মুরগির বাজারে অস্থিরতা কাটছে না। গত দেড় মাসে লাগামহীনভাবে দাম বাড়ায় প্রোটিনের এ সহজ উৎসটিও এখন স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। খুচরায় সোনালি মুরগির দাম ফের বেড়ে প্রতি কেজি ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এমনকি তুলনামূলক কম দামের ব্রয়লার মুরগির কেজিও ২০০ টাকায় পৌঁছেছে। এই দামে মুরগি কিনে খাওয়া নিম্ন আয়ের ক্রেতাদের পক্ষে কষ্টকর। তাই বাজারে এসে ক্রেতাদের অনেকেই দাম শুনেই ফিরে যাচ্ছেন।
গতকাল রাজধানীর নিউমার্কেট কাঁচা বাজারের বনলতা মার্কেটে সোনালি মুরগির দাম শুনে ফিরে যাচ্ছিলেন পেশায় দোকান কর্মচারী মো. গোলাম রাব্বি। কথা হলে তিনি বলেন, সোনালি মুরগির কেজি ৪৫০ টাকা চাইছে। মুলামুলির পর ৪৪০ টাকা বলছে। এত দামে মুরগি কিনে খাওয়া আমার কাছে বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু না। তাই কিনব না, দাম কমলে পরে কিনব।
এ বাজারের বিক্রেতারা জানান, আগের দিন বৃহস্পতিবারের চেয়ে গতকাল শুক্রবার তাদের কেনা দাম বেশি পড়েছে। তাই তাদের দাম বাড়াতে হয়েছে। এখানকার ব্যবসায়ী মো. নুরুদ্দিন বলেন, সোনালি মুরগির কেজি ৪৪০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এই মুরগি কেনা পড়ছে ৪২০-৪২৫ টাকা। বৃহস্পতিবার সোনালি ৪৩০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। আজ (শুক্রবার) যে দামে কেনা, তাতে ৪৪০ টাকা বিক্রি করলেও বেশি লাভ থাকছে না। রাজধানীর কদমতলী এলাকায়ও একই চিত্র। এই বাজারে মুরগি কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. কৌশিক আহমেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, সোনালির ছোটগুলো ৪৩০, আর বড়গুলো ৪৪০ টাকা। বাজারের পেছনে আমাদের যে বাজেট তাতে এ দামে মুরগি কিনে খাওয়া মুশকিল। গরু-খাসির মতো এখন মুরগি খাওয়াও ছেড়ে দিতে হবে মনে হয়।
এ এলাকার সাদ্দাম মার্কেটের মুরগি বিক্রেতা মো. জিসান বলেন, পাইকারিতে মুরগির সরবরাহ কমে গেছে। আমরা চাহিদামাফিক মুরগি পাচ্ছি না। যেমন সোনালি বড় মুরগি খুব কম পাচ্ছি, যা পাচ্ছি ছোট সাইজের। দামও অনেক বেশি। আজ (শুক্রবার) দাম আরেক দফায় ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। খুচরায় এখন সোনালি ৪৩০ টাকা এবং ব্রয়লার ১৯০-১৯৫ টাকা বিক্রি করছি।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে ও বাজার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে সোনালি মুরগির দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। আর দেড় মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ১৩০ টাকা পর্যন্ত। গত ফেব্রুয়ারিতে সোনালি মুরগির দাম ছিল ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা কেজি। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, এ মুরগি প্রথম ধাপে ৩৪০ টাকা, পরে ৩৮০ এবং ৪০০ টাকা ছাড়িয়ে দাম বেড়ে ৪৫০ টাকা হয়। পরে দাম কমে তা ফের ৪২০ টাকায় নামলেও গত দুদিনে দাম ফের বেড়ে সর্বোচ্চ ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেশকিছু সময় ব্রয়লারের দামের তেমন হেরফের না হলেও চলতি সপ্তাহে দাম বেড়ে ডাবল সেঞ্চুরি করেছে।
লাগামহীনভাবে দাম বাড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের পাত থেকে বাদ পড়ছে প্রোটিনের এ উৎসটি। মধ্যবিত্তদেরও পকেটে টান পড়ছে। দাম বাড়ার কারণ জানতে চেয়ে বিক্রেতাদের কাছ থেকে কোনো সদুত্তরও পাচ্ছেন না তারা। এতে ভোক্তাদের হতাশা বাড়ছে।
দাম বাড়ার কারণ জানতে রাজধানীর কাপ্তানবাজারে খোঁজ নিলে সেখানকার ব্যবসায়ীরা জানান, মুরগির খামারগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে আমদানি কম। এ বাজারের পাইকারি বিক্রেতা মো. আলমগীর বলেন, রোগের কারণে মুরগি কম আসছে। সোনালি মুরগি বিশেষ করে বড় আকারের সোনালির সরবরাহ কম। অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটের কারণে যানবাহনের সংখ্যা কমেছে; ভাড়াও ২০ শতাংশ বাড়তি এখন। এসবের প্রভাবে দাম চড়া।
তবে, খামারিরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছেন, জ্বালানি ও পরিবহনে বাড়তি ব্যয়ের অজুহাত দেওয়া হলেও মুরগির একদিনের বাচ্চার বাজারে কারসাজির কারণেই বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। তাদের দাবি, একদিকে খরচের চাপে ছোট খামারগুলোতে উৎপাদন কমেছে, অন্যদিকে রোজার ঈদ সামনে রেখে বাচ্চার দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে, যার রেশ এখনো কাটেনি।
প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার জানান, সোনালি মুরগি প্রস্তুতে সাধারণত ৬০ থেকে ৬৫ দিন এবং ব্রয়লার মুরগির জন্য ৩০ থেকে ৩৫ দিন লাগে। এবার রোজার ঈদ সামনে রেখে দুই মাস আগেই এক দিনের বাচ্চার বাজারে কারসাজি শুরু করে সিন্ডিকেট চক্র। ওই সময় এক লাফে বাচ্চার দাম বাড়িয়ে প্রতি পিস ৫০-৫৫ টাকা এবং পরে সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৮০ টাকা করা হয়। ব্রয়লারের বাচ্চার দামও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়েছে। আবার বাজারে কোন দামে বিক্রি করা হবে সেটাও আগের কায়দায় মোবাইল ফোনে নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীরা অতিরিক্ত লাভ তুলে নিচ্ছে। এসব অনিয়মের কারণে বাজারে হুটহাট অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে।
দাম বাড়ার আরেক কারণ ফিডের দাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময়কার মতো এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত বানিয়ে ফের ফিডের দাম বাড়াচ্ছে প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো। এরই মধ্যে ফিডের বস্তায় ১২৫ থেকে ১৫০ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে খামারে খরচ বেড়েছে।
বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পোলট্রি খাতের প্রতিটি ধাপেই নজরদারির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবার বিভিন্ন অজুহাতে কারসাজি করে ভোক্তাদের পকেট কাটছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা ফের সুযোগ নিচ্ছে। শুধু মুরগির বাজারে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের এই ইস্যুকে বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাতে তারা মুরগি, ভোজ্যতেল, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যে এখন লুটপাট শুরু করে দিয়েছে। দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। সরবরাহের প্রতিটি ধাপে নজরদারির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তারা এখন জ্বালানির অজুহাতে ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, জ্বালানি ও পরিবহনের যে অজুহাত দেওয়া হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে—যে দাম বেড়েছে তা কতটুকু যৌক্তিক তা দেখতে হবে। সেইসঙ্গে জ্বালানির বিষয়ে তথ্যগত স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। তা হলে বাজারে অস্থিরতা কমে আসবে। আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনার প্রবণতাও কমবে।