Image description
টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতি

এক দশকে বাংলাদেশের ডিজিটাল রুপান্তরের ক্ষেত্রে অসাধারন বিপ্লব সাধিত হয়েছে। ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) প্রদানকারী, ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি), ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স), ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের (এমএনও) শক্তিশালী ইকোসিস্টেম দেশের ডাটা কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে দ্রুত উত্থানের ভিত্তি তৈরি করেছে। এই স্তরযুক্ত অবকাঠামো কেবল লাখো মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেটই সুলভ করেনি, বরং উদ্ভাবন, অন্তর্ভুক্তি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ত্বরান্বিত করেছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে কয়েক লাখ মানুষের। কিন্তু মূল্য-সংযোজনহীন মধ্যস্থতকারী নির্মূলের অজুহাত তুলে ২০২৫ সালের টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতিতে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের ধ্বংসের নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশীয় ব্যবসায়ীরা।

পাশাপাশি এর মাধ্যমে দেশের টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতকে তুলে দেয়া হচ্ছে বিদেশী মোবাইল অপারেটরদের হাতে এবং গ্রাহকদের ফেলা হচ্ছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। যেখানে লাইসেন্সিং কাঠামোয় আনা হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। ছেঁটে ফেলা হয়েছে টেলিকম শিল্পের ভ্যালু চেইনে থাকা অনেক দেশি প্রতিষ্ঠানকে। বাড়তি সুবিধা দেয়া হয়েছে বিদেশী অপারেটরদের। যার ফলে একদিকে যেমন ধ্বংস হয়ে যাবে দেশীয় বিনিয়োগকারীরা, অন্যদিকে মুনাফা বেড়ে যাবে বিদেশী কোম্পানিগুলোর। তবে এতে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাবে না কোন সুফল। উল্টো চাকরি হারাবেন হাজারেরও বেশি দক্ষ প্রযুক্তি কর্মী। তারা বলছেন, এ নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় উদ্যোগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। কমে যাবে সরকারের রাজস্ব, আর কমে যাওয়া সরকারের সেই রাজস্ব গিয়ে ঢুকবে মোবাইল ফোন অপারেটরদের পকেটে। এছাড়া কর্মসংস্থানও হারাবে বিপুল সংখ্যক দক্ষ কর্মী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের টেলিকম সেক্টর একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৫ সালের টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত, অবকাঠামো আধুনিকীকরণ এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি গভীর করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই রুপান্তরকরণকে সতর্কতার সাথে ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে। তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ সংস্কারে তাড়াহুড়ো করবেন না। সময় নিয়ে শুনুন, পরিমার্জন করুন এবং স্থানীয় কোম্পানি, শ্রমিক ও ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করুন।

টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ লাগবে। এটার উপর জোর দেওয়া যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু টেলিযোগাযোগ খাতের সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ইস্যু জড়িত, তাই এই খাতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ থাকা উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজন ছিল নীতিমালায় দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া।
বাংলাদেশে টেলিকম খাতের আধুনিকীকরণ এবং টেলিকম অবকাঠামো লাইসেন্স প্রবর্তনের ফলে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০০৭ সালে মাত্র দশমিক ৪ মিলিয়ন থেকে বেড়ে বর্তমানে ১৩৪ মিলিয়নে পৌঁছেছে। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার ২০০৮ সালে মাত্র ১০ জিবিপিএস থেকে ২০২৫-এ প্রায় ৭ হাজার ৬০০ জিবিপিএসে উন্নীত হয়েছে। এছাড়াও, মোবাইল ব্রডব্যান্ড সংযোগের মূল প্রসার শুরু হয় ২০১৫ সাল থেকে মূলত এনটিটিএন অপারেটরদের সারাদেশে ফাইবার নেটওয়ার্কের কল্যাণে, যা ২০১২ সালের মাত্র ৮ হাজার ১০০ কিলোমিটার থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার কিলোমিটারে। এই বিশাল বিস্তৃত নেটওয়ার্কের ফলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত আইএসপি’র সংখ্যা ২০০ থেকে বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৯০০ হয়েছে, লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে একটি নতুন শিল্প খাত গড়ে উঠেছে এবং বাংলাদেশের উপজেলা ইউনিয়ন পর্যন্ত ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে। প্রতিযোগিতার এই মডেলের কারণে ইন্টারনেটের দাম এতটাই কমেছে যে মাসিক মাত্র ৪০০ টাকায় আনলিমিটেড ইন্টারনেট পাওয়া যাচ্ছে যা আগে একচেটিয়া মোবাইল কোম্পানির আধিপত্যের কারণে অসম্ভব ছিল। এই বিপ্লবের সুফল সরকার এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা-বিটিআরসিও পেয়েছে। বিটিআরসির বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায় তাদের রেভিনিউ শেয়ারিং থেকে আয় ২০০৭ সালে মাত্র ৫৬৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি অর্থাৎ প্রায় ৯ গুণ হয়েছে।

