Image description

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল হচ্ছে বা কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এই ২০টি অধ্যাদেশের তালিকায় বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬ ও বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬ রয়েছে। এ দু’টি অধ্যাদেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রবাসী ও শ্রমিক যাত্রীদের উপযুক্ত দামে টিকিট বিক্রির সিস্টেমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনা, যাত্রীদের ভোগান্তি লাঘব করা, ট্রাভেল ট্রেডে শৃঙ্খলা আনা ও এবং টিকিট সিন্ডিকেশন বন্ধ করা। তবে এ দু’টি অধ্যাদেশ বাতিল হলে এয়ার টিকিট সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে যাবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

 টিকিট সিন্ডিকেট করে বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা লুটপাটকারী চক্রই এই অধ্যাদেশ বাতিলের সুবিধা পাবে। কারণ এই অধ্যাদেশের বেশ কয়েকটি ধারায় টিকিট সিন্ডিকেট চক্রের লাগাম শক্তভাবে টেনে ধরা হয়েছিল। এ ছাড়া বেসামরিক বিমান চলাচল অধ্যাদেশে যাত্রীসেবা নিশ্চিতকরণ, টিকিটিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার জন্য উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা পর্ষদ গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এই অধ্যাদেশ দু’টি বাতিল হলে পুরনো সিন্ডিকেট ফের বেপরোয়া হয়ে উঠবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এতে ক্ষতির মুখে পড়বেন লাখ লাখ সাধারণ যাত্রী।

সংসদীয় বিশেষ কমিটি জানিয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের পরে জাতীয় সংসদ কার্যকর না থাকায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের আমলে তাড়াহুড়ো করে অনেক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এসব অধ্যাদেশে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। সংসদীয় বিশেষ কমিটির বৈঠকে এসব ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়গুলো উঠে এসেছে। সে কারণে স্পর্শকাতর এসব অধ্যাদেশের ব্যাপারে আরও খতিয়ে দেখে সরকার পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেবে। সে কারণে সংসদীয় বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে আপাতত এসব অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করা হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশসহ চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করতে সংসদে বিল আনার সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। এ ছাড়া ট্রাভেল এজেন্সি অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল অধ্যাদেশসহ আরও ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করার সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এটি হলে এ অধ্যাদেশগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। ১০ই এপ্রিলের পর এগুলো কার্যকারিতা হারাবে।

ট্রাভেল এজেন্সি অধ্যাদেশের ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ট্রাভেল এজেন্সি বা ব্যক্তি প্রকৃত যাত্রীর তথ্য প্রদান না করে ভুয়া নাম তথ্য ব্যবহার করে আসন বুকিং দিয়ে অথবা আসন ক্রয় বা সংগ্রহের উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে কেবল বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার লক্ষ্যে আসন ব্লক করে রাখা যাবে না। আরেকটি ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে অন্য কোনো ট্রাভেল এজেন্সির টিকিট ক্রয়-বিক্রয়, সংরক্ষণ, কমিশন বা প্রণোদনা, অগ্রিম, আদান-প্রদান সংক্রান্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রমও করা যাবে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একটি ফ্লাইটে ৫০ থেকে ১০০টি আসন যাত্রীর নাম ছাড়া ব্লক করে গুটিকয়েক এজেন্সিকে দেয়া হয়। পরে মাঝারি এজেন্সি ও ছোট এজেন্সির হাত ঘুরে এ টিকিটগুলো যাত্রীর নিকট পৌঁছানো পর্যন্ত টিকিটের মূল্য বেড়ে যায়। এভাবে যাতে টিকিটের মূল্য না বাড়ে সেজন্য ট্রাভেল এজেন্সি আধ্যাদেশে এক এজেন্সির সঙ্গে অন্য এজেন্সির ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ করা হয়েছে। এ ছাড়া বড় ট্রাভেল এজেন্সি ছোট ছোট এজেন্সির কাছ থেকে ব্যবসার নামে অগ্রিম অর্থ সংগ্রহ করে। যখন কোনো বড় এজেন্সি বেশি টাকা বাজার থেকে সংগ্রহ করে তখন সুযোগ বুঝে বড় এজেন্সি উধাও হয়ে যায়।

