Image description

সকাল ১০টা। রাজধানীর প্রাচীনতম স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের টিকিট কাউন্টারে লম্বা সিরিয়াল। মধ্যবয়স্ক এক নারী প্রত্যেক রোগীর কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলছেন, এখানে চিকিৎসা নিতে দেরি হবে। বাগানে যান। ওখানে সব ব্যবস্থা আছে। মধ্যবয়স্ক ওই নারীর কথার সূত্র ধরে খোঁজা হয় ওই বাগান। পিছু নেওয়া হয় তার। গিয়ে দেখা যায় মূলত ওই নারী হাসপাতালের ফুলবাগানকে বুঝিয়েছেন। যেখানে চারপাশে ওত পেতে রয়েছে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালের একঝাঁক দালাল। ফাইল বা হাসপাতালের টিকিট হাতে কাউকে দেখলেই পথ আগলে দাঁড়াচ্ছেন তারা। কেউ রোগীদের পিছু নিচ্ছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বল্প খরচে ভালো চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন মিটফোর্ড হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এক রোগী নেওয়া হলে ওই দালাল আবার এসে দাঁড়াচ্ছেন ওই বাগানের পাশে। বেলা শেষে কে কয়টি রোগী বাগিয়েছেন, সেই হিসাবও কষছেন বাগানের এককোণে দাঁড়িয়ে খোশগল্পের আলোচনায়।

গত শনিবার দিনভর সরেজমিন হাসপাতালটিতে এমন চিত্র দেখা যায়। শুধু রোগী ভাগিয়ে নেওয়া নয়, অনিয়ম ও হয়রানির শেষ নেই প্রাচীনতম এই হাসপাতালটিতে। কোনো কোনো চিকিৎসক এক গাদা টেস্ট লিখে দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে রিপোর্ট দেখানোর বাহানায় প্রাইভেট হাসপাতালের নাম লেখা টোকেন ধরিয়ে দিচ্ছেন। রোগীরাও নিরুপায় হয়ে ওই হাসপাতাল থেকে টেস্ট করিয়ে আনছেন। অন্য হাসপাতালের মতো হুইলচেয়ার ঘিরেও গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। তবে হাসপাতালে ভর্তি নয়-প্লাস্টার খুলতে টিকিট আসা কিংবা পুনরায় চিকিৎসক দেখাতে আসা পঙ্গু রোগীরা এই সিন্ডিকেটের পাল্লায় পড়ে টাকা দিতে চেয়েও হুইলচেয়ার পান না। রোগী ভর্তির ক্ষেত্রেও করা হচ্ছে বিভিন্ন টালবাহানা। সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারে। সকাল ৯টা থেকে টিকিট দেওয়া শুরু হলেও টিকিট কাটতে ভোর ৫টায় সিরিয়াল দিয়েও লেগে যাচ্ছে অর্ধদিন। ডাক্তাররাও দেরি করে আসায় লম্বা হতে থাকে রোগীর সিরিয়াল।

অর্ধশত দালালের রাজত্ব : হাসপাতালের ১ নম্বর ও ২ নম্বর ভবনের ঠিক মাঝে ফুলবাগান অবস্থিত। ফুলবাগানের পশ্চিম পাশে বিশাল শেড। এটি বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টার। ১৫টি টিকিট কাউন্টারের দুটি স্টাফ, মুক্তিযোদ্ধা ও বৃদ্ধদের জন্য। তবে স্টাফ ও তাদের স্বজনরাই ব্যবহার করেন সেগুলো। জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগের মাঝামাঝি ফুলবাগানের (যা দালালদের কাছে বাগান বলে পরিচিত) আশপাশে দাঁড়িয়ে তৎপর থাকে দালাল চক্র। তাদেরই কেউ কেউ টিকিট কাউন্টারে গিয়েও প্রলোভন দেখান। আর এসবই হয় প্রশাসনের নাকের ডগায়। ফুলবাগানের পাশে কথা হয় শাহজালাল নামে এক দালালের সঙ্গে। তিনি রোগী ভাগিয়ে মিটফোর্ডের সামনের আল-আরাফাত হাসপাতালে ভর্তি করান। রোগী সেজে কথা বললে শাহজালাল বলেন, আমার সঙ্গে চলেন আল্লাহ রহম করলে আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব সর্বোচ্চ ডিসকাউন্ট করিয়ে দেব। দ্রুত সময়ে সুস্থ হয়ে যাবেন, টেস্টের রিপোর্ট পেতেও সময় লাগবে না। মনির নামে এক দালাল বলেন, তারা রোগীদের ভালো চিকিৎসা পেতে সহযোগিতা করেন। সরেজমিন দেখা যায়, মিটফোর্ডের আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর মধ্যে অন্যতম আল-আরাফাত হাসপাতাল, বাঁধন হাসপাতাল, ম্যাক্সলাইফ হাসপাতাল, মুনলাইট ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতাল, মেডিলাইফ স্পেশালাইজড হাসপাতাল লিমিটেড, মেডিএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইস্টার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নিউ পিপলস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, মেডিসান হেল্থ কেয়ার ডায়াগনস্টিক, ভিক্টোরি হাসপাতাল। তবে হাসপাতালের ন্যূনতম নিয়ম-কানুন তারা মানেন না। দালালদের মাধ্যমে মিটফোর্ডে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় মানুষকে ফাঁদে ফেলাই তাদের প্রধান ব্যবসা।

