একটি অংশ যোগদান করতে পারেননি। প্রশাসনিক জটিলতা, পছন্দের প্রতিষ্ঠান না পাওয়া, বয়সসীমা শেষ হয়ে যাওয়া, ভেরিফিকেশন জটিলতা এবং দূরবর্তী পোস্টিংয়ের কারণে প্রায় ১ লাখ চাকরিপ্রত্যাশী বঞ্চিত হয়েছেন।

চাকরিপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, আবেদন থেকে সনদ পাওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লাগে। ফল প্রকাশ ও নিয়োগ সুপারিশের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠান দ্রুত নিয়োগপত্র প্রদান করে না বা পদ শূন্য থাকলেও তা প্রকাশে গড়িমসি করে। এ ছাড়া গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির জটিলতা, কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ে দেরি এবং ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াও সময়ক্ষেপণের বড় কারণ।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছেন বাংলাদেশ শিক্ষক ফোরামের সহ-সভাপতি মো. শান্ত আলী। তিনি বলেন, এনটিআরসিএকে আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। না হলে এই হয়রানি কমবে না। এনটিআরসিএ শুধু নিয়োগ নয়, প্রশিক্ষণের বিষয়েও ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগও এর আওতায় আনা উচিত। পাশাপাশি নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত অংশ যুক্ত করা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, এন্ট্রি লেভেল শিক্ষক নিয়োগে সরাসরি শূন্য পদের বিপরীতে সুপারিশ, এবং হয়রানি কমাতে স্বয়ংক্রিয় এমপিওকরণ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান।

এখন পর্যন্ত হওয়া আটটি গণবিজ্ঞপ্তির তথ্যানুযায়ী, ১ম গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশ প্রায় ৫৫ হাজার, যোগদান প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার; ২য় গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশ প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার, যোগদান প্রায় ১৮ থেকে ২২ হাজার; ৩য় গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশ প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার, যোগদান প্রায় ১২ থেকে ১৮ হাজার; ৪র্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার, যোগদান প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার; ৫ম গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশ প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার, যোগদান প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার; ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার, যোগদান আংশিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার ও ৭ম গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশ প্রায় ৩৬ হাজারের বেশি, যোগদান প্রায় ৩০ থেকে ৩৩ হাজার। সেইসঙ্গে ৮ম গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রায় ১৩ হাজার প্রধান ও সহকারী শিক্ষক পদের নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তবে একাধিক গণবিজ্ঞপ্তি বাস্তবায়ন হলেও এখন পর্যন্ত পুরোপুরি শূন্যপদ পূরণ সম্ভব হয়নি। ৪র্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে শূন্যপদ ছিল ৬৮ হাজার, ৫ম গণবিজ্ঞপ্তিতে ৯৬ হাজার ৭৩৬টি, ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তিতে ১ লাখ ৮২২টি এবং ৭ম গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রায় ৬৭ হাজার পদ শূন্য ছিল।

এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শূন্যপদ দ্রুত পূরণের জন্য সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এনটিআরসিএর মাধ্যমে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধানের ১১ হাজার ১৫১টি শূন্যপদ পূরণের জন্য আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কলেজে প্রভাষক নিয়োগের জন্য ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৭তম, ৪৯তম ও ৫০তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।