সুবর্ণ আসসাইফ
‘গণরুম-গেস্টরুম মুক্ত ঢাবি দিয়ে গেলাম, তোমরা রক্ষা করিও’—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ১০০৭ নম্বর রুমের দেওয়ালের এই লেখাটি গতবছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। লেখাটি লিখেছিলেন ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী সগির ইবনে ইসমাঈল। গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অবসান হওয়া গণরুম-গেস্টরুম নামক অন্ধকার সংস্কৃতি যেনো ভবিষ্যতে আর ফিরে না আসে, তাই এই দেওয়াল লেখনির মাধ্যমে নবীন শিক্ষার্থীদের সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
তবে অভ্যুত্থানের দুই বছর যেতে না যেতেই বিশ্ববিদ্যালেয়ের হলগুলোতে আবারও গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরে আসার আশাঙ্কা প্রকাশ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (ডাকসু) নেতারা ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা। এই ইস্যুতে সোমবার (২০ এপ্রিল) কর্মসূচিও পালন করেছে ডাকসুর নেতারা। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘটনাও ঘটে তাদের।
আতঙ্কের নাম গেস্টরুম-গণরুম
‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর, হলে সিট না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে গণরুমে উঠি। পরে প্রোগ্রাম যেতে রাজি না হওয়ায় হলের সিনিয়ররা আমোকে হল থেকে বের করে দিয়েছিল। গণরুমে আমি আড়াই মাস ছিলাম, সময়টা আমার জন্য অনেক কঠিন ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে মধুতে যেতে হতো ছাত্রলীগ নেতাদের প্রটোকল দিতে। প্রোগ্রামে না যাওয়ায় গেস্টরুমে মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছি বেশ কয়েকবার। একবার গেস্টরুমে একজন সিনিয়র আমাকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতে এগিয়ে আসে, পরে অন্য সিনিয়ররা তাকে বাঁধা দেয়। আমার অনেক বন্ধু শারীরিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে গেস্টরুমে।’— কথাগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলামের (ছদ্মনাম)। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুটা কিভাবে হয়েছিল জানতে চাইলে দ্য ডেইলি ক্যাম্পসাকে এসব অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ওই সময়টা আমার কাছে দু:স্বপ্নের মতো। আমি আর ওই দিনগুলো মনে করতে চাই না। আমার পরিবার অনেক বড় স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠিয়েছিল। কিন্তু আমি মানসিকভাবে এতটায় বির্পযস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে বাড়ি ফিরে যাওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম।
শুধু সাইফুল ইসলাম নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা গেস্টরুম-গণরুম সংস্কৃতি একটি আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে এই অপসংস্কৃতির ভয়ঙ্কর চিত্র পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতেও শিক্ষার্থীদের মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ছিল অহরহ। বিশেষ করে নব্বই দশক থেকে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বছরের পর বছর গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি চালিয়ে আসছিল। শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। ফলে কেউ অবাধ্য হলে বা ভিন্নমতের হলে অমানসিক নির্যাতনের ঘটনা ছিল নিত্য ব্যাপার। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেটেছে হলের বাইরে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা ছিল অনেকটা ঠুঁটো জগন্নাথের মতো। হল প্রশাসন নয় হলের কার্যত নিয়ন্ত্রণ ছিল রাজনৈতিক বড় ভাইদের হাতে।
গণরুম-গেস্টরুম ফেরার আশঙ্কা কেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সমস্যা দীর্ঘদিনের। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছাত্রদের জন্য ১৪টি এবং ছাত্রীদের জন্য ৫টি আবাসিক হল রয়েছে। হলগুলোর ধারণ ক্ষমতার তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়টির এই আবাসন সংকটকেই গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি চালুর কারণ বলে মনে করেন অনেকে। রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে রিএড নিয়ে অথবা শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরও অনেক ছাত্র নেতা হলগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবে অবস্থান করতেন। আর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের জায়গা হতো গণরুমে। আর এসব গণরুমের নিয়ন্ত্রণ থাকতো সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতাদের হাতে। গণরুমে থাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক গুটি হিসেবে ব্যবহার করা হতো নবীন শিক্ষার্থীদের। মূলত আবাসন সংকটের সুযোগ নিয়ে ছাত্রনেতারা তাদের রাজনৈতিক জনবল বৃদ্ধি করতে গণরুমগুলো নিয়ন্ত্রণ করত।
তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। অভ্যুত্থানের পর গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির চিরদিনের মতো অবসান হবে বলে প্রত্যাশা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের। অভ্যুত্থানের পর প্রথম ব্যাচ হিসেবে ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুটা বিগত ব্যাচগুলোর তুলনায় ছিল সুখকর। এর কারণ অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস শুরুর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বৈধ সিটে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ায় হল ছেড়ে দেন ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা। মূলত হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের সিট বন্ঠনের পূর্ণ সুযোগ ছিল প্রশাসনের হাতে। যার সুযোগে আনুষ্ঠানিক নোটিশে গণরুম বন্ধ করে প্রশাসন।
তবে শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতাদের অভিযোগ, একবছর যেতে না যেতেই বিগত বছরের ধারা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নবীন ব্যাচ হিসেবে ২০২৫-২৬ সেশনের শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হলেও তাদের আবাসন নিশ্চিত হয়নি। বিপরীতে অনিয়মিত শিক্ষার্থীরা হলে সুযোগ পাচ্ছেন। সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের প্রভাবে তারা আবারও হলে জায়গা করে নিচ্ছেন। এছাড়াও শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের এক্সটেনশনে গেস্টরুমে ঘটনারা পনুরাবৃত্তি তাদের শঙ্কা বাড়িয়েছে বলে জানান তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের এক্সটেনশন ড. কুদরত-ই-খুদা হোস্টেলে প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের গেস্টরুম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ঢাবিতে এ ধরনের অভিযোগ এটিই প্রথম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গেস্টরুমে উপস্থিত থাকা প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী গণমাধ্যমকে বলেন, চার দিন ধরে হলে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ওপর নিয়মমাফিক হয়রানি চলছে। প্রতিদিন রাত সাড়ে ১১টা থেকে শুরু করে ২টা বা আড়াইটা পর্যন্ত তাদের বসিয়ে রাখা হয়। সিনিয়ররা একে ‘ম্যানার শেখানো’ বললেও, বাস্তবে এটি চরম মানসিক হয়রানি বা র্যাগিংয়ের পর্যায়ে পড়ে। কথা না শুনলে তাদের ৪২তম ব্যাচের সিনিয়র শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়, যেটি আরও ‘ভয়ংকর’ বা ‘সাংঘাতিক’। শিক্ষার্থীদের জোর করে রাত জেগে সিনিয়রদের সামনে সালাম দেওয়া ও আত্মপরিচয় দেওয়ার তথাকথিত শিষ্টাচার পালন করতে বাধ্য করা হয়। সাধারণত ১০০৩ ও ১০০৪ নম্বর রুমে এসব ঘটনা ঘটে। তবে সর্বশেষ গত রাতে হলের ডাইনিং রুমে প্রকাশ্যেই চলে এ কাজ।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা আরেক শিক্ষার্থী গণমাধ্যমকে বলেন, রাত ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত এসব হয়রানি চলে। সেখানে ৪৩তম ব্যাচের পাশাপাশি ৪২তম ব্যাচ এবং তারও উপরের ব্যাচের সিনিয়ররা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ছাত্রদলের পরিচয়ধারী ৪ থেকে ৬ জন বড় ভাই উপস্থিত ছিলেন। তারা নবীনদের সমস্যার কথা জানতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত সমাধান হিসেবে ‘ইমিডিয়েট সিনিয়রদের’ কথা শোনার কথা বলেন।
সম্প্রতি দুই দশক আগে ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হওয়া ছাত্রদল নেতা মো. আলা উদ্দিনকে হলে থাকার বিশেষ সুযোগ দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলা থাকার কারণে প্রথমবার পড়াশোনা করতে না পরলে তিনি প্রথমে ২০১৫ -১৬ শিক্ষাবর্ষে একবার পুনঃভর্তি হয়। তারপর ২০২৩-২৪ সেশনে দ্বিতীয়বারের মতো পুনরায় ভর্তি হয়।
জানা যায়, ৫ই আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সিদ্ধান্ত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার বিশেষ বিবেচনায় ৩৬ জন শিক্ষার্থীকে পুনঃভর্তি ও হলে থাকার অনুমতি দেয়। যার মধ্যে তিনজন শিক্ষার্থীকে শেখ মুজিবুর রহমান হলে থাকার বিশেষ সুযোগ দেয়া হয়। মো আলা উদ্দিন ছাড়াও বাকি দুইজন হলেন, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের মো. ওয়ালিউল্লাহ ও এক শিক্ষাবর্ষের মো. আ. রহিম খান। তারা উভয়েই ২০২৩ -২৪ সেশনে পুনরায় ভর্তি হন।
যদিও, ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৭ই জুলাই হলগুলো থেকে ছাত্রলীগের দখলদারিত্ব মুক্ত করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে হল গুলোতে শিক্ষার্থীদের সিট বন্টনের বিষয়ে কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। কিন্তু কিছু দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব সাইট থেকে সিট বন্টন নীতিমালা গুলো মুছে দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণরুম গেস্টরুম বন্ধে জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরে আবাসিক হল/হোস্টেলসমূহে শিক্ষার্থী ওঠানোর বিষয়ে নির্দেশনার দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়, "মেয়াদোত্তীর্ণ অথবা বিভিন্ন কারণে ছাত্রত্ব নেই অথবা মাস্টার্স চূড়ান্ত পরীক্ষা (ইন্টার্নশীপ/ফিল্ডওয়ার্ক/প্রজেক্ট/থিসিস (লিখিত ও মৌখিক)/ব্যবহারিক/ভাইভা, ইত্যাদি) শেষ করেছে অথবা স্নাতক (সম্মান) পাশ করেছে কিন্তু নিয়মিত ব্যাচের সাথে মাস্টার্সে ভর্তি হয়নি এমন শিক্ষার্থী হলে/হোস্টেলে উঠতে পারবে না। এই সকল শিক্ষার্থীর জিনিসপত্র যদি হলে/হোস্টেলে থাকে, তাহলে হল/হোস্টেল-এর সকল পাওনা পরিশোধ করে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষিত নির্ধারিত তারিখের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় হল/হোস্টেল কর্তৃপক্ষ তাদের কক্ষ থেকে জিনিসপত্র অপসারণ করবে এবং এই সমস্ত জিনিসের দায়-দায়িত্ব হল/হোস্টেল কর্তৃপক্ষ বহন করবে না।"