টেস্ট করাতে প্রাইভেট হাসপাতালের টোকেন : গত বুধবার মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হন হানিফ (ছদ্মনাম) নামে এক পরিবহন শ্রমিক। সিটি স্ক্যান রুমের সামনে কথা হয় হানিফ ও তার স্ত্রীর সঙ্গে। হানিফ বলেন, আমার বাসা ধোলাইপাড় এলাকায়। দুই বাসের মাঝে পড়ে কাঁধে ও বুকে আঘাত পাই। এই হাসপাতালে এলে ৮টি টেস্ট করতে দেন। এগুলোর মধ্যে জরুরি ৬টি টেস্টের রিপোর্ট দ্রুত প্রয়োজন বলে সাদা কাগজে হাসপাতালের নাম ও একটি ফোন নম্বর লেখা টোকেন দেন। এক্সরে ও ইসিজি মিটফোর্ড হাসপাতালে করালেও ওই ৬টি টেস্ট চিকিৎসকের লিখে দেওয়া মেডিসান হেল্থ কেয়ার ডায়াগনস্টিক থেকে ৩ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে করিয়ে আনেন। হানিফের স্ত্রী বলেন, ডাক্তার দেখলেই শুধু টেস্ট ধরিয়ে দেয়। আমরা এত টাকা পামু কই? শুধু হানিফই নয় ওয়ার্ডে ভর্তি আরও কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসকদের টোকেন পদ্ধতির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

টাকাতেও মেলে না হুইলচেয়ার : দুপুর ১২টার দিকে এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এমআরআই রুমের সামনে এসে একটু বসার জায়গা চান ইমরান নামে এক যুবক। এক হাতে স্ট্রেচার থাকলেও জরুরি বিভাগের সামনে সিএনজি থেকে নেমে ভাঙা পা নিয়ে লাফিয়ে আসতে হয়েছে তাকে। কারণ তার স্ত্রী খুঁজে পাননি কোনো হুইলচেয়ার। ইমরান জানান, ১৪ রোজায় মাওয়া রোডে বাইক দুর্ঘটনায় তার পা ভেঙে যায়। হাসপাতালের নিচ তলায় এক্সরে করিয়ে পাঁচ তলায় চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। হুইলচেয়ার না থাকায় চিন্তার ভাঁজ পড়ে তার। আর তার স্ত্রী পাগলের মতো হুইলচেয়ার খুঁজতে থাকেন। রিসিপশন থেকে ১২৪ নম্বর রুম, সেখান থেকে আরেক জায়গা, এভাবে ঘুরতে থাকেন। ১২৪ নম্বর রুম থেকে জানানো হয় ভর্তি রোগী ছাড়া তারা হুইলচেয়ার দেবেন না। আর রোগীদের কাছ থেকে বকশিশ নেওয়া হুইলচেয়ার সিন্ডিকেটের সদস্যরা সাময়িক সময়ের জন্য আসা রোগীর প্রতি গুরুত্ব দেন না। এতে টাকা দিতে চেয়েও মেলেনি হুইলচেয়ার। এক্সরে রুমের সামনে লাইনে থাকা বেশ কয়েকজন পঙ্গু রোগীকে স্বজনের কাঁধ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

