একের পর এক লেভেলক্রসিংয়ে দফায় দফায় সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। আর তাতে রাজধানী ঢাকায় যানজটের তীব্রতা বাড়ছেই। এসব স্থানে তীব্র যানজটের দরুন ঢাকা যেন অবরুদ্ধ মহানগরীর রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীর রেলপথে বৈধ ও অবৈধ লেভেলক্রসিং আছে ৬১টি।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-টঙ্গী ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব রেলপথে লেভেলক্রসিং রাখা হলে ঢাকায় যানজট দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রকৌশলীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান সড়কের সমান্তরালে রেলপথ বন্ধ রেখে এভাবে যান চলাচল ব্যবস্থায় দুর্ঘটনাও ঘটছে। তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনার ক্ষতি কমাতে হলে লেভেলক্রসিংগুলোয় ওভারপাস ও আন্ডারপাস তৈরির বিকল্প নেই।
সরকারের পক্ষ থেকে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা-টঙ্গী ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে গ্রেড সেপারেট করতে হবে। লেভেলক্রসিংয়ের স্থানে ওভারপাস বা আন্ডারপাস তৈরি করতে হবে। গত দুই দিন আগে এ বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সভা করেছি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবিসহ দুটি সংস্থা এসব অবকাঠামো নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুর ও কমলাপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেলপথে আছে বৈধ লেভেলক্রসিং ৩৯টি, অবৈধ লেভেলক্রসিং ২২টি। সব মিলিয়ে এসব লেভেলক্রসিংয়ে দিনে ও রাতে প্রতিবন্ধক ফেলতে হয় কিছুক্ষণ পর পর। বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্র্যাফিক শাখা সূত্র বলছে, এসব লেভেলক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন ৮৬টি আন্ত নগর ও ৭৮টি মেইল-লোকাল ও কমিউটার ট্রেন চলাচল করে থাকে। দিনরাতের ২৪ ঘণ্টায় প্রতিটি লেভেলক্রসিংয়ের প্রতিবন্ধক ফেলা হয় ১৬৪ বার। প্রতিবার গড়ে ৭ মিনিট লেভেলক্রসিংয়ে বন্ধ রাখা হয়। এই হিসাবে দেখা গেছে, লেভেলক্রসিংয়ে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে প্রায় এক হাজার ১৪৮ মিনিট বা প্রায় ১৯ ঘণ্টা সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। কোনো সময় তা আরো বেশিক্ষণ বন্ধ রাখতে হয়।
নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা ও ঢাকা থেকে টঙ্গী অংশে রেলপথে ট্রেন চড়তে চড়তে কিছুক্ষণ পরপরই চোখ পড়ে লেভেলক্রসিং। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, রেলপথের ওপর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সড়ক। পথচারীরা কোনো বাধা না মেনেই এসব সড়কে চলাচল করছে। কোথাও আবার রেলওয়ের তৈরি করা সীমানা দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে। রেলপথের ওপর দিয়ে মানুষের তৈরি করা সড়কপথে চলাচল করে প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের সড়ক পরিবহন। এসব লেভেলক্রসিংয়ের কোনো অনুমোদন নেই। এগুলোই অবৈধ লেভেলক্রসিং। ইচ্ছামতো রেলপথে পারাপারের পথ তৈরি করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুর স্টেশন অংশের ১২টি স্থানে। কমলাপুর থেকে টঙ্গী রেলপথে অবৈধ লেভেলক্রসিং রয়েছে ১০টি। লেভেলক্রসিং ঘিরে ঢাকার বেশ কিছু স্থানে মাছ-সবজির বাজার ও ঝুপড়ি ঘর তোলা হয়েছে। এগুলো নিরাপদ চলাচলের জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ।
গত সরকারের প্রায় দেড় দশকে লেভেলক্রসিং উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অস্থায়ীভাবে গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু এসব স্থানে ওভারপাস বা আন্ডারপাসের মতো অবকাঠামো তৈরি করে সড়ক যান ও ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। লেভেলক্রসিং ও এটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাজার ও বসতি বন্ধে টঙ্গী থেকে নারায়ণগঞ্জ অংশের বিভিন্ন স্থানে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। তবে কিছুদিন পরই আবার চালু হয়েছে অবৈধ লেভেলক্রসিং, বাজার ও বসতি।
বাংলাদেশ রেলওয়ে ও স্থানীয় সরকার বিভাগ এক সমীক্ষার পর ২০২৩ সালে তৈরি করা প্রতিবেদনে ঢাকাসহ দেশের ৪৭টি লেভেলক্রসিংয়ে ওভারপাস বা আন্ডারপাস নির্মাণ, ১৯৪টি ক্রসিংয়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশের আলোকে প্রকল্প নেওয়া হয়নি। তার আগে ২০১২ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথের সাতটি স্থানে ওভারপাস স্থানের সুপারিশ করা হয়। তাতেও সাড়া দেয়নি সরকার।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামসুল হকের মতে, কোনো আধুনিক মহানগরীতে রেল ও সড়কপথ সমান্তরালভাবে তৈরি করা হয়নি। রাজধানী ঢাকায় স্থানে স্থানে এ ধরনের লেভেলক্রসিং শুধু যানজট বাড়াচ্ছে না; তা দুর্ঘটনারও কারণ। এসব স্থানে বহু আগেই আন্ডারপাস-ওভারপাস নির্মাণ করা উচিত ছিল।
সওজ অধিদপ্তরের সাসেক প্রকল্প-২-এর অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক (তত্ত্বাবধয়ক প্রকৌশলী) সন্তোষ কুমার রায় বলেন, ঢাকার ফুলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে আগে রেলপথ ছিল। তা এখন নেই। তার পরও রেলপথের একটি অংশ মহানগরীর ভেতরে রয়েছে। মহানগরীর ভেতরে রেলপথ থাকায় বিভিন্ন স্থানে সমান্তরালে সড়কপথ থাকায় বৈধ ও অবৈধ লেভেলক্রসিং তৈরি করা হয়েছে। এতে যান চলাচল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ জন্য ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার জন্য রেলপথটি মহানগরীর বাইরে নেওয়া উচিত। আর তা না করা হলে সড়কপথ থেকে রেলপথ আলাদা করতে রেলপথ নিচে দিয়ে তৈরি করা যায়। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট স্থানে ওভারপাস বা আন্ডারপাসও নির্মাণ করা যায়।