দেশে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) পর্যন্ত এক মাসে হামে নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের। কিন্তু সন্দেহজনক হাম রোগে এই মৃত্যুর সংখ্যা ১৭২ জন। অর্থাৎ মোট ২০৬ জন মারা গেছেন হাম কিংবা তার উপসর্গ নিয়ে। নিশ্চিত মৃত্যু এবং সন্দেহজনক রোগে মৃত্যুর মধ্যে এবং সন্দেহজনক আক্রান্ত ও নিশ্চিত আক্রান্তের মধ্যে সংখ্যাগত পার্থক্য থাকায় অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—সবাই কি হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, নাকি অন্য কোনও রোগ এখানে বিস্তার লাভ করছে?
স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে বলা হয়েছে, টেস্টের ঘাটতির কারণে অনেক সংখ্যা নিশ্চিত করা যায়নি। পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিক থেকেই হামের নমুনা পরীক্ষায় ঘাটতি ছিল। যার কারণে ‘উপসর্গ’ নিয়ে রোগীর সংখ্যা ‘নিশ্চিত’ হাম রোগী থেকে বেশি। তবে হামের বাইরে অন্য কোনও রোগের প্রাদুর্ভাব দেখছে না স্বাস্থ্য অধিদফতর।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য কী বলছে
স্বাস্থ্য অধিদফতর ১৫ মার্চ থেকে নিয়মিত হামের রোগীর তথ্য সরবরাহ করছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) পর্যন্ত ২০৬ জন হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এর মধ্যে সন্দেহজনক ১৭২ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যু ৩৪ জনের। এ সময়ে সারা দেশে হামের সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে ২০ হাজার ৩৫২ জন, তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৩ হাজার ১২৯ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগী ৩ হাজার ৬৫ জন। এদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে গেছে ১০ হাজার ৪৯৬ জন।
সন্দেহজনক এবং নিশ্চিত রোগীর মধ্যে বিস্তর ফারাক কেন
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, হামের উপসর্গ নিয়ে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা এবং নিশ্চিত শনাক্ত হাম রোগীর সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য প্রায় ১৭ হাজারের বেশি। এই পার্থক্য থাকার কারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এই গ্যাপের অন্যতম কারণ হলো—আমাদের ইনিশিয়ালি টেস্ট স্যাম্পল একটু কম নেওয়া হচ্ছিল। কম নেওয়ার কারণ হচ্ছে—বিগত সময়ে আমাদের অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) সব বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ সব জায়গায় কিন্তু ফান্ডের ক্রাইসিস।’’
তিনি বলেন, ‘‘একটা সিভিল সার্জন অফিস থেকে কোনও হসপিটাল বা দূরবর্তী কোনও জায়গায় যে স্যাম্পল কালেকশনে যাবে, বারবার যেতে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যূনতম যাতায়াত ভাড়া লাগে। সব কিছু মিলে আর্থিক সংকট ছিল। যার কারণে নমুনা পরীক্ষা প্রায় থেমে যাওয়ার পর্যায়ে ছিল।’’
তিনি বলেন, ‘‘এখন আর সে অবস্থা নেই। এখন মোটামুটি যারা ভর্তি হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্যাম্পল নেওয়া হচ্ছে। তবে এটা ঠিক, আমরা যতজন রোগী ভর্তি হচ্ছে, সবার স্যাম্পল আমরা নিতে পারছি না। যেগুলো নেওয়া সম্ভব হচ্ছে, সেগুলো নেওয়া হচ্ছে। আর এই দেরিটা হওয়ার অন্যতম কারণ হলো— এই রিপোর্টগুলো হতে একটু সময় লাগে।’’
হাম নিশ্চিতে সময় লাগে ৪৮ ঘণ্টা
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্টদের মতে, হামের পরীক্ষায় সময় বেশি লাগার কারণে রিপোর্ট পেতে বেশি সময় লাগছে। এতে অনেক সময় দেখা যাচ্ছে সন্দেহজনক রোগীর মৃত্যুর পর রিপোর্ট আসছে।
অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘‘ধরা যাক, একজন নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগী বেশ খারাপ হয়ে ভর্তি হলো, তার স্যাম্পল নিলাম এবং পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু রিপোর্ট আসার আগে বাচ্চাটা মারা গেল। সুতরাং, মৃত বাচ্চার সংখ্যা ডেফিনেটলি ‘সন্দেহজনক মৃত্যু’, কনফার্ম না হয়ে বলা যাবে না, এটা কনফার্ম কেস। সুতরাং ওটাকে সন্দেহজনক তালিকায় রাখতে হবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘তবে যেসব জায়গায় আউটব্রেক হচ্ছে হামের বা এই ধরনের যেগুলো মহামারির মতো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে একই ধরনের সন্দেহজনক উপসর্গ নিয়ে যারা ভর্তি হবে—ধরে নিতে হবে তারা ওই রোগেই আক্রান্ত। সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হবে। কিন্তু কাগজে-কলমে তো আমরা সেটা বলতে পারবো না। এ জন্য আমরা রিপোর্টের মধ্যে দুটি কলাম রাখছি। দুটি কলামে এটাকে আলাদা করে রাখা হয়েছে—সন্দেহজনক মৃত্যু আর কনফার্ম মৃত্যু।’’
হামের প্রাদুর্ভাব কেন বাড়লো, ধরন কি বদলেছে?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সরকার বলছে—টিকা ঘাটতির কারণেই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তবে ধরন বদলেছে কিনা গবেষণা করে খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
দেশব্যাপী হাম ছড়িয়ে পড়ায় সরকার টিকা গ্রহণের বয়স ৯ মাসের স্থলে কমিয়ে ৬ মাসে নিয়ে এসেছে এবং গত ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে। সংক্রমণের হার বিবেচনায় ১৮ জেলার ৩০ উপজেলার ১২ লাখ শিশুকে এই বিশেষ টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আগামী ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে হামের টিকা দেওয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, ‘আমরা ঘোষণা করেছিলাম আগামী ৩ মে থেকে সারা দেশে টিকা দেওয়া হবে। কিন্তু ইউনিসেফ থেকে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে পারায় আমরা এটিকে ১৪ দিন এগিয়ে নিয়ে এসেছি।
তিনি বলেন, ‘‘হঠাৎ করে হাম রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের তেমন কোনও প্রস্তুতি ছিল না। তবে অল্প সময়ে হাম প্রতিরোধে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।’’ অতীতের সরকারগুলোর ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে হামের প্রাদুর্ভাব হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘শুধু বাংলাদেশ না, অন্য দেশেও ৬ মাসের নিচের বাচ্চারা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এটা নতুন কোনও বৈশিষ্ট্য কিনা, সেটা এখনও জানা যায়নি। কারণ সেটা হলে টিকা পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু এখন যে টিকা আছে, সেটাই কাজ করছে।’’
অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘‘হামের কোনও নেচার চেঞ্জ হয়নি, কোনও মিউটেশন হয়নি। আগের যে হাম সেটাই এবং এটা ভ্যাক্সিনেশন ফেলিউরের কারণে হয়েছে।’’