Image description

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার হাটিপাড়া ইউনিয়নের বনপারিল দক্ষিণপাড়া গ্রামে সাত বছর বয়সি শিশু হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে এখন আলোচনায় মূল অভিযুক্ত কিশোর নাইম (১৫)। শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের পরপরই এলাকায় যে গণপিটুনির ঘটনা ঘটে, তারপর থেকেই নাইমকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

 

বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাত আনুমানিক ১০টার দিকে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টা ক্ষেত থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ওই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত আতিকা আক্তার (৭) স্থানীয় বনপারিল দাখিল মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির ছাত্রী এবং সৌদি প্রবাসী দুদুল মিয়া ও আরিফা আক্তারের মেয়ে।

 

পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ির পাশের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় আতিকা। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সন্ধ্যার পর মাইকিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়। পরে প্রতিবেশী এক শিশু জানায়, তাকে কিশোর নাইমের সঙ্গে দেখা গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে নাইম একটি ভুট্টা ক্ষেত দেখিয়ে দেয়, সেখান থেকেই আতিকার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

 

স্থানীয় সূত্র জানায়, মরদেহ উদ্ধারের পর ক্ষুব্ধ জনতা নাইমের পরিবারের সদস্যদের ধরে মারধর করে। ভাইরাল ভিডিওতে বাড়ির উঠানে তিনজনকে মারধরের দৃশ্য দেখা গেলেও সেখানে নাইমকে দেখা যায়নি। তবে নিহত পান্নু মিয়ার স্ত্রী নার্গিসের দাবি, ঘটনাস্থলে চারজনকে বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং সবাইকে মারধর করা হয়। এই ভিন্ন বর্ণনাই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

 

 

এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, ঘটনাটি যখন চরম উত্তেজনায় রূপ নেয়, তখনই নাইম সেখান থেকে পালিয়ে যায়। আবার অন্য একটি ধারণা বলছে, তাকে আগেই অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাটির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নাইমকে ঘিরে তথ্যের অস্পষ্টতা।

 

স্বজনদের দাবি, আতিকার স্বর্ণের কানের দুল লুটের উদ্দেশে তাকে হত্যা করা হতে পারে। পাশাপাশি তারা ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার আশঙ্কাও করছেন। পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে নাইম একাই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত হত্যার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত নয়।

 

এদিকে আতিকার মরদেহ উদ্ধারের পরই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ক্ষুব্ধ জনতা নাইমের বাবা পান্নু মিয়া, চাচা ফজলু ও ভাই নাজমুলকে ধরে মারধর করে। একপর্যায়ে তাদের পুকুরের পানিতে ফেলেও দেওয়া হয়। এ ঘটনায় প্রাণ যায় পান্নু ও ফজলুর। আহত নাজমুলকে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

 

আতিকার চাচা রবিউল আলম বলেন, ‘আতিকাকে না পেয়ে আমরা মাইকিং করি। পরে জানতে পারি নাইমের সঙ্গে তাকে দেখা গেছে। তাকে ধরে আনার পর প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করে ভুট্টা খেতে নিয়ে যায়। আমরা ধারণা করছি, তার স্বর্ণের কানের দুল নেওয়ার পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তার সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটেছে কি না, সেটাও সন্দেহ করছি।’

 

নিহত পান্নু মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী। স্ত্রী নার্গিস জানান, আসরের পর স্বামী ফোন করে নাইমের খোঁজ নেন; তিনি বলেন, নাইম বাড়িতে নেই। পরে শোনা যায়, সে পাশের বাড়ির শিশু আতিকাকে নিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর আতিকার পরিবারের লোকজনও একই বিষয়ে জানতে এলে তিনি একই উত্তর দেন।

 

তিনি আরও জানান, স্বামী দুই ছেলেকে ফোন দিলেও কেউ ধরেনি; পরে নাজমুল জানায়, সে বৈশাখীর দাওয়াতে আছে। এর মধ্যে খবর আসে, বড় ছেলের অটোরিকশা আটক করা হয়েছে। স্বামীর সঙ্গে সেখানে গেলে আতিকার বাড়িতে তাদের দুই ছেলে, স্বামী ও দেবরকে বেঁধে মারধর করা হয়। অনেক অনুরোধ করেও থামানো যায়নি; একপর্যায়ে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর আর কিছু দেখেননি।

 

এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার সারওয়ার আলম বলেন, শিশু আতিকা আক্তারসহ গণপিটুনিতে নিহত পান্নু মিয়া ও ফজলুর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নাইম একাই ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার পর শিশুটিকে হত্যা করেছে; ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এ বিষয়ে নিশ্চিত করবে।

 

তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে এবং যার যতটুকু অপরাধ, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুই পরিবারের সদস্য নিহত হওয়ায় উভয়পক্ষ থেকেই মামলা হতে পারে। প্রক্রিয়া চলছে।