সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মাসদার হোসেন। বিচার বিভাগ পৃথককরণ মামলার বাদী হিসেবে সমাজে সুপরিচিত। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ সংগ্রামকারী সাবেক এই বিচারক এখন আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করেন উচ্চ আদালতে। সেই সুবাদে এক মক্কেলের কাছ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বিনিময়ে তিনি তার মক্কেলের কোনো কাজ করেননি। ফলে ভুক্তভোগী ওই বিচারপ্রার্থীকে আরও ৪২ লাখ টাকার বেশি খেসারত গুনতে হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ওই ভুক্তভোগীর পক্ষে এসব অভিযোগ লিখিতভাবে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলমান। অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন সাবেক এই বিচারক। আর ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণসহ তাদের টাকা ফেরত চেয়েছেন।
মাসদার হোসেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন। ১৯৯৪ সালে জুডিসিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব থাকাকালে মাসদার হোসেন দেশের বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার জন্য মামলা করেন। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথককরণের ওই রিট মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয় ১৯৯৯ সালে। ওই রায়ের পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ঘোষণা করা হয়। বিচার বিভাগ পৃথককরণের ঐতিহাসিক এই মামলাটি ‘মাসদার হোসেন মামলা’ নামেই পরিচিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাসদার হোসেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চাইলেও বিচারপ্রার্থীদের স্বাধীনতার কথা তিনি বেমালুম ভুলে গেছেন। তার মতো মানুষের বিরুদ্ধে বিচারপ্রার্থী হয়রানির এমন অভিযোগ প্রত্যাশা করা যায় না। তিনি যদি বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে এমন প্রতারণার আশ্রয় নেন, তাহলে অন্যদের কাছ থেকে আর ভালো কিছু প্রত্যাশা করাটাই দুরূহ। বিচার বিভাগের স্বধীনতা বিচার প্রার্থীরা ভোগ করতে না পারলে সেই স্বাধীনতায় কোনো দাম নেই। সেজন্য আগে বিচার সংশ্লিষ্টদের মানসিক ও নৈতিক দিকের পরিবর্তন আনতে হবে। অন্যথায় বিচার প্রার্থীরা কোনো সুফল ভোগ করতে পারবেন না।
জানা গেছে, গত বছরের ১ ডিসেম্বর নূর প্লাস্টিকের লিগ্যাল অ্যান্ড অ্যাডমিন অফিসার জামাল হোসাইন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বরাবর একটি অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, নূর প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে কর হিসাবের অসামঞ্জস্য হওয়ায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ১৭ মে যশোর কাস্টমস কমিশনারের কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের হয়। এই মামলায় আপিল করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের চেম্বারে আইনজীবী মো. মাসদার হোসেনের কাছে যান কোম্পানির চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বেপারী।
আইনজীবী মাসদার হোসেন কোম্পানির চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগে উল্লিখিত করের টাকা শূন্য করে মামলা নিষ্পত্তির জন্য মোট ১ কোটি ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। মৌখিক চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানির চেয়ারম্যান আইনজীবী মাসদার হোসেনকে ২০২২ সালের ২১ নভেম্বর ৫০ লাখ টাকা; একই বছরের ২৪ নভেম্বর ৩ লাখ টাকা; ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর ৩৭ লাখ এবং একই বছরের ৭ জুন ১০ লাখ টাকাসহ মোট ১ কোটি টাকা চেকের মাধ্যমে প্রদান করেন। ওই টাকা আইনজীবী মাসদার হোসেন নিজ হাতে রিসিটের মাধ্যমে বুঝে নেন। এরপর আইনজীবী মামলা পরিচালনা শুরু করে কোম্পানির সঙ্গে মৌখিক চুক্তির বাইরে ভ্যাট আপিল বাবদ ২০ শতাংশ টাকা অর্থাৎ ২০ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ান। পরবর্তী সময়ে আইনজীবী মাসদার হোসেন ওই মামলার কোনো তদারকি না করে কোম্পানিকে মামলা সম্পর্কে হালনাগাদ কোনো তথ্য না দিয়ে ঘোরাতে থাকেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কোম্পানির চেয়ারম্যান অন্য এক আইনজীবীর মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর ৪২ লাখ ৯ হাজার ২৭৩ টাকা জরিমানাসহ মামলাটিতে রায় হয়েছে। আইনজীবী মাসদার হোসেন কোম্পানির কাছ থেকে মামলার করের হিসাবের অসামঞ্জস্যের সম্পূর্ণ টাকা মওকুফ করে দেবেন বলে কোম্পানির কাছ থেকে মোট ১ কোটি ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন। তবে চুক্তি অনুযায়ী মামলার কোনো কাজ না করে কোম্পানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। এ অবস্থায় আইনজীবী মাসদার হোসেনকে মামলা বাবদ দেওয়া তার সম্পূর্ণ টাকা ক্ষতিপূরণসহ ফেরত চেয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে আবেদন জানানো হয়।