অথচ বর্তমানে ২০২৫ সালের টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতিকে “মূল্য-সংযোজনহীন মধ্যস্থতাকারীদের” নির্মূলের উপায় হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান লাইসেন্স-স্তর ব্যবস্থা সরকারকে উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দিয়েছে, যা দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে, গুণগত মান প্রয়োগ করতে এবং সেবা শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। সময়ের সাথে এই স্তরগুলো কেবল আমলাতান্ত্রিক বোঝা হয়ে থাকেনি; বরং তা তদারকির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। অতীতেও যখন বিদেশী মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল তখন তারা ভয়েস কল ও মোবাইল ডেটার জন্য গ্রাহকদের ওপর অত্যধিক উচ্চমূল্য চাপিয়ে দিত, একইসাথে টাওয়ার ও ফাইবার অবকাঠামোর মালিকানা ধরে রেখে সম্পূর্ণ নিজস্ব বিবেচনায় সেখানে বিনিয়োগ করত। ২০০৯ সালের আগে বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটররাই দেশের অধিকাংশ ফাইবার অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করত এবং তারা আইএসপিগুলোর জন্য মূল্য নির্ধারণ ও নেটওয়ার্ক বিস্তার নিজেদের সুবিধা মতো করে পরিচালনা করত, এর ফলে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণের অগ্রগতি সরাসরি বাধাগ্রস্ত হতো। এনটিটিএন মডেল চালুর আগে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে প্রতি এমবিপিএস ট্রান্সমিশন খরচ প্রায় ১৫ হাজার টাকা ছিল। এখন এনটিটিএনের টেলকো-গ্রেড অবকাঠামোর কল্যাণে তা নেমে এসেছে মাত্র ২০ টাকা/এমবিপিএসে, প্রায় ৯৯ দশমিক ৯% হ্রাস। ফলশ্রুতিতে ভোক্তাদের ইন্টারনেটের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রকাশিত টেলিকম নীতি অনুযায়ী, প্রান্তিক গ্রাহক পর্যায়ে সেবা প্রদানকারী ও টেলিকম অবকাঠামো প্রদানকারীদের মধ্যে বিদ্যমান স্পষ্ট বিভাজন সরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের আধিপত্যের সুযোগ তৈরি করে দেয়া। পলিসির ৭.৭.১১ নং ধারায় বলা হয়েছে,- মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোকে লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটির জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে (সেলুলার মোবাইল অপারেটরস সেল বি অ্যালাউড টু কানেক্ট দেয়ার লাস্ট-মাইল ট্যুওয়ার্ডস থ্রো সেল্ফ-ডেপ্লয়েড ফাইবার ইনফ্রাস্ট্রাকচার)। এই নীতি অনুযায়ী, মোবাইল ফোন অপারেটার, যারা মূলত প্রান্তিক গ্রাহক পর্যায়ে সেবা প্রদানকারী, তাদেরকে তাদের ব্যবসার পাশাপাশি টেলিকম অবকাঠামোতে বিনিয়োগ এবং তৈরি করার সুযোগও রাখা হয়েছে। এতে মোবাইল অপারেটরদের সাথে নির্ধারিত টেলিকম অবকাঠামোগত সেবা প্রদানকারীদের (এনটিটিএন এবং টাওয়ার কোম্পানি) সাথে ব্যবসায়িক সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাবে। এছাড়া এনআইসিএসপি (বর্তমানে এনটিটিএন এবং টাওয়ার কোম্পানি) লাইসেন্স গাইডলাইনের ৭.২.১ এবং ৭.২.২ নং ধারায় বলা হয়েছে- কোনো একক আইনি সত্তা এবং তার শেয়ারহোল্ডাররা একই সময়ে কেবলমাত্র একটি এনআইসিএসপি লাইসেন্স ধারণ করতে পারবে এবং অন্য কোন লেয়ারে ক্রস-ওনারশিপ নিতে পারবে না, অথচ ৭.২.৩ নং পারায় বিদেশি মালিকানাসম্পন্ন নতুন লাইসেন্সি বা আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ৭.২.১ এবং ৭.২.২ নং ধারা প্রযোজ্য না হওয়ার কথা বলা হয়েছে যেটা সম্পূর্ণভাবে দেশীয় কোম্পানিদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ। এর ফলে বাস্তবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান মোবাইল অপারেটর লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও তার শেয়ারহোল্ডাররা নতুন এনআইসিসএসপি লাইসেন্স নিতে পারবে- যে সুবিধা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিদেশি মোবাইল অপারেটরদের অবকাঠামোর মালিকানা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে দেশীয় অবকাঠামো কোম্পানি; এনটিটিএন, টাওয়ার কোম্পানির সাথে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হবে এবং আক্ষরিক অর্থে এনটিটিএন এবং টাওয়ার কোম্পানিদের গ্রাহকরাই তাদের প্রতিযোগী হবে।

