কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছেন তার বাবা ইয়ার হোসেন। তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগহীনতা, মামলার অগ্রগতির দৃশ্যমান অভাব এবং ডিএনএ প্রতিবেদনসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে বুধবার (৮ এপ্রিল) সকাল ১০টায় ইয়ার হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ঢাকা থেকে এসে আদালতে হাজির হলেও আমাদের সঙ্গে কেনো কথা না বলেই চলে গেছেন। মামলাটা আগের মতোই চলছে, আমার কথা কেউ গ্রাহ্য করে না।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) কোনো যোগাযোগ রাখেন না আমার সঙ্গে। তিনি শুধু গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। আমরা জানিই না তদন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিএনএ রিপোর্ট কবে পাব, সেটাও কেউ জানায় না। আমার তো মনে হয়, আমার মামলাই ঠিকমতো হচ্ছে না।’
এদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বর্তমানে আদালত তিনজনের ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছেন। এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে তদন্তের পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়া হবে এতটুকুই বলতে পারব, কারণ আমাদের কিছু রুলস আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত ১০ বছরের সব নথিপত্র ও তথ্য পুনরায় পর্যালোচনা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান ও বিস্তারিত বিষয় তদন্তের পরবর্তী ধাপে জানানো যাবে।’
তবে মামলার অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তনুর বাবা ইয়ার হোসেন জানান, শুরু থেকেই তিনি সার্জেন্ট জাহিদকে মূল আসামি হিসেবে সন্দেহ করে আসছেন। কিন্তু এখনও তাকে গ্রেপ্তার বা জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই বলে দাবি তার। এসময় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘এই মামলায় যদি কিছু না হয়, তাহলে আমি আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করব।’
দীর্ঘ এক দশক পর তনু হত্যা মামলায় প্রথমবারের মতো সন্দেহভাজন তিন সাবেক সেনাসদস্যের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। তারা হলেন—ঘটনার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক শাহীন আলম। বর্তমানে তারা সবাই অবসরে রয়েছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের পর তাদের অবসরের ধরন (স্বাভাবিক না বাধ্যতামূলক) এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে গত সোমবার (৬ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হকের আদালতে হাজির হন তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম। আদালতের তলবের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে মামলার অগ্রগতি তুলে ধরেন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তিনজনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার আবেদন করেন। আদালত তার সেই আবেদনে সম্মতি দেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ মামলায় এখন পর্যন্ত ৬ জন তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান এবং ২০১৬ সালে সিআইডির কুমিল্লার তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মদ সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রায় চার বছর করে মামলাটির তদন্ত করেছেন।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকা থেকে সোহাগী জাহান তনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি সেনানিবাসের একটি বাসায় প্রাইভেট পড়াতে যেতেন। সেই বাসার পাশের জঙ্গলে তার মরদেহ পাওয়া যায়। এদিকে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মরদেহ উদ্ধারের রহস্য উন্মোচন না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। নতুন করে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগে মামলার অগ্রগতির আশা জাগলেও তদন্তের স্বচ্ছতা ও ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
