খাদ্য অধিদপ্তরের কর্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। নিয়মিত মহাপরিচালক (ডিজি) না থাকা এবং তিন মাস ধরে একজন পরিচালক যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির শীর্ষ পদে পূর্ণ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা না থাকায় দাপ্তরিক সিস্টেম ভেঙে পড়েছে। অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের মতো আসা-যাওয়া করেন। যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক পরিচালক (প্রশাসন) মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি লঙ্ঘন, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ নিয়ে চলছে তোলপাড়।
খাদ্যসচিব মো. ফিরোজ সরকার যুগান্তরকে বলেন, ডিজি পোস্টিং দেওয়ার দায়িত্ব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। পরিচালক প্রশাসন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এবং ফুড ক্যাডারের কর্মকর্তা। পরিচালক প্রশাসন মাহবুবুর রহমান অসুস্থ মর্মে আবেদন করেছেন। আমরা তার ছুটি বাড়িয়ে দিয়েছি। তবে তিনি পালিয়ে গেছেন-এমনটা শোনা যায়নি। আমরা মনে করি, একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত সফরে রাষ্ট্রের বাইরে যেতেই পারেন। দেশে ফিরবেন কি না, তা তিনিই ভালো জানেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন খাদ্য অধিদপ্তরে নিয়মিত কোনো ডিজি নেই। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। খাদ্য অধিদপ্তরের মাঠ প্রশাসন সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা না থাকায় অন্য কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল হতে হয় তাকে। অনেক ক্ষেত্রে তাকেও অন্ধকারে থাকতে হয়। ২০ জানুয়ারি ২০ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে পরিচালক প্রশাসন মাহবুবুর রহমান যুক্তরাষ্ট্র যান। বর্তমানে সেখানে তিনি অবস্থান করছেন। পরিবার নিয়ে বিভিন্ন রাজ্য ভ্রমণ করতে দেখা যাচ্ছে ফেসবুকে। ২০ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে তিনি কীভাবে ৩ মাস অবস্থান করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক একজন এপিডি বলেন, বিএসআর-এর বিধানমতে, বহিঃবাংলাদেশ ছুটির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফিরে এসে কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এতে সর্বোচ্চ শাস্তি চাকরিচ্যুত হতে পারে।
বহিঃবাংলাদেশ ছুটি বাড়ানোর কোনো সুযোগ আছে কি না-এমন প্রশ্নে এক কর্মকর্তা বলেন, সেটা নির্ভর করে বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর। যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না কিংবা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন ছুটির মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে, তবে সেটা ভিন্নকথা। অন্যথায় এটি শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধ হিসাবে পরিগণিত হবে। একজন সরকারি কর্মকর্তার পুরো পরিবার বিদেশে থাকা বিধিসিদ্ধ কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি কোনো কর্মকর্তার পুরো পরিবার বিদেশে রাখতে চাইলে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে সরকারের অনুমোদন নিতে হয়। তারা নিয়েছেন কি না, তা জানা যায়নি।
অভিযোগ উঠেছে, পরিচালক প্রশাসন মাহবুবুর রহমান গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল অর্থ নিয়ে গেছেন। খাদ্য অধিদপ্তরে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
খাদ্য অধিদপ্তরের বিভন্ন বিভাগীয় ফুড কন্ট্রোলার অফিসে একটি সিন্ডিকেট গড়েন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এদের কাজে লাগিয়ে বদলি, পদায়ন, নিয়োগ, বিভগীয় মামলা, শৃঙ্খলার মামলায় বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়েছেন। এ কাজে তিনি কখনো উপদেষ্টা আবার কখনো সচিবের নাম ব্যবহার করেছেন। এছাড়া বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তৎকালীন প্রশাসনকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেশের ১৮টি খাদ্য গোডাউনকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করার আদেশ জারি করান মাহবুব। এই ১৮টি গোডাউনে পদায়নের কথা বলে প্রায় ৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
খাদ্য অধিদপ্তরের এক পরিচালক বলেন, মাহবুবুর রহমান ৬ মাসের আগে দেশে ফিরবেন না। টানা ৬ মাস থাকলে তিনি গ্রিন কার্ড পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন। অপর এক কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী আমল থেকেই তিনি অবৈধভাবে বিপুল অর্থ কামিয়েছেন। দফায় দফায় তিনি সেই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করেছেন।
সাবেক এক মহাপরিচালক বলেন, কক্সবাজারে ওসিএলএলডি পদে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে একজনকে নিয়োগ দিয়েছেন বলে শুনেছি। তার বিরুদ্ধে এরকম দুর্নীতির আরও অভিযোগ রয়েছে। দুদক তদন্ত করলে সত্যতা সাপেক্ষে মামলা করতে পারবে।