টাকা নেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করে মাসদার হোসেন বলেছেন, ‘মামলাটি এনেছিল আমার জুনিয়র আইনজীবী ফাতুহুল বারি। আমি ছিলাম মামলার ফাইলিং লইয়ার। সে কারণে চেকগুলো আমার নামে দিয়েছিল। তবে ফাতুহুল বারির পরিচিত দেলোয়ার টাকাগুলো নিয়ে যায়। আমার রুমে বসে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে কোম্পানির তখনকার ম্যানেজার আশরাফুলসহ সবাই মিলে টাকাগুলো দেলোয়ারকে দিয়ে দিল। তারা সবাই প্যাক্ট (একসঙ্গে সম্পৃক্ত) ছিল। দেলোয়ারের কাছে টাকা দেওয়াটাই আমার ভুল ছিল।’
মাসদার হোসেন আরও বলেন, ‘বিচার বিভাগে দীর্ঘদিন চাকরি করেছি। আমি অবসরের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়ে ঢুকলাম। ওখানে চার বছর কাজ করার পর তখন কয়েকজন আমার জুনিয়র বললেন, হাইকোর্টে আসেন। আমাদের ড্রাফটগুলো ঠিক করে দেন। তখন আস্তে আস্তে যাওয়া শুরু হলো। সেই ২৩ সালের দিকে যখন নতুন হাইকোর্টে যাওয়া শুরু করেছি, তখন কয়েকজন নবীন আইনজীবী আমার রাজশাহী এলাকার, তারা নূর প্লাস্টিকের একটি মামলা নিয়ে এলেন। তখন ওকালতনামায় স্বাক্ষর করলাম। ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা দেবে। ওরা চেক দিল। আমি টাকা স্পর্শও করিনি। ওই টাকাগুলো তারা জমা দেয়নি যথাযথভাবে। তারপরও মামলার অর্ধেক রায় আমাদের পক্ষে এলো এবং রিমান্ডে পাঠাল। রিমান্ডে যাওয়ার পর ওখানে নতুন করে আরেকটি অর্ডার হলো। সেই অর্ডারটা অবৈধ ছিল। সেটার বিরুদ্ধে আমি নিজে সাড়ে ৪ লাখ টাকা কোর্ট ফি দিয়ে হাইকোর্টে আপিল করি। আর নুরুল ইসলামকে বলেছিলাম এ মামলা নিয়ে টেনশন কইরেন না, এ মামলার পুরো দায়িত্ব আমার।’
‘দেলোয়ার টাকাটা নিয়েছে’, সেই দেলোয়ার কে জানতে চাইলে মাসদার হোসেন বলেন, ‘একজন নামমাত্র অ্যাডভোকেট। তার বিরুদ্ধে অনেক ফৌজদারি অপরাধ রয়েছে। সে অনেক লোককে এভাবে প্রতারণা করেছে।’ দেলোয়ারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলো কীভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেলোয়ারের বন্ধু ছিল আমার জুনিয়র আইনজীবী ফাতুহুল। সে এখনো আমার সঙ্গে কাজ করে। ঢাকা কোর্টের কাজগুলো সে দেখে। হাইকোর্টেরও সে এনরোলড। তার ক্লোজ ফ্রেন্ড দেলোয়ার। দেলোয়ারকে আমি আগে থেকেই চিনি। কিন্তু সে যে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করে, সেটা জানতাম না। পরে জানলাম। আমার চেম্বার থেকে আমার উপস্থিতিতে তারা আমার নামে চেক দিল। টাকা উঠিয়ে কালো একটা ব্যাগে করে তারা টাকা নিয়ে গেল। নূর প্লাস্টিক কোম্পানির ম্যানেজার আশরাফুল ইসলাম মিলে টাকাগুলো দিলেন দেলোয়ারের কাছে। তার মাধ্যমেই রাজস্ব সংক্রান্ত মামলাগুলো ফাইল করা হয়েছিল। তিনিই মামলাগুলো ডিল করেন। এর সাক্ষী হচ্ছেন অ্যাডভোকেট ফাতুহুল বারী।’
অভিযোগে দেলোয়ারের নাম উল্লেখ করেনি; আপনার নাম উল্লেখ আছে—এমন প্রশ্নে মাসদার হোসেন বলেন, ‘আমি তো ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেছি। আমার নামই তো উল্লেখ করবে। সে (দেলোয়ার) তো করেনি। নূর প্লাস্টিকের ওরা সবই জানে। কিন্তু নুরুল ইসলামের সঙ্গে একজন অ্যাডভোকেট আছেন, তিনি ক্ষুব্ধ। তিনিই এটা করিয়েছেন। নুরুল ইসলাম স্বেচ্ছায় এটা করেননি।’
এক প্রশ্নের জবাবে মাসদার হোসেন বলেন, ‘টাকা তুলে দেলোয়ারকে দিয়ে দেওয়াটা ছিল আমার বড় ভুল। এই টাকা দেওয়াটা ঠিক হয়নি। সে (দেলোয়ার) যে টাকা নিয়েছে, পরের দিনই তার অ্যাকাউন্টে জমা করেছে; সেসব তথ্যপ্রমাণ আমার কাছে আছে। এসব তথ্য দিয়ে নূর প্লাস্টিকের তখনকার ম্যানেজার আশরাফুল ইসলাম দুদকে আবেদন করেন। কিন্তু পটপরিবর্তনের (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) পর ওটার তেমন কিছু হয়নি। এটা এসবিতেও গেছে। পরে কী হয়েছে, তার আপডেট আমি আর জানি না।’
এ অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট হুমায়ূন মঞ্জু কালবেলাকে বলেন, ‘আইনজীবী মাসদার হোসেনের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে।’
নূর প্লাস্টিকের লিগ্যাল অ্যান্ড অ্যাডমিন অফিসার জামাল হোসাইন বলেন, ‘টাকা নিয়ে দুই পয়সারও কাজ করেনি। লিগ্যাল অফিসার হিসেবে বাদী হয়ে অভিযোগ দিয়েছি।’