তাছাড়া বহু প্রতীক্ষিত এক্সেস ট্রান্সমিশন সেপারেশনের সময়সীমা নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী ২০২৭ সাল নির্ধারিত করা হয়েছে। এই সময়সীমায় মোবাইল ওপারেটর তাদের মালিকানাধীন টাওয়ার ও ফাইবার এনআইসিএসপি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে হস্তান্তর করবে। কিন্তু, এদিকে মোবাইল অপারেটরগুলো যদি এরই মধ্যে নতুন এনআইসিএসপি লাইসেন্স নিয়ে তাদেরই সহযোগি কোম্পানিকে টাওয়ার ও ফাইবার হস্তান্তর করে, তাহলে এটা একটা সুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই হবে না। এর ফলে দেশিয় প্রতিষ্ঠান-গুলো তাদের ব্যবসা হারাবে এবং বিশেষ করে এনটিটিএনের শেয়ারড ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে স্থানীয় হাজারো আইএসপি যারা সহজে ও কমদামে সম্প্রসারণ করার সুবিধা পেয়ে আসছে সেটা মূলত বন্ধ হয়ে যাবে এবং তারা বিদেশি মোবাইল অপারেটরদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে প্রান্তিক হয়ে পড়বে, যারা এত বছর ধরে টেলিকম খাতে সংঘবদ্ধভাবে বিপুল বিনিয়োগ করে এসেছে।

নীতিমালায় মোবাইল অপারেটর লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বিদেশি শেয়ারহোল্ডিং সর্বোচ্চ ৮৫% পর্যন্ত অনুমোদিত (টেলিকম পলিসি ২০২৫ ধারা ৭.২.১১.১) এবং উপরে উল্লেখিত আলোচনা থেকে বুঝা যায় একই শেয়ারহোল্ডাররা অবকাঠামো লাইসেন্সের (ক্রস-ওনারশিপ) মালিক হতে পারবে। অর্থাৎ মাত্র ১৫% স্থানীয় বিনিয়োগ থাকলেও এই কোম্পানিগুলো টেলিকম অবকাঠামোর ওপর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা পাচ্ছে এবং একাধিক স্তরে ব্যবসা করার পূর্ণ স্বাধীনতা পাচ্ছে। অন্যদিকে এনআইসিএসপির ক্ষেত্রে বিদেশি মালিকানা সর্বোচ্চ ৬৫% পর্যন্ত (টেলিকম পলিসি ২০২৫ ধারা ৭.৭.১২.২ ) অনুমোদিত। অর্থাৎ যেসব কোম্পানির মধ্যে স্থানীয় বিনিয়োগ ৩৫% বা তার বেশি- অর্থাৎ জাতীয় মূলধনের অংশগ্রহণ অনেক বেশি- তাদেরকেই ক্রস-ওনারশিপ বা একাধিক লাইসেন্স থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই বৈষম্যমূলক কাঠামোর ফলে একটি স্পষ্ট বার্তা যাচ্ছে: যত কম স্থানীয় বিনিয়োগ, তত বেশি ক্ষমতা ও সুবিধা; আর যত বেশি স্থানীয় বিনিয়োগ, তত বেশি নিষেধাজ্ঞা ও বাধা। ফলশ্রুতিতে পুরো টেলিকম অবকাঠামো খাতটি বিদেশি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার কোনো কার্যকর প্রতিবন্ধকতা রাখা হয়নি।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেলিকমের মতো কৌশলগত ও সংবেদনশীল খাতে বিশ্বের প্রায় সব দেশই প্রথমে নিজেদের নাগরিক ও জাতীয় মূলধনের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। আমাদের এই নীতি কিন্তু ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে বাজারের দরজা প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। সমন্বিত মোবাইল অপারেটররা নিজেদের সেবাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, অন্য অপারেটরদের কাছ থেকে অতিরিক্ত হোলসেল মূল্য আদায় করতে পারে এবং প্রয়োজনে সংযোগ প্রদানে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করতে পারে। ফলে যারা আলাদা আলাদা স্তরে কাজ করে বিশেষ করে এনটিটিএন, টাওয়ার কোম্পানি স্থানীয় আইএসপিরা, তারা খরচ ও স্কেলে টিকে থাকতে পারে না এবং ধীরে ধীরে বাজার থেকে ছিটকে পড়বে। তখন বাকি কয়েকটি বড় খেলোয়াড় দাম নিয়ন্ত্রণে একচেটিয়া ক্ষমতা পেয়ে যাবে।

সামিট কমিউনিকেশন্স এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফ আল ইসলাম বলেন, নীতিমালায় বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একাধিক লাইসেন্সের সুযোগ রাখা হয়েছে কিন্তু দেশীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি নেই। যা স্পষ্টতই বৈষম্য। আবার বলা হয়েছে, মোবাইল অপারেটররা লাস্ট মাইলে ফাইবার স্থাপন করতে পারবে। তাহলে এনটিটিএন’রা কি করবে? কারণ বিগত ১০-১৫ বছরে লাইসেন্সের নীতিমালা লঙ্ঘন করে এমনিতেই মোবাইল অপারেটররা বিপুল পরিমাণ ফাইবার স্থাপন করেছে। নতুন করে আবার সেটি করলে এনটিটিএন’র ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। আর আইসিএক্স, আইআইজি ও আইজিডব্লিউ’র মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তুলে দেওয়ার যে ধারা যুক্ত করা হয়েছে এতে দেশিয় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্থ হবে এবং বিপুল পরিমাণ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে।

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি এম এ হাকিম বলেন, ২০২৫’র নীতিতে বহুজাতিক যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, বিশেষ করে টেলিকম অপারেটররা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করবে। তিনি বলেন, ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক কিংবা দেশীয় নেটওয়ার্ক কোনও সময় বৈদেশিক কিংবা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত না। কারণ, পরবর্তী যুদ্ধ হবে তথ্যপ্রযুক্তির, ডেটার। সেক্ষেত্রে স্থানীয় নেটওয়ার্ক, ডোমেস্টিক নেটওয়ার্ক, ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক উদ্যোক্তাদের হাতেই থাকা দরকার।
এনটিটিএন প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোমের চেয়ারম্যান মইনুল হক সিদ্দিকী বলেন, নীতিমালায় অনেক ছোট টেলিকম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে। অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়বে।