জানা গেছে, অনিয়মিত এই শিক্ষার্থীরা হলে সুযোগ পেলেও ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নিয়মিত শিক্ষার্থীরা ক্লাস শুরু হওয়ার দু্ই সপ্তাহেও হলগুলোতে বৈধ সিট বুঝে পাননি। (কোন-কোন হল) এমন প্রেক্ষাপটে আবারও গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির চালুর শঙ্কা প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থী ও ছাত্র নেতারা।
সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ভিপি আহসান হাবীব ইমরোজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রথম বর্ষের সিট বরাদ্দ নিশ্চিত না করে ক্লাস শুর করা হয়েছে। অধিকাংশ নবীন শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসায় আবাসন সংকট তাদের জন্য বড় ভোগান্তি তৈরি করছে। দ্রুত সিট বরাদ্দ না হলে হলে আবারও গেস্টরুম-গণরুম সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
ছাত্রদল ২৫-২৬ সেশনের নবীন শিক্ষার্থীদের রুমের ফ্লোরে তাদের নিয়ন্ত্রণে উঠাচ্ছে অভিযোগ করে জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সাধারাণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের আইডিতে এক পোস্টে লিখেছেন, অতীতে শুরতে অছাত্রদের হলে অবস্থান ও রুম দখল, পরে কৃত্রিম সিট সংকট,সেখান থেকে শুরুতে নতুনদেরকে ফ্লোরিং তারপর গণরুমের সংস্কৃতিতে বাধ্য করতে দেখেছি ছাত্রলীগকে। ৫ই আগষ্টের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণরুম,গেস্টরুম ও অছাত্রদের হলে অবস্থানের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু নতুন করে সেই পুরোনো সংস্কৃতির উপসর্গের পুনরাবৃত্তি দেখছি।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফন্ট ঢাবি শাখার আহবায়ক মোজাম্মেল হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে ক্লাস শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, ক্লাস শুরু হওয়ার প্রায় ১৫ দিন পার হয়ে গেলেও এখনো অনেক শিক্ষার্থী সিট বরাদ্দ পায়নি। এর ফলে তারা চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা আরও বেশি ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে আমরা দেখেছি, আবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, যা কোনোভাবেই একটি সুস্থ শিক্ষার পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদি সময়মতো সিট বরাদ্দ নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে সেই পরিস্থিতি পুনরায় সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গণরুম-গেস্টরুমে ফিরিয়ে আনা নিয়ে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের অবস্থান
২০২৫ সালে ডাকসু নির্বাচনের আগে অন্যান্য প্যানেলের সাথে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল থেকেও শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি আর ফিরে আসবে না। তবে চলতি বছর জাতীয় নির্বাচনে ছাত্রদলের মাতৃ সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি নির্বাচিত হওয়ার পর আবারও পূর্ব সংস্কৃতি ফিরে আসবে কি না প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হলগুলোতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সিট বরাদ্দ না হওয়া ও অনিয়মিত ছাত্রদের জায়গা পওয়ার কারণে এই প্রশ্নে আরও গতি এনেছে। তবে ছাত্রদল বলছে, এধরণের অভিযোগ গোপন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” প্রচারণার অংশ। যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্রদল লড়াই করেছে, সেই ব্যবস্থা ছাত্রদলের হাত ধরে পুনরায় চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসক বলেন, তারা আগামীকাল সংশ্লিষ্ট মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়গুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করবেন। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে যে অভিযোগগুলো তোলা হচ্ছে, সেগুলো একটি “গোপন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” প্রচারণার অংশ।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পূর্ববর্তী সময়ে যারা গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল এবং পরবর্তীতে শিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে, তারাই এখন এসব অভিযোগ তুলছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল অতীতে ফ্যাসিবাদী আমলে গেস্টরুম, গণরুম এবং জবরদস্তিমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে। যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্রদল লড়াই করেছে, সেই ব্যবস্থা ছাত্রদলের হাত ধরে পুনরায় চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
