Image description

বৈশাখের প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার জনজীবনে নতুন করে দুর্ভোগ ডেকে এনেছে ঘন ঘন লোডশেডিং। দিনে-রাতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে নগরজীবন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন দোকান ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শিল্প-কারখানার মালিক এবং সাধারণ মানুষ।

অসহনীয় গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক ও অভিভাবকরা।

নগরের হাসপাতাল, ক্লিনিক, ব্যাংক, শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি—সবখানেই লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে। কেবল শহর নয়, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলেও দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের গ্রামীণ এলাকাগুলোতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে।

 
 
 

বিদ্যুতের এই অনিয়ন্ত্রিত আসা-যাওয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে দুপুরের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ এবং রাতের ঘুমের সময় দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানির পাম্প চালানো না যাওয়ায় অনেক এলাকায় পানি সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়েছে।

 
 

চট্টগ্রামের পাথরঘাটা, আসকারদিঘির পাড়, হালিশহর, কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। দিনে গড়ে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বায়েজিদ বোস্তামী, হালিশহর ও ইপিজেড শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

 

বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক দোকানপাটে ফ্রিজ, কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে পণ্য। জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ বাড়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। নগরের রিয়াজুদ্দিন বাজার ও টেরিবাজারের ব্যবসায়ীরাও একই সমস্যায় পড়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্রেতা না আসায় ব্যবসা পরিচালনায় বড় ধরনের ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে।

টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান জানান, নতুন সরকারের কাছে তারা একটি স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশের আশা করেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। রমজানের আগে জাতীয় নির্বাচন, এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। আমরা যারা ব্যবসা করি, আমাদের পরিবার আছে, দোকান ভাড়া দিতে হয়, সরকারি ভ্যাট দিতে হয় এবং অনেকেই বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এসব কারণে ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

তিনি আরও জানান, আগামী মাস থেকে ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট কমানো বা সাময়িকভাবে ভ্যাটমুক্ত সুবিধা দেওয়া এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় বাড়িয়ে অন্তত রাত ১০টা বা ১২টা পর্যন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

এদিকে এসএসসি পরীক্ষা চলমান থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১২টা এবং ভোর ৬টা পর্যন্ত একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা।

কর্ণফুলীর শিক্ষার্থী শাকিল হোসেন বলেন, দিনে গরমের কারণে পড়াশোনা করা যায় না, আবার রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে আলো ও ফ্যান বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। সামনে পরীক্ষা থাকায় আমরা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি।

তীব্র গরম ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে সিজার বা খিঁচুনিতে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরের ভেতর তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, ফলে শিশুদের শরীরে পানিশূন্যতা, জ্বর ও খিঁচুনির প্রবণতা বাড়ছে।

বেসরকারি হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রুমি দাশ বলেন, এই গরমে শিশুদের বিশেষ করে যারা সিজার প্রবণ, তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা শরীরের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং খিঁচুনির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। লোডশেডিংয়ের কারণে যদি ঘর গরম থাকে, তাহলে শিশুদের ঠান্ডা পরিবেশে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, যা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ধারাবাহিক চাপ তৈরি হয়েছে। গত ৩ এপ্রিল সর্বনিম্ন লোডশেডিং ছিল ৫৪ মেগাওয়াট, যা মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে ১৪ এপ্রিল বেড়ে দাঁড়ায় ২৮২ মেগাওয়াটে—প্রায় ৫ দশমিক ২২ গুণ বৃদ্ধি।

একই সময়ে উৎপাদন পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতি হয়। ৪ এপ্রিল যেখানে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ৪০৮ মেগাওয়াট, তা ১৪ এপ্রিল নেমে আসে ১ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াটে, অর্থাৎ অর্ধেকেরও কম। পরবর্তী সময়ে ১৮ এপ্রিল চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪৪৫ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট, ফলে লোডশেডিং অব্যাহত থাকে এবং মাসের শুরু থেকে তুলনায় ঘাটতি প্রায় তিনগুণে পৌঁছায়।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আরেকটি হিসাব বলছে, চট্টগ্রামে মোট ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গ্যাস, জ্বালানি ও কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর কমে যাওয়ায় মাসের শুরুতে পাঁচটি কেন্দ্র বন্ধ ছিল। ২ এপ্রিল ২৩টি কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। একই সময়ে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৩৭৬ মেগাওয়াটের মতো।

তবে ১৮ এপ্রিল এসে সচল কেন্দ্র কমে দাঁড়ায় ১৯টিতে এবং সম্পূর্ণ বন্ধ কেন্দ্র বেড়ে হয় ৯টি। এদিন মোট উৎপাদন হয় ২ হাজার ২৮৫ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট, ফলে ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট কমে যায়।

উৎপাদনের এই পতনের মধ্যে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার কেন্দ্র থেকে যেখানে দুই সপ্তাহ আগে ১ হাজার ১৬৪ মেগাওয়াট উৎপাদন হতো, ১৮ এপ্রিল তা নেমে আসে ৫৮৬ মেগাওয়াটে।

একইভাবে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচ ইউনিটের মধ্যে তিনটি (ইউনিট-১, ৩ ও ৪) পানির স্তর কমে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে, সচল আছে মাত্র দুটি (ইউনিট-২ ও ৫)। পাশাপাশি রাউজান-১ ও রাউজান-২ (প্রতিটি ২১০ মেগাওয়াট) দীর্ঘদিন ধরে অচল রয়েছে। বেসরকারি খাতের জুডিয়াক, জুলদা-২ ও জুলদা-৩ কেন্দ্র থেকেও কোনো উৎপাদন হচ্ছে না।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ কালবেলাকে বলেন, প্রায় প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় ৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এই ঘাটতি প্রতিদিন চাহিদার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।

লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট সময়সূচি কেন দেওয়া হয় না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিদিন পরিস্থিতি এক রকম থাকে না, তাই নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না।

বিদ্যুতের ক্ষেত্রে পিক আওয়ার সাধারণত বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত, যখন চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। অন্যদিকে অফ পিক আওয়ার হলো রাত ১১টা থেকে পরদিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত। তখন বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কম থাকে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে পিক আওয়ার ও অফ পিক আওয়ার—উভয় সময়েই লোডশেডিং হচ্ছে।