Image description

পাঠ্যক্রম পরিবর্তনে ফের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই টেকসই পরিবর্তন করতে নেয়া হবে সব পক্ষের মতামত। নতুন কারিকুলামে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক পাঠদান এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত শেখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং হাতে-কলমে শেখা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনার বিকাশকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। একইসঙ্গে ডিজিটাল কনটেন্ট, ইন্টার অ্যাকটিভ লার্নিং এবং আধুনিক শিখন পদ্ধতির অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি বাস্তবায়নে নানান পর্যায়ের স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বিএনপি সরকার তিন ধাপে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। যাতে থাকবে পাঠ্য বই পরিমার্জন, কারিকুলাম রিভিউ এবং নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন। চলতি বছর কমিটি গঠন ও পরিকল্পনা, ২০২৭ সালে পাঠ্য বই পরিমার্জন ও প্রশিক্ষণ এবং ২০২৮ সালের শিক্ষাবর্ষে পূর্ণাঙ্গ পরিবর্তন। আর ২০২৭ সালের জন্য পাঠ্য বইয়ে আনা হবে পরিবর্তন। কারিকুলাম প্রণয়নের জন্য ২০০ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা হবে। যাতে থাকবে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক। সেইসঙ্গে অভিভাবকদের তরফে প্রতিনিধি রাখারও পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পরিমার্জনের পাশাপাশি বিদ্যমান কাঠামোর দুর্বলতা নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান কাঠামোর সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব প্রয়োগের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হবে। এরপর সেই অভিজ্ঞতার আলোকে প্রণয়ন করা হবে একটি নতুন শিক্ষাক্রম।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, চতুর্থ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য শারীরিক শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিল্পকলা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে চতুর্থ শ্রেণি থেকেই বাধ্যতামূলক খেলাধুলা যুক্ত করা হবে।
২০১০ শিক্ষাবর্ষে আওয়ামী লীগ সরকার সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করে। বাস্তবতা বিবেচনা না করেই চালু করা হয় এই পদ্ধতি। এর উদ্দেশ্য ছিল মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, নিজস্ব মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশ। ২০১২ সালে পুরোদমে চালু হওয়া এই পদ্ধতি মুখ থুবড়ে পড়ে। ২০১৮ সালে এক গবেষণায় দেখা যায়, ৪২ শতাংশ শিক্ষকই সৃজনশীল বোঝেন না। তারা প্রশ্ন করতেও পারেন না। নোট-গাইড দেখে প্রশ্ন তৈরি করেন এবং উত্তর বানান। শিক্ষার্থীদের ৯২ শতাংশও হয়ে পড়ে গাইড বইনির্ভর। এরপর বাতিল করা হয় এই পদ্ধতি। ২০২২ সালে ফের বাস্তবতা বিচার না করেই ফের আনা হয় কারিকুলাম। ফিনল্যান্ডের আদলে প্রস্তুত করা এই কারিকুলাম বাংলাদেশের জন্য ছিল বাস্তবতা বিবর্জিত। শুরুতেই সমালোচনাসহ নানান কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছিল এই কারিকুলাম। বিএনপি সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের পরিবেশ, অর্থনীতিসহ নানান যুগোপযোগিতা বিবেচনা করে প্রস্তুত করা হবে। সরকারের ভাষ্য, তড়িঘড়ি করে কারিকুলামের পথে হাঁটবে না।

কারিকুলামের প্রাথমিক আলোচনায় বেশ কয়েকটি বিষয় উঠে এসেছে। কারিকুলাম নিয়মিত আপডেট করা হবে। এতে স্পষ্ট করা হবে শিক্ষার্থীরা কী পড়বে বা কতোটুকু পড়বে। সেটার সঙ্গে বাস্তবে এম্পিলিমেন্ট নির্ভর এক্সিলারেন্স ম্যাপিং করা হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল আপডেট ব্যবহার ও ডিজিটাল নিরাপত্তা যুক্ত থাকবে। যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে হাতে শেখা কাজ ও টিম ওয়ার্ক।

আওয়ামী লীগ আমলে চাপিয়ে দেয়া কারিকুলামের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন শিক্ষক মো. আশিকুর রহমান। আন্দোলন থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল থানায়। মুচলেকার মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া এই শিক্ষক বলেন, আওয়ামী আমলে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের নীল নকশা নেয়া হয়েছিল। তারপর যে কারিকুলাম দেয়া হয়েছিল তাও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি শিক্ষকদের নামকাওয়াস্তে ট্রেনিং দেয়ার জন্য। তিনি বলেন, কোনো কারিকুলামই শতভাগ ভালো বা খারাপ হয় না। কিন্তু শিক্ষকদের যুক্ত করতে হবে এটার সঙ্গে। দিতে হবে প্রকৃত প্রশিক্ষণ। কারিকুলামের জন্য চিন্তা করতে হবে শহরের স্কুলের সন্তানের জন্য ঠিক তেমনি চরের স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্যও। ভাবতে হবে দরিদ্র বাচ্চাদের কথাও।
গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান নির্বাহী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ঘাটতি থাকলে যেকোনো কারিকুলামই আলোর মুখ দেখবে না। তাই সঠিকভাবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার বিকল্প নাই। তিনি বলেন, কারিকুলাম হতে হবে সময়নির্ভর। মুখস্থনির্ভরতা থাকা যাবে না। আর শিক্ষার্থীদের ক্যাপাসিটি যাচাই করতে হবে। ক্যাপাসিটি অনুযায়ী কারিকুলাম ম্যানেজ করতে হবে। কোনোভাবেই কোচিং কিংবা গাইড বইয়ের ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এই পথে হাঁটা যাবে না।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, আমাদের প্রাইমারি শিক্ষার কারিকুলামে অনেক ঘাটতি রয়েছে। কয়েকটি স্কুলে গিয়ে বিশেষ করে ফোর-ফাইভের শিক্ষার্থীদের বই থেকে পড়তে বলার পর দেখেছি পড়াটা তাদের জন্য বেশ মুশকিল হয়। আসলে আমাদের দেখতে হবে তারা আসলে কী পড়ছে। পড়াগুলো, ভাষাগুলো তাদের জন্য উপযোগী কিনা। সাবলীলভাবে তারা পড়তে পারবে কিনা। আমার কাছে মনে হয়েছে তাদের জন্য পড়াগুলো বেশ কঠিন। এজন্য আমরা কারিকুলাম পর্যালোচনা করে আপডেট করা হবে।

সম্প্রতি কারিকুলামের বিষয়ে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে চলমান পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন ও নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন ও নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দলমত বিবেচনা করা হবে না। উচ্চমানের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই কাজ সম্পন্ন করা হবে। চতুর্থ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য শারীরিক শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিল্পকলা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। কেবল পাঠ্য বই হিসেবে নয়, এই বিষয়গুলোর ওপর নিয়মিত মূল্যায়ন পরীক্ষাও নেয়া হবে। যাতে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীল ও স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে গড়ে ওঠে।