তিনি অভিযোগ করেন, যারা অতীতে এই সংস্কৃতির অংশ ছিল এবং এর মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছে, তারাই এখন নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য নতুন করে এসব ইস্যু সামনে আনছে।
সম্প্রতি জহুরুল হক হলের একটি এক্সটেনশন ভবনে গেস্টরুম সংক্রান্ত অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা কোনো শিক্ষার্থীর সরাসরি অভিযোগ দেখিনি। বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইনস্টিটিউটের একজন শিক্ষক প্রকাশ্যে বলেছেন যে, তাকে চাপ দিয়ে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে বলে স্বীকার করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যদিও বাস্তবে এমন কিছু ঘটেনি।
তিনি আরও দাবি করেন, ডাকসু নেতৃবৃন্দ বর্তমানে রাজনীতিতে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না এবং শিক্ষার্থীদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে তারা ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে নতুন শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্নদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে এবং পরিকল্পিতভাবে দোষ চাপানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
যা বলছে ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিতে সোমবার (২০ এপ্রিল) রেজিস্ট্রার ভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছেন ডাকসুর নেতারা। এদিন দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এই অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে তারা রেজিস্ট্রার ভবনের ভেতরে মিছিল নিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় তলা প্রদক্ষিণ করেন। এসময় ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ কার্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় ডাকসু নেতার উপচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
পরে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনার পর এক ব্রিফিংয়ে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এসএম ফরহাদ জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আজকের মধ্যেই হলগুলোতে সিটসংক্রান্ত সার্কুলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রতিটি হলে ফাঁকা সিটের তালিকা প্রস্তুত করে আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
ফরহাদ আরও বলেন, ক্লাস শুরুর আগেই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করেছিলাম। এ বিষয়ে ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধও জানানো হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত সিট নীতিমালা প্রণয়ন বা বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। আজ রাত পোহালেই অনেক শিক্ষার্থী জানে না কোথায় থাকবে। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক। এ পরিস্থিতিতে আগামী ২৫ এপ্রিলের মধ্যে সিট নীতিমালা চূড়ান্ত করা, যাদের সিট দেওয়া সম্ভব নয় তাদের জন্য আবাসন ভাতা বা শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রথম বর্ষের সব ধরনের ক্লাস বন্ধ থাকবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, একটি রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন শিক্ষার্থীদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আবারও গণরুম সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং এতে প্রশাসনের কিছু অংশের নীরব সমর্থন রয়েছে
ডাকসু নেতাদের সাথে আলোচনার পর উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম নিজ অফিসে সাংবাদিকদের ও ডাকসু নেতৃবৃন্দের বলেন, তোমাদের সকলের কথা (দাবি) গুলো শুনেছি। আমি হল প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সাথে বসে খবর নিতে হবে। আগামী ৩০ তারিখের মধ্যে কোথায় কয়টা সিট ফাঁকা আছে, কোন হলের কি অবস্থা এগুলো চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
এদিকে শেখ মুজিবুর রহমান হলে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের সিট বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড মো আক্তারুজ্জামান দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কিছু স্টুডেন্ট যারা ১৭ বছর ক্যাম্পাসে থাকতে পারেনি অথবা ৭-৮ সেশন বা ১২-১৩ সেশনের যাদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়েছিল, তারা তৎকালীন উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান স্যারের কাছে আবেদন করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে স্পেশাল পারমিশনে তারা ছাত্রত্ব ফিরে পায়। তাদের এই ব্রেক অফ স্টাডিটাকে রেগুলার স্টুডেন্ট হিসেবে।
তিনি আরও বলেন, প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং এবং সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তটা যে শিক্ষার্থী যেই হলে আছে সেই হলের প্রভোস্টদের ইনফর্ম করা হয়। যে এদেরকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তারা রেগুলার ছাত্র হিসেবে ট্রিট হবে। এবং তারা যদি হলে আবেদন করে, হলে সিট ফাঁকা থাকে আর নিয়মমাফিক যদি তারা আবেদন করে তাহলে তাদেরকে সিট দিতে হবে।