দেশের জ্বালানি চাহিদা অব্যাহত রাখতে ডিজেলে সালফারের মানের সঙ্গে আপোষ করলো জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। সাধারণত ০.০০৫ শতাংশ সালফারযুক্ত ডিজেল আমদানি করে থাকে সরকার।
জানা গেছে, মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে জুম অ্যাপে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এ ধরনের একটি প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হয়েছে বাংলানিউজ।
উল্লেখ্য, ০.০০৫ শতাংশ 'এস' অর্থ সালফারের মাত্রা ৫০ পিপিএম এবং ০.০৫ শতাংশ 'এস' অর্থ সালফারের মাত্রা ৫০০ পিপিএম।
জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের গ্রীষ্মকালীন সভা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সভায় যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য জি-টু-জি ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পূর্বনির্ধারিত সালফারের মাত্রা ০.০০৫ শতাংশের পরিবর্তে ০.০৫ শতাংশে শিথিল করে ১ লাখ ২০ হাজার টন গ্যাস অয়েল (ডিজেল) কেনার একটি প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের আমদানি, রপ্তানি, মজুদ, প্রক্রিয়াকরণ, বিপণন ও বিতরণ কার্যক্রম বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) উপর ন্যস্ত। ২০১৬ সাল থেকে বিপিসি জ্বালানি তেল আমদানির ৫০ শতাংশ জি-টু-জি পদ্ধতিতে এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির মাধ্যমে কিনে থাকে। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভিন্ন গ্রেডের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। পাশাপাশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে (ইআর পিএলসি) পরিশোধন করা হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার প্রেক্ষিতে ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রনালীতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এতে আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য, প্রিমিয়াম ও ফ্রেইট খরচে অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ তাদের রপ্তানি সীমিত করে আনে এবং দেশীয় সরবরাহ প্রাপ্তি বিঘ্নিত হয়।
কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় বাজারে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিকল্প হিসেবে তরল জ্বালানি তেলের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ও মূল্যচাপ বাড়াচ্ছে।
এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস উৎপাদন ইউনিটগুলো ক্রমাগত আক্রমনের শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফলে জ্বালানি তেল বিশেষত ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল আমদানির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
এ সংকট উত্তরণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কৃচ্ছসাধন, ভর্তুকি প্রদান, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, মজুদ ও সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশও জ্বালানি রেশনিং, সরবরাহে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদারসহ বিভিন্ন ধরণের জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে।
এদিকে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপিসির জানুয়ারি-জুন ২০২৬ প্রান্তিকে জি-টু-জি চুক্তিতে গ্যাস অয়েল ০.০০৫ শতাংশ 'এস' (ডিজেল), জেট ফুয়েল, গ্যাসোলিন ৯৫ আনলেডেড (অকটেন), ফার্নেস অয়েল, মেরিন ফুয়েল আমদানির বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে।
ওই চুক্তির অধীনে প্রতিবছর 'সেলস কনফার্মেশন' স্বাক্ষর করে চুক্তি নবায়ন ও জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়ে থাকে। সেলস কনফার্মেশন স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সংযোজন বা বিয়োজন করা হয়ে থাকে।
বিপিসির সঙ্গে BSP Zapin-এর জি-টু-জি চুক্তির আওতায় জানুয়ারি-জুন ২০২৬ সময়ে অন্যান্য জ্বালানি তেলের পাশাপাশি ২ লাখ ৮০ হাজার টন গ্যাস অয়েল ০.০০৫ শতাংশ 'এস' (ডিজেল) আমদানির জন্য আলোচনা হয়। সে প্রেক্ষিতে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে ডিজেল আমদানির জন্য সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন গ্রহণ করা হয়েছে ।
এই প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদিত ও চুক্তিবদ্ধ পরিমাণ থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত প্রায় ২৭ হাজার টন ৫০ পিপিএম সালফার মানমাত্রার ডিজেল সরবরাহ করেছে। মার্চ মাসে ৪টি পার্সেলে ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের সম্মতি ও চূড়ান্ত সূচি থাকলেও তা সরবরাহ করতে পারেনি।
বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান BSP Zapin ০.০০৫ শতাংশ 'এস' মানমাত্রা বজায় রেখে সরবরাহে অপারগতা প্রকাশ করেছে।
উল্লেখ্য, গত ২০ মার্চ প্রতিষ্ঠানটি ৫০০০ পিপিএম বা ০.০৫ সালফার যুক্ত ৪টি ডিজেল পার্সেল প্রস্তাব করে যার মধ্যে ২টি পার্সেল গ্রহনের জন্য সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়।
পরবর্তীতে গত ৭ এপ্রিল BSP Zapin ১ লাখ ২০ হাজার টন ৫০০ পিপিএম সালফারযুক্ত ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। এক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় ১ লাখ ২০ হাজার টন গ্যাস অয়েল ০.০৫ শতাংশ 'এস' (ডিজেল) আমদানি করা যেতে পারে এবং অবশিষ্ট পরিমাণ ডিজেল প্রাথমিক চুক্তির শর্তানুযায়ী ০.০০৫ শতাংশ 'এস' মানমাত্রায় গ্রহণ করা হবে বলে বিপিসি প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
চলমান পরিস্থিতিতে বিপিসি'র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান Unipec Singapore Pte. Ltd. এবং PETCO Trading Labuan Company Ltd (PTLCL) এপ্রিল মাসের নির্ধারিত কিছু পার্সেল দিতে পারবে না বলে ঘোষণা করেছে এবং অন্যান্য সরবরাহকারীরাও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না।
উল্লেখ্য, সোমবার (১৩ এপ্রিল) পর্যন্ত ডিজেলের প্রারম্ভিক মজুদ ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ২২৩ টন। যা দিয়ে প্রায় ১০ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
জানা গেছে, BSP Zapin-এর প্রস্তাব মূল্যায়নের লক্ষ্যে বিপিসি কর্তৃক মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। মূল্যায়ন কমিটি ওই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রস্তাবিত ০.০৫ শতাংশ 'এস' ডিজেলের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে।
উল্লেখ্য, পরিবেশ, মানব স্বাস্থ্য ও যানবাহনের জীবনকালের (লাইফ টাইম) ওপরে সালফারযুক্ত ডিজেলের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশে উন্নত বিশ্বের মতো অধিক হারে শিল্পায়ন না হওয়ায় সালফারজনিত দূষণের প্রভাব সীমিত।
ইস্টার্ণ রিফাইনারি থেকে উৎপাদিত ডিজেলে সালফারের মাত্রা কাঙ্ক্ষিত মানের চেয়ে বেশি হলে আমদানিকৃত ৫০ পিপিএম সালফারযুক্ত ডিজেলের সঙ্গে মিশ্রণ করে তা বাংলাদেশ স্ট্যার্ন্ডাড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) অনুমোদিত সীমার (৩৫০ পিপিএম) মধ্যে এনে কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত করা হয়।
প্রসঙ্গত; বাংলাদেশে জ্বালানি তেল মূলত আমদানিনির্ভর। এ কারণে বৈদেশিক সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। দেশের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি পণ্যের প্রায় ৬৩.৬৪ শতাংশ ডিজেল।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪.৩৫ মিলিয়ন টন, যার ৭৯.৫০ শতাংশ আমদানির (জি-টু-জি ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায়) মাধ্যমে পূরণ হয়েছে। বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় সরবরাহ নিশ্চিতকরণকে অগ্রাধিকার প্রদান এবং সীমিত সময়ের জন্য জ্বালানির গুণগত মানের শর্ত শিথিল করার প্রস্তাব বিবেচনা করা যৌক্তিক হবে বলে কমিটি সুপারিশ করেছে।
অন্যদিকে এই মাত্রার ডিজেল আমদানিতে কিছুটা আর্থিক সাশ্রয় হবে এবং একইসঙ্গে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দেশের বিদ্যমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হতে নিশ্চিতভাবে জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই বিবেচনায় ৫০০ পিপিএম সালফারযুক্ত ডিজেল কেনার প্রস্তাব গ্রহণ করা সমীচীন হবে বলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ মনে করে।
প্রস্তাবটি অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে প্রথমে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে তোলা হবে। সেখানে অনুমোদিত হলে সরকারি ক্রয় কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।