রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোয় আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে হামের সংক্রমণ। সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তির হার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে—আর স্কুল হলো সে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর একটি। এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা। স্কুলগামী শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় অনেক পরিবার এরই মধ্যে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় এগিয়ে এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের একাধিক স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের উদ্দেশে লিখিত নোটিস জারি করেছে। জ্বর, ফুসকুড়ি বা সংক্রামক রোগের উপসর্গ দেখা দিলে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত স্কুলে না পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান মৌখিকভাবেও একই নির্দেশনা দিচ্ছে।
এদিকে সন্দেহজনক হাম বা এ রোগের উপসর্গ নিয়ে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরো ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে অতিসংক্রামক হামে প্রাণ হারিয়েছে আরো এক শিশু। আর এসব মৃত্যুর বেশির ভাগই ঢাকা বিভাগে। এ সময়ে সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৪১ শিশু। হাম শনাক্ত হয়েছে ২২৪ শিশুর দেহে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
সন্দেহজনক হাম নিয়ে রোগী ভর্তির হারও ঢাকা বিভাগে অনেক বেশি। এ সময় বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ২৫৬ শিশু। রাজধানী ঢাকায় সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা।
বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, একাধিক শিক্ষার্থী একই শ্রেণীকক্ষে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে অবস্থান করায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তাই শুরু থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উপস্থিতি নীতিতেও সাময়িক নমনীয়তা দেখানোর ইঙ্গিত দিয়েছে, যাতে অসুস্থতার কারণে কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
বাংলাদেশ ইন্টারন্যাাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ এক লিখিত নির্দেশনায় বলে, ‘সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় হাম রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি কোনো শিক্ষার্থীর মধ্যে হামের উপসর্গ (যেমন জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি, সর্দি-কাশি ইত্যাদি) দেখা যায়, তাহলে তাকে স্কুলে না পাঠিয়ে বাসায় বিশ্রামে রাখার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।’ রাজধানীর আরো কয়েকটি স্কুল থেকেও অভিভাবকদের প্রায় একই ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্যারেন্টস ফোরামের সভাপতি একেএম আশরাফুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যালয়গুলোয় হামের বিষয়ে সতর্কতার বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তবে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার কারণে রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্কুল নিজ উদ্যোগে নির্দেশনা দিয়েছে। তবে আমরা চাই, সরকার প্রতিটি স্কুলে টিকাদান কর্মসূচি চালু করুক। কারণ এ পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইলে সব শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি। আর এক্ষেত্রে স্কুলগুলোকেই টিকা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে বিষয়টি আরো সহজ হবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনের তথ্য অনুসারে, এখন পর্যন্ত হামে নিশ্চিত আক্রান্ত মোট শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৩৯৮। আর গত ১৫ মার্চ থেকে হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিতে গেছে ৯ হাজার ৮৮৩ জন। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে ৬ হাজার ৮৮৩ শিশুকে। আর হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪ হাজার ৬৩৫ জন।
গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরো ১ হাজার ২৩৬ জন হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে নমুনা পরীক্ষায় ২২৪ জনের হাম শনাক্ত হয়। দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এবং ভাইরাসজনিত এ রোগের লক্ষণ নিয়ে গত একদিনে আরো ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে ২১ জন এবং হামের লক্ষণ নিয়ে ১২৮ শিশুর মৃত্যু হলো।
নতুন করে সন্দেহজনক হাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগে, ২৫৬ শিশু। এরপর রয়েছে যথাক্রমে চট্টগ্রাম (১২৫), রাজশাহী (৯২), খুলনা (৬৫), বরিশাল (৫০), সিলেট (২১), রংপুর (১৭) ও ময়মনসিংহ বিভাগ (১৫)। হাম আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি বরগুনা সদর উপজেলায়। ইপিআইয়ের তথ্যমতে, দেশের দক্ষিণের এ জেলায় প্রতি ১০ লাখে হাম সংক্রমণের হার ২৯৪ দশমিক ৫ জনের। দেশে আর কোথাও এমন হারে সংক্রমণ দেখা যায়নি।
অভিভাবকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যেসব জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে সেগুলোয় সাময়িক সময়ের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখা এবং বিদ্যালয়গুলোয়ই শিক্ষার্থীদের টিকাদানের উদ্যোগ নেয়া উচিত। বরগুনার বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বরগুনায় হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় গত দুইদিন পাঠাইনি। কারণ গ্