অধ্যাদেশের আরেকটি ধারায় বলা হয়েছে, আকাশপথে ভ্রমণের সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা বা তাকে মিথ্যা প্রলোভন দেখানো যাবে না। তার সঙ্গে কোনো প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করা বা অন্য কোনো ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে টিকিট ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে না। ট্রাভেল এজেন্সির ঠিকানায় রিক্রুটিং এজেন্ট হিসাবে ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত আর্থিক মাধ্যমে লেনদেন করতে হবে।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, অনেক ট্রাভেল এজেন্সি অতিরিক্ত কমিশনের প্রস্তাব দিয়ে যাত্রীদের প্রলুব্ধ করে। সাধারণত একটি ট্রাভেল এজেন্সি এয়ারলাইন্স থেকে ৭ শতাংশ কমিশন পায়। কিন্তু দেখা যায় তারা এর চেয়েও বেশি ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন প্রস্তাব করে যাত্রীদের কাছ থেকে টিকিটের টাকা সংগ্রহ করে টার্গেট করে প্রতারণা করে। এভাবে প্রতারিত হয়েছেন বহু যাত্রী এবং এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে কোনো অভিযোগ দায়ের করলে মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। মূলত যাত্রীদেরকে হয়রানি প্রতারণা বন্ধে একটি শৃঙ্খলা থাকার জন্য বাজার থেকে টাকা নিয়ে উধাও হয়ে না যায় এজন্য এই ধারাটি সরকার করেছিল। ট্রাভেলসের ঠিকানায় রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসা পরিচালনা করার কারণে বিদেশ পাঠানোর নামে প্রতারণা ও হয়রানিও করা হয়। তাই একই ঠিকানায় ট্রাভেল এজেন্সি ও রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসা পরিচালনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

একটি ট্রাভেল এজেন্সির লগিং আইডি, এয়ারলাইন্সের আইডি, জিডিএস-এর আইডি, পাসওয়ার্ড অবৈধভাবে ব্যবহার করে যাত্রীদের সঙ্গে লাইসেন্সবিহীন লেনদেন অথবা লাইসেন্সের কেউ ব্যবসা করে বৈধ নয় এজন্য অবৈধ ব্যবসা ও লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে বিকাশের দোকান, অনুবাদের দোকানে ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসার নামে প্রতারণা কার্যক্রম বন্ধ হবে এবং দেশব্যাপী হাজার হাজার ট্রাভেল এজেন্সির অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা যাবে। এছাড়া কৃত্রিম উপায়ে ভাড়া বৃদ্ধি, ভুয়া যাত্রী, নাম ছাড়া টিকিট ব্লকিং বন্ধ হয়ে যাবে। মিথ্যা তথ্য প্রতারণা চটকদারকরণ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যাত্রীদের প্রতারিত করা বন্ধ হবে।

অধ্যাদেশের কয়েকটি ধারায় বলা হয়েছে, অভিবাসীকর্মী বা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর কার্ডধারীগণের ক্ষেত্রে উৎস দেশ ও গন্তব্য দেশ ব্যতীত তৃতীয় কোনো দেশ থেকে টিকিট ক্রয়-বিক্রি করলে। গ্রুপ বুকিং বা টিকিটিংয়ের ক্ষেত্রে টিকিট কনফার্মেশনের পর যাত্রীর তথ্য পরিবর্তন করলে, অভিবাসী কর্মী বা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)’র কার্ডধারীগণের টিকিট ক্রয়-বিক্রয়কালে মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে একত্রে অর্থ পরিশোধ করলে। ট্রাভেল এজেন্সির চাকরি বা কার্যক্রমের সঙ্গে এয়ারলাইন্স বা জিডিএস বা এনডিসি কোনো কর্মচারীর সম্পৃক্ততা থাকলে, টিকিটের গায়ে ট্রাভেল এজেন্সির নাম, নিবন্ধন সনদ নম্বর ও মূল্য লেখা না থাকলে।

