Image description

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে সরকারের প্রায় দুই কোটি টাকার জমিতে বহুতল ভবন তুলছে বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান তানভীর হোল্ডিং লিমিটেড। পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে সরকারি তালিকায় থাকা জমিটির মালিক গণপূর্ত অধিদপ্তর হলেও তাদের উপেক্ষা করেই চলছে নির্মাণকাজ। ইতোমধ্যে দোতলার কাজ শেষ হয়েছে, চলছে তৃতীয় তলার কাজ। আইনি লড়াই করেও থামাতে পারছে না গণপূর্ত অধিদপ্তর।

ডি ব্লকের (পি-১) এই প্লটটির আয়তন ১ দশমিক ৮০ কাঠা। ১৯৮৬ সালে সরকার বাড়িটিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এরপর থেকে জমিটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে নথিভুক্ত থাকলেও বছরের পর বছর ধরে এটির নিয়ন্ত্রণ ছিল অবৈধ দখলদারদের হাতে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ড দীর্ঘদিনেও এটি উদ্ধার করতে পারেনি।

কয়েক বছর আগেও জায়গাটিতে একটি মৃতপ্রায় রেইনট্রি গাছ নিয়ে জীর্ণশীর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একটি ছোট সেমিপাকা বাড়ি। সেই বাড়ি ভেঙেই শুরু হয় বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ। মাঝে কিছুদিন বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি নতুন করে শুরু হয়েছে তাদের নির্মাণকাজ। নির্মাণস্থলটি ত্রিপল দিয়ে ঢাকা, তবে বাইরে থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে—কাজ পুরোদমে চলছে।

 

দখলদারদের হাতবদল

২০২৩ সালে গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ জমিটি নিয়ে একটি তদন্ত পরিচালনা করে। তদন্তে উঠে আসে দখলের দীর্ঘ ইতিহাস। জমির সামনের অংশটি বাণিজ্যিক এবং পেছনের অংশ আবাসিক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সামনে ছিল পাঁচটি দোকান। এর মধ্যে ইয়াহিয়া হোটেল পরিচালনা করতেন এ. এম. আনোয়ারুল করিম। তদন্তকালে তিনি জানান, পৈতৃক সূত্রে প্রায় ৪০ বছর ধরে ভাড়াটিয়া হিসেবে দোকানটি ব্যবহার করে আসছেন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত নাজমা বেগম নামের একজনকে ভাড়া দিতেন। এরপর থেকে ভাড়া পরিশোধ করতেন ইসমাইল হোসেন নামের আরেকজনকে।

দ্বিতীয় দোকান একে কম্পিউটার টেকনোলজির মালিক সাগর আহমেদও প্রায় ২০ বছর ধরে ইসমাইল হোসেনকে ভাড়া পরিশোধ করে আসছিলেন। তৃতীয় দোকান সোহাগ ট্রেড সেন্টার সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।

চতুর্থ দোকান মিয়াম জেনারেল স্টোরের মিলন হোসেন জানান, ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২০ বছর ধরে তিনিও ইসমাইল হোসেনকেই ভাড়া দিয়েছেন। পঞ্চম দোকান নাদিম হোটেলের মালিক মো. নাদিমও ছিলেন ইসমাইল হোসেনের ভাড়াটিয়া।

অর্থাৎ ভবনের কার্যত নিয়ন্ত্রণ ছিল ইসমাইল হোসেনের হাতে। তিনি অবশ্য নিজে নিয়মিত ওই বাড়িতে থাকতেন না। পরে নিজেকে যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে বাড়িটি নিজের নামে বরাদ্দের আবেদন করেন তিনি।

তদন্ত চলাকালে আকস্মিকভাবে দৃশ্যপটে আসে তানভীর হোল্ডিং। ভবনের সামনে তারা সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়, ‘এই জমির মালিক তানভীর হোল্ডিং লি.।’ এরপর শুরু হয় পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন নির্মাণকাজ। তবে ইসমাইল হোসেনের কাছ থেকে কীভাবে জমিটি তানভীর হোল্ডিংয়ের দখলে এলো, তা বিস্তারিত জানা যায়নি।

 

গণপূর্তের আইনি লড়াই

সাইনবোর্ড দেখার পরে নড়েচড়ে বসে গণপূর্ত অধিদপ্তর। ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই তারা আইনি পদক্ষেপ নেয়। গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ-২-এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীকে জরুরিভিত্তিতে সাইনবোর্ড অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী চার দিন পর ১৭ জুলাই মোহাম্মদপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।

জিডিতে অবশ্য কাজ হয়নি। তানভীর হোল্ডিং হাইকোর্ট থেকে রিট আদেশ নিয়ে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখে। পরে গণপূর্ত আপিল বিভাগ থেকে স্থগিতাদেশ আনলে কিছুদিনের জন্য কাজ বন্ধ থাকে। কিন্তু সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হয়ে গেল আবার শুরু হয় নির্মাণকাজ।

গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আসেফ বখশ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এটা নিয়ে আমরা ইতোমধ্যেই মামলার বিষয়ে এগোচ্ছি। ২০২৩ সালে হাইকোর্ট থেকে ওই পার্টি রিট নিয়ে আসছিল, আমরা পরে আপিল বিভাগ থেকে স্টে অর্ডার নিয়ে আসি। তারপর কাজ বন্ধ ছিল। যখন স্টে অর্ডারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং নতুন কোনো অর্ডার আসছিল না, তখন তারা জোরপূর্বক আবার নির্মাণকাজ শুরু করেছে। আমরা তাদের আটকাতে গিয়েছিলাম, কিন্তু তারা স্টে অর্ডার ছাড়া কিছু মানতে রাজি নয়।’

বর্তমানে আপিল বিভাগে মামলাটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। আসেফ বখশ জানান, অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে দেখা করে মামলার সিরিয়াল ৩০০ থেকে ৬০-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘স্টে অর্ডার ছাড়া তাদের থামানো যাচ্ছে না। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব মামলা নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি।’

 

সমস্যা দেখছে না তানভীর হোল্ডিং

গণপূর্ত অধিদপ্তরের আইনি লড়াই সত্ত্বেও নিজেদের দাবিতে অটল তানভীর হোল্ডিং। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিচয় দেওয়া মো. হাতেম আলী বলেন, ‘আমরা এই জমি কিনেছি। আমাদের কাছে বাড়ির শতভাগ কাগজপত্র আছে। সব জায়গায় জানে যে ঝামেলা নেই, সবখানেই কাগজপত্র দেখানো হয়েছে। রাজউক দেখেছে, খাজনা-খারিজ, আরএস রেকর্ড, বিএস রেকর্ড আছে। কোনো সমস্যা নেই।’

জমি কার কাছ থেকে কিনেছেন? এমন প্রশ্ন করা হলে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে গড়িমসি করেন তিনি।

তানভীর হোল্ডিংয়ের পক্ষ থেকে এমন দাবি করা হলেও সরকারি নথি অবশ্য বলছে ভিন্ন কথা। ১৯৮৬ সাল থেকে জমিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে রাষ্ট্রীয় তালিকায় রয়েছে। তদন্তে লিজ ও লিজের কাগজপত্র নিয়েও নানা অসংগতির কথা উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে আদালতের দরজায় ঘুরছে গণপূর্ত অধিদপ্তর, অন্যদিকে নিজেদের মতো করে ভবন তুলে যাচ্ছে তানভীর হোল্ডিং।