যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি বাতিল বা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে লন্ডনের অবস্থানের প্রতি অসন্তোষের জেরে এই মন্তব্য এসেছে বলে দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী রেচেল রিভস মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নীতির তীব্র সমালোচনা করেন।
রেচেল রিভস বলেন, কোনো স্পষ্ট “এক্সিট প্ল্যান” ছাড়া যুদ্ধ শুরু করা একটি বড় ভুল ছিল এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়ছে।
তার মতে, এই সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে।
রেচেল রিভস এটিকে “বেপরোয়া সিদ্ধান্ত” হিসেবে বর্ণনা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রতি হতাশা প্রকাশ করেন।
যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী রেচেল রিভসের এমন মন্তব্যের পর ব্রিটেনের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের হুমকি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের মে মাসে ব্রিটেন প্রথম দেশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছায়।
সম্পর্কের টানাপোড়েনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ইরান ইস্যু। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের পর ব্রিটিশ সরকার সরাসরি সেই যুদ্ধে যুক্ত হয়নি এবং প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বারবার বলেছেন, “এটি আমাদের যুদ্ধ নয়।”
লন্ডন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণ সামরিক সমর্থন দেয়নি।
ব্রিটেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সংসদে স্পষ্টভাবে জানান, যুক্তরাজ্য এই সংঘাতে সরাসরি অংশ নেবে না। তিনি বলেন, “আমরা কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না।”
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বললেও একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।
এই সিদ্ধান্তকে ওয়াশিংটন নেতিবাচকভাবে দেখছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন জানান, যুক্তরাষ্ট্র যখন সমর্থন চেয়েছিল, তখন যুক্তরাজ্য পাশে ছিল না।
এদিকে ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার মরগানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় প্রতিরক্ষা প্রকল্প থেকে সরে আসার দাবি জানান।
তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে পেমব্রোকশায়ারে একটি গভীর মহাকাশ রাডার স্থাপনার কাজ বন্ধ করার আহ্বান জানান। এটি বিশ্বব্যাপী নির্ধারিত তিনটি স্থানের একটি।
লেডি মরগান বলেন, ট্রাম্পের যুক্তরাজ্যের প্রতি শত্রুতামূলক আচরণ এবং ইরানে হামলায় সমর্থন না দেওয়ায় যুক্তরাজ্যকে হুমকি দেওয়ার কারণে এই প্রকল্পে যুক্ত থাকা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের ইরানি সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি খুবই উদ্বেগজনক। এমন অবিশ্বস্ত অংশীদারের সঙ্গে যুক্ত থাকা ঠিক নয়, যিনি বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের হুমকি দিয়েছেন এবং আফগানিস্তানে ব্রিটিশ সেনাদের ভূমিকা নিয়েও অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন।
এসব কারণে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে পরোক্ষ হুমকি দিয়ে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি গত বছর স্যার কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে করা চুক্তিটি পরিবর্তন করতে পারেন, কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেন যথেষ্ট সমর্থন দেয়নি।
ট্রাম্প বলেন,“আমরা তাদের ভালো একটি বাণিজ্য চুক্তি দিয়েছি। যতটা দেওয়ার দরকার ছিল তার চেয়েও ভালো। তবে এটি চাইলে পরিবর্তন করা যেতে পারে।”
স্টারমারের এই অবস্থানকে একদিকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার কারণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প শুধু পররাষ্ট্রনীতিই নয় বরং যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়েও সমালোচনা করেন। তার মতে, ব্রিটেনের অভিবাসন নীতি “অব্যবস্থাপূর্ণ” এবং উত্তর সাগরের তেলগ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত “ভুল পদক্ষেপ”।
ট্রাম্প দাবি করেন, জ্বালানি উৎপাদন কমিয়ে যুক্তরাজ্য নিজের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং এতে জ্বালানির দাম বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন , কঠোর জ্বালানি নীতি এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা দেশকে সংকটে ফেলতে পারে।
যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল ও কিছু রাজনৈতিক নেতা ট্রাম্পের মন্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এটি “শেষ সতর্কবার্তা” হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সরকারপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে “দীর্ঘস্থায়ী ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব” হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই সম্পর্ক কোনো একক রাজনৈতিক ব্যক্তির বক্তব্যে প্রভাবিত হবে না বলেও জানিয়েছে দেশটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রেজারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও একই সঙ্গে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক সমানভাবে বজায় রাখা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় একক বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৪ সালে মোট বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই ছিল দুই দেশের মধ্যে। তবে সাম্প্রতিক চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে ট্রাম্পের হুমকি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।