ধারাগুলো প্রণয়নের ব্যাখ্যা হিসাবে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য রুটের প্রচুর টিকিট যাত্রীর নাম ছাড়া ব্লক করে মজুত করে বিদেশি ট্রাভেলসগুলো। বিদেশি ট্রাভেল এজেন্সিগুলো আবার বাংলাদেশের তাদের নির্দিষ্ট কিছু দালাল বা ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ব্ল্যাক মার্কেটের মাধ্যমে বিক্রি করে। পরে টাকা অবৈধ পথে হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বিশেষ করে ভারত, দুবাই, সৌদি আরব মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কাতার, চায়না এসব দেশের সঙ্গে এ ধরনের অবৈধ পথে বড় অঙ্কের লেনদেনে এখন হুন্ডির সাপোর্টিং ব্যবসায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বেশকিছু অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি এই কাজের সঙ্গে জড়িত। মানি লন্ডারিং বন্ধ করার জন্য ও কৃত্রিমভাবে দেশের বাইরে থেকে সিন্ডিকেশন ও ভাড়া বৃদ্ধি বন্ধ করার জন্য ট্রাভেল এজেন্সি অধ্যাদেশে উৎস দেশ ও গন্তব্য দেশ ব্যতীত তৃতীয় দেশ থেকে টিকিট ক্রয়-বিক্রয় ও মজুত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষত শ্রমিক যাত্রীদের টিকিটের ওপর এটি প্রযোজ্য করা হয়েছে। শ্রমিক যাত্রীদের টিকিট ক্রয়-বিক্রয় দালালমুক্ত করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এয়ার লাইন্সে যারা চাকরি করেন তারা যাতে চাকরিকালীন ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায় জড়িত না হন যাতে কোনো রকমের মনোপলি তৈরি না হয় সেজন্য বলা হয়েছে।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, অনেক সময় যাত্রী এয়ারপোর্টে যাওয়ার পরে দেখা যায় তার টিকিটটি ভুয়া। এক্ষেত্রে ওই টিকিটটি কোন এজেন্সি থেকে ক্রয় করা হয়েছে সেটি পাওয়া যায় না। এ ছাড়া টিকিটের প্রকৃত মূল্য কতো, এজেন্সির ঠিকানা, ফোন নাম্বার উল্লেখ না থাকার কারণে যাত্রীরা প্রতারিত হলে তাদেরকে খুঁজে বের করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য ট্রাভেল এজেন্সি অধ্যাদেশে এজেন্সির নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার ও প্রকৃত মূল্য উল্লেখ থাকার আইন করা হয়েছে। যাত্রী সাধারণ বা জনগণের টাকা নিয়ে প্রতারণা করে দেশ ছাড়া হতে না পারে এজন্য প্রতারক ট্রাভেল এজেন্সিকে দেশ ত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষমতা রাখা হয়েছে।

এদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল অধ্যাদেশ অনুযায়ী কোনো রুটে যদি অতিরিক্ত মূল্য হয়, সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যান জনস্বার্থে সেসব রুটে নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণ করতে পারবেন। এয়ারলাইন্স কোন রুটে কতো টাকা ভাড়া নির্ধারণ করলো তার ফেয়ার ফাইলিং সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যানের নিকট এয়ারলাইন্স জমা প্রদান করবে। এটা সিভিল এভিয়েশন অধ্যাদেশ ধারা আছে, যা জনগণের জন্য খুবই উপকারী একটি আইন। এছাড়া দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থায় যাত্রীসেবা নিশ্চিতকরণ, টিকিটিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং বিমান ভাড়া (ট্যারিফ) যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যে গত ২রা জানুয়ারি ‘বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করে সরকার। এই অধ্যাদেশটিও বাতিলের সুপারিশের তালিকায় রেখেছে সংসদীয় কমিটি। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিমান ভাড়া ও বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনতে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের ‘উপদেষ্টা পর্ষদ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই পর্ষদ দেশি ও বিদেশি এয়ার অপারেটর এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটরদের জন্য ফি, চার্জ, রয়্যালটি এবং ভাড়ার হার নির্ধারণের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। এয়ার অপারেটরদের তাদের সব রুটের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ভাড়ার তালিকা (ট্যারিফ) কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করতে হবে। কোনো রুটে কৃত্রিম সংকট বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিলে চেয়ারম্যান সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবেন।