Image description

দুজন আমার অফিস কক্ষে ঢুকে দুটি পিস্তল বের করে টেবিলে রাখার পর এক কোটি টাকা চাঁদা চায়। তিন দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে হত্যার হুমকি দেয়। এরপরই একজন আমার দিকে অস্ত্র তাক করে একটি গুলি করে, যেটি কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। আরেকটি ফাঁকা গুলি করে অন্যজন। গুলির পর হুমকি দেয়– আজ কানের পাশ দিয়ে গুলি গেছে। চাঁদা না দিলে তিন দিন পর পিস্তলের গুলি সরাসরি শরীরে ঢুকবে।

গতকাল সোমবার ভুক্তভোগী গার্মেন্টস ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম অনেকটা আতঙ্কিত কণ্ঠে সমকালকে এসব কথা বলেন। ব্যবসায়ী কামরুলের কাছে চাঁদা দাবিতে গুলির ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গত রোববার রাতে মিরপুর এলাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলো– রানা (৩১), মো. সাগর শেখ (২৮), মো. কালু (২৮) ও শশী (২২)। 

গতকাল সোমবার মিরপুরে র‌্যাব-৪ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়। কামরুল জানান, তাঁর মালিকানার একেএম অ্যাপারেলস নামে গার্মেন্টসটির অবস্থান মিরপুর ১৩ নম্বরের বাইশটেকিতে। তিনি নিয়মিত সেখানে অফিস করেন। গত শনিবার তিনি অফিস কক্ষে ছিলেন। তখন ১১৫ জন শ্রমিক কারখানায় কাজ করছিলেন। ১২ থেকে ১৩ জন তাঁর গার্মেন্টসে ঢোকে। প্রথমে এক কর্মকর্তা তাদের বাধা দিলে তারা তাকে মারধর করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। অস্ত্র উঁচিয়ে শ্রমিকদের ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়। আতঙ্কে তারা কাজ বন্ধ করে রাখেন।

ব্যবসায়ী কামরুল আরও জানান, পরে দুজন অস্ত্র হাতে তাঁর অফিস কক্ষে প্রবেশ করে। তখন তিনি অফিসিয়াল কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তারা তাঁর সামনের টেবিলে দুটি পিস্তল রেখে একজন চেয়ারে বসে এবং অপরজন দাঁড়িয়ে থাকে। অস্ত্র দেখিয়ে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয় তাঁর কাছে। কথা বলতে বলতে মিনিটখানেকের মধ্যেই বসে থাকা ব্যক্তি টেবিল থেকে পিস্তল তুলে কামরুলের কানের পাশ দিয়ে গুলি করে। গুলিটি তাঁর পেছনের কাচ ভেদ করে হার্ডবোর্ড ফুটো হয়ে দেয়ালে লাগে। এরপর দাবি করা চাঁদার টাকা তিন দিনের মধ্যে পরিশোধ করার কথা বলার পর দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি আরেকটি ফাঁকা গুলি করে। এরই মধ্যে তাদের আরও দুজন সহযোগী অফিস কক্ষে প্রবেশ করে তাঁকে ঘিরে রাখে।

কামরুলের অফিস কক্ষে সিসি ক্যামেরা দেখতে পেয়ে এক সন্ত্রাসী বলে ওঠে, তাদের ছবি সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। এরপরই সেটি ভাঙচুর করে তারা। এ সময় তাঁর অফিসের লকারও ভাঙচুর করা হয়। অস্ত্র হাতে একজন সন্ত্রাসী বলে, ক্যামেরা ভাঙলেও তাদের ছবি থেকে যাবে। এরপর তারা চলে যাওয়ার সময় সিসি ক্যামেরার ডিভিআর ও হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যায়। এ সময় লিটন, টিটু ও রাজন নাম উল্লেখ করে নামগুলো মনে রাখার জন্য কামরুলকে বলে যায় তারা। কারখানার বাইরে থাকা আরেকটি সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। 

ভুক্তভোগী কামরুল জানান, সন্ত্রাসীরা তিন মিনিট অবস্থান করেছিল তাঁর গার্মেন্টসে। রাতেই তিনি কাফরুল থানায় মামলা করেন। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব-৪ মামলাটির ছায়াতদন্ত শুরু করে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তার রানা চাঁদাবাজির মূল পরিকল্পনাকারী। ঘটনার আগেই সে গার্মেন্টসে যান এবং আশপাশের নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা নেন। রানার ধারণা ছিল, পিস্তল বের করে ভয়ভীতি দেখালে গার্মেন্টস মালিকের কাছ থেকে চাঁদার টাকা আদায় করা যাবে। পরে সহযোগীদের নিয়ে রানা গার্মেন্টসের মালিকের কক্ষে গিয়ে কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মিরপুর, কাফরুল থানাসহ আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

র‌্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা জানিয়েছে, এ ঘটনার পরিকল্পনাকারী রানা। একেএম অ্যাপারেলস গার্মেন্টসটি একটি দূরবর্তী এলাকায় ও যাতায়াতের রাস্তা তুলনামূলক অনুন্নত হওয়ায় রানা এ গার্মেন্টসে চাঁদাবাজির পরিকল্পনা করে। গ্রেপ্তার রানা ও সাগরের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ; কালুর বাড়ি জামালপুর ও শশীর বাড়ি ঝিনাইদহ জেলায়।

র‌্যাব-৪-এর কোম্পানি কমান্ডার কে এন রায় নিয়তি বলেন, চাঁদাবাজি ও গুলির ঘটনায় জড়িত অপর আসামিদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
কাফরুল থানার ওসি সাজ্জাদ হোসেন সমকালকে বলেন, গতকাল সোমবার দুপুরের পর র‌্যাব চারজন আসামিকে থানায় হস্তান্তর করেছে। আজ মঙ্গলবার রিমান্ড আবেদন করে তাদের আদালতে পাঠানো হবে।