উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানে ধীরগতি, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় অস্থির অর্থনীতি। এই সংকটের মুহূর্তেও সরকারের তহবিলে যখন ভাটার টান, তখনই ইতিহাসের রেকর্ড প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বড় উন্নয়ন বাজেট বা এডিপি দিতে যাচ্ছে সরকার। যাকে উচ্চাভিলাষীই বলছেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মূল বাজেটের আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাজেটকে অবশ্যই সংযত, বাস্তবসম্মত এবং কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করতে হবে। অন্যথায় অতিরঞ্জিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে তা বাস্তবে অর্জন করা সম্ভব হবে না, ফলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আস্থা কমবে, নীতিনির্ধারণে বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে পড়বে এবং বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এডিপি পর্যালোচনার জন্য টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এডিপির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে মধ্যমেয়াদি সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্প গ্রহণ, বৃহৎ প্রকল্পের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকল্প বাস্তবায়ন মনিটরিং জোরদার এবং প্রকল্প ঋণের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালকদের দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং বাজেট বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, যেখানে প্রস্তাবিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার ৬২০ কোটি টাকা।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পেয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ প্রায় ১১ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় পেয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। আর কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় সাত হাজার ৮৪১ কোটি টাকা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে সরকার দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দিয়েছিল। তবে পরে তা সংশোধন করে দুই লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এর মধ্যে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা ছিল অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ৭২ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক সহায়তা থেকে। নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এডিপিতে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নে প্রায় ৪৮.৪৪ শতাংশ এবং বৈদেশিক অর্থায়নে প্রায় ৫২.৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি ধরা হয়েছে, যা উন্নয়ন ব্যয় বড় ধরনের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে বাস্তবায়নের দিক থেকে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির বিপরীতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলে মাত্র ৫৯ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা ব্যয় করতে পেরেছে, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৩০ শতাংশ। এতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এডিপি বাস্তবায়নের হার কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বাস্তবায়ন হার কমে ৬৭ শতাংশে নেমে এসেছে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ২৯.৬ শতাংশ ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি কালের কণ্ঠকে বলেন, বাজেটের আকার নয়, গুণগত মানই মূল বিষয়। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে বাস্তবতা, প্রয়োজনীয়তা ও সক্ষমতার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি। প্রবৃদ্ধির জন্য অবকাঠামো ও সেবা খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। অপচয় ও দুর্নীতি রোধ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। রাজস্ব ঘাটতি বাড়লে ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি পায়, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমিয়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যাহত করে। তাই স্বচ্ছতা, দক্ষ ব্যয় ও টেকসই অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এখন প্রধান অগ্রাধিকার। এ জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প তদারকি ও জবাবদিহি জোরদার করা জরুরি। এতে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ফলাফল নিশ্চিত হবে।