জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। পরিবহন খাত থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা ভোগ্যপণ্য—সবখানেই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কিছুটা কমলেও তার বহুগুণ সামাজিক মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।
নতুন নির্ধারিত দামে ডিজেল লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি লিটারে ডিজেলে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা এবং অকটেনে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু একটি জ্বালানি সমন্বয় হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদরা, বরং তারা এটিকে পুরো অর্থনীতিতে ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরির সূচনা হিসেবে বিবেচনা করছেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও চাপ
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ব্যাপক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরান-ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ওঠানামা করছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানির দাম সমন্বয় করেছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে ভর্তুকি দিয়ে আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সমন্বয় না করায় সরকারের ব্যয় বাড়তে থাকে।
একপ্রকার নিরুপায় হয়েই জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার—এমনটাই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ভর্তুকির চাপ—সব মিলিয়ে সরকারের সামনে বিকল্প সীমিত হয়ে পড়েছিল। তবে এই সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে, অপরদিকে মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন করে চাপ তৈরি হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সানেম’ - এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, “জ্বালানির দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কমে, এটি সত্য। কিন্তু একইসঙ্গে এটি পুরো অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করে। পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর এর বোঝা পড়ে।”
তিনি আরও বলেন, ‘‘এটি একটি দীর্ঘ চেইন ইফেক্ট তৈরি করে, যা নিয়ন্ত্রণ না করলে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে।’’
ভর্তুকির চাপ ও নীতি সমন্বয়
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক দামের চেয়ে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করছিল, ফলে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছিল। এতে বাজেট ঘাটতির ওপর চাপ বাড়ছিল এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাও প্রভাবিত হচ্ছিল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয় না করলে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতো। তাই এক ধরনের নীতি সমন্বয়ের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে।
ঋণ ছাড়ের শর্ত পূরণে অগ্রগতি
বর্তমানে আইএমএফের একটি বড় ঋণ কিস্তি ঝুলে আছে। সংস্থাটি বারবার জানিয়েছে, কাঠামোগত সংস্কার, বিশেষ করে ভর্তুকি প্রত্যাহার—দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে ঋণ ছাড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম সমন্বয়কে অর্থনীতিবিদরা ‘সংস্কারের সূচনা’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এর মাধ্যমে আইএমএফকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, সরকার ধীরে ধীরে হলেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল অভ্যন্তরীণ চাপ সামাল দেওয়ার জন্য নয়—বরং বহুল আলোচিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ প্রাপ্তির পথ সহজ করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, “এই মুহূর্তে আইএমএফের একটা বড় লোনের কিস্তি পেন্ডিং আছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে বলছে, সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার করছে না, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি প্রত্যাহারের বিষয়ে। সেই দিকেই হয়তো এখন একটি ধাপে ধাপে অগ্রগতি শুরু হলো। অতিরিক্ত সাবসিডি দেওয়া সরকারের পক্ষে এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। রাজস্ব আহরণও প্রত্যাশিতভাবে হচ্ছে না। তাই জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের খুব বেশি বিকল্প ছিল না।”
আইএমএফ ঋণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে— বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা। সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফের ঋণ শুধু অর্থের যোগান নয়, বরং একটি ‘নীতিগত আস্থার সনদ’ হিসেবেও বিবেচিত।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইএমএফের ঋণের কিস্তি আটকে থাকলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে বৈদেশিক লেনদেন, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতা রক্ষায় ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‘আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি চলমান রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, উন্নয়ন সহযোগী অন্যান্য সংস্থাও সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে আইএমএফের মূল্যায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।’’
এদিকে আইএমএফ বরাবরই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি খাতে ভর্তুকি কমানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি— অতিরিক্ত ভর্তুকি বাজেট ঘাটতি বাড়ায় এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সেই বিবেচনায় জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়কে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পদক্ষেপ হিসেবে দেখে।
ভর্তুকির চাপ কমানোই প্রধান লক্ষ্য
সরকার এতদিন আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে কম দামে জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে বিপুল ভর্তুকি দিচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই ভর্তুকি বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আইএমএফের কোনও সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘‘সরকারি তহবিলে চাপ বাড়ায় দাম বাড়ানো হয়েছে। তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আইএমএফের কোনও সম্পর্ক নেই।’’
তিনি বলেন, ‘‘তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, নাও বাড়তে পারে। সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ‘’
রবিবার (১৯ এপ্রিল) বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক নিয়ে সচিবালয়ে নিজ দফতরে ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘‘জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের বাইরে গিয়ে আইএমএফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কাছে কোনও ঋণ নেবে না সরকার।’’
তবে বাড়ছে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়বে—যার প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, এই ধাক্কা সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদে অন্তত তিন মাসের জন্য একটি জরুরি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নেওয়া জরুরি। খাদ্য সহায়তা ও নগদ সহায়তার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা না করলে দারিদ্র্যের হার বাড়তে পারে।
প্রথম ধাক্কা পরিবহন খাতে
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে দ্রুত এবং দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। দেশের বেশিরভাগ পণ্য পরিবহন এবং গণপরিবহন ডিজেলনির্ভর। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লঞ্চের পরিচালন ব্যয় একধাক্কায় বেড়ে গেছে।
পরিবহন মালিক সমিতির প্রতিনিধিরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পর ভাড়া সমন্বয় ছাড়া পরিবহন চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। এতে যাত্রী ভাড়া এবং পণ্য পরিবহন খরচ উভয়ই বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভাড়া বৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ে না; বরং ধাপে ধাপে বাজার ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে গিয়ে যুক্ত হয়। অর্থাৎ, একজন কৃষক থেকে শুরু করে একজন নগর ভোক্তা পর্যন্ত সবাই এর প্রভাব অনুভব করে।
পণ্যের দামে চেইন ইফেক্ট
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। কৃষিপণ্য, খাদ্যপণ্য এবং শিল্পপণ্য— সবকিছুই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছাতে জ্বালানিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
এর ফলে পাইকারি বাজার থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হয়।
একজন বাজার বিশ্লেষক বলেন, “জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথমে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, এরপর পাইকারি দাম, তারপর খুচরা দাম— এভাবে একটি ধারাবাহিক চেইনে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়।”
শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি
শিল্প খাতেও জ্বালানির প্রভাব গভীর। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব জেনারেটর ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যা সরাসরি জ্বালানিনির্ভর। ফলে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়।
টেক্সটাইল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সিরামিক, ইটভাটা এবং ক্ষুদ্র শিল্প—সবখানেই জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইনপুট। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি একটি “কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন”, যেখানে সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক মূল্যস্তর বেড়ে যায়।
সরকারের আর্থিক সাশ্রয় কত?
জ্বালানির দাম বাড়ানোর মাধ্যমে সরকার সরাসরি কোনও মুনাফা অর্জন করে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে বহন করা ভর্তুকির চাপ কমায়।
বিপিসি’র পরিসংখ্যান ও বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী দেশে ডিজেল ব্যবহার আনুমানিক ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি লিটারের মধ্যে ওঠানামা করে বলে ধারণা করা হয়। প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানো হলে শুধু ডিজেল থেকেই বছরে প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি কমানো সম্ভব।
কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন মিলিয়ে মোট সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে আনুমানিক ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ, সরকারের বাজেট ঘাটতি ও ভর্তুকি ব্যয়ের ওপর থাকা বড় চাপ কিছুটা কমবে। তবে এই আর্থিক স্বস্তির বিপরীতে সামাজিক খরচ অনেক বেশি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার ব্যবস্থার ভূমিকা
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন ব্যয় বাড়ার সুযোগে বাজারের বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত মুনাফা গ্রহণের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
এতে প্রকৃত খরচ বৃদ্ধির তুলনায় বাজারে পণ্যের দাম অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে সরবরাহ চেইনের মধ্যবর্তী স্তরে স্বচ্ছতার অভাব থাকলে এই প্রভাব আরও তীব্র হয়।
একজন অর্থনীতিবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি চাপ তৈরি হয়। সেই চাপ যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করা হয়, তাহলে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি অতিরিক্ত হয়ে যায়।”
মানুষের জীবনযাপনে প্রভাব
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। তাদের আয় একই থাকলেও ব্যয় দ্রুত বাড়বে। খাদ্য, পরিবহন, শিক্ষা ও বাসাভাড়ার খরচ বাড়ায় বাস্তব আয় কমে যাবে।
বিশেষ করে শহরাঞ্চলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। গ্রামাঞ্চলেও কৃষিপণ্যের পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামাজিক খরচ বনাম আর্থিক সাশ্রয়
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তে সরকারের আর্থিক সাশ্রয় হলেও সামাজিক খরচ অনেক বেশি। কারণ মূল্যস্ফীতি বাড়লে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতার ওপর পড়ে। তারা মনে করেন, জ্বালানির দাম সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজার তদারকি, পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।
জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার একদিকে হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় করতে পারছে, অপরদিকে সাধারণ মানুষের জীবনে তৈরি হচ্ছে নতুন চাপ। উৎপাদন, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে এর প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ অর্থনীতির হিসাব বলছে— সরকার কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পেলেও সামাজিক বাস্তবতায় বাড়ছে মানুষের কষ্ট। আর এই ভারসাম্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।