রক্ত ছাড়া নেওয়া হয়নি ভর্তি : ও ভাই, ও আপা এ পজিটিভ রক্ত আছে? এমন অনুনয়বিনয় করে ঘুরতে দেখা যায় সালমা নামে এক গর্ভবতী নারীকে। ব্লাড ব্যাংকে গিয়েছিলেন? প্রশ্ন করা হলে ওই নারী বলেন, গেছিলাম- রক্ত পাইনি। রক্ত জোগাড় না হলে আমাকে ভর্তি নেওয়া হবে না। একটু দেখেন ভাই কোথাও রক্ত পান কি না। এরই মধ্যে তার স্বামী আসেন। রক্তের সন্ধানে উৎকণ্ঠায় একের পর এক স্বজনদের ফোন করে যাচ্ছেন তিনি। রক্তের সন্ধান না পেয়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে আবার দিগ্বিদিক  ছোটাছুটি শুরু করেন। সিরিয়ালেই অনেকের অর্ধদিন পার : বুড়িগঙ্গার ওপার কদমতলী এলাকা থেকে ডাক্তার দেখাতে আসেন সোমা নামে এক গৃহবধূ। এজন্য তার স্বামী ভোর ৫টায় এসে বহির্বিভাগের সিরিয়ালে দাঁড়ান। অথচ সকাল ৯টা থেকে টিকিট দেওয়া শুরু করে কাউন্টারগুলো। ভোরে আসায় দ্রুতই টিকিট পেয়ে যান তার স্বামী। এরপর চিকিৎসক দেরিতে আসায় সেখানে সিরিয়ালে পড়েন। পরে ডাক্তার দেখেন। এক্সরে করিয়ে আবার যেতে বলায় শুরু হয় তাদের এক্সরে করানোর জন্য দৌড়ঝাঁপ। এরই মধ্যে বেজে গেছে দুপুর ১টা। এক্সরে রিপোর্ট পেতে দেরি হলে আবার ডাক্তারের সিরিয়ালের জন্য আসতে হবে তাদের। টিকিট কাউন্টারে দাঁড়ানো ২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে এ প্রতিবেদক। রোগীরা বলেছেন, টিকিট কাউন্টারে ভোর থেকেই রোগী অথবা তাদের স্বজনরা সিরিয়াল দেন। এখানে সার্ভার স্লো দোহাই দিয়ে খুবই ধীর গতিতে টিকিট দেওয়া হয়। এজন্য ১৫টি কাউন্টার থাকার পরও ভিড় কমে না।

ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভিড় : সকাল গড়াতেই হাসপাতালের ভিতর-বাইরে বাড়তে থাকে ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের উপস্থিতি। তবে দুপুরের পর ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তারা ঢুকে পড়েন বিভিন্ন ওয়ার্ডে। সরেজমিন দেখা যায়, ৫-৭ জনের গ্রুপে এসব প্রতিনিধিরা রোগীদের বেডের পাশে গিয়ে কথা বলছেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র হাতে নিয়ে মোবাইল ফোনে ছবি তুলছেন। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের সঙ্গে আলাপ করে তাদের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন সংগ্রহ করতেও দেখা গেছে। ওয়ার্ডের ভিতরে এভাবে প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, বিষয়টি নতুন নয়। হাসপাতালের ভিতরে এটা সবাই জানে।

সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা? : স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম এ রুস্তম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মিটফোর্ড হাসপাতালের অবস্থা এরকম, সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা? এখানে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এবং নতুন ভবন না থাকা হচ্ছে প্রধান সমস্যা। ৯০০ বেডের হাসপাতাল, অথচ সচল অ্যাম্বুলেন্স মাত্র একটি। হুইলচেয়ারের সংকট রয়েছে। ব্রিটিশ আমলের অনেক জিনিসপত্র এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে। অপারেশনের জন্য জরুরি যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। জায়গা স্বল্পতার কারণে জনবল থাকার পরও অনেক বিভাগ চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। শুধু এ কারণে এই হাসপাতালে হামের চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, দালালের দৌরাত্ম্য এই হাসপাতালের জন্য সবচেয়ে খারাপ দিক। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি- হাসপাতালকে দালালমুক্ত করার। তবে এক্ষেত্রে দায়িত্বরত পুলিশ ও আনসার সদস্যদের আরও তৎপর হতে হবে। হাসপাতালের কিছু কর্মচারীও রোগীদের হয়রানি ফেলার অভিযোগ পাওয়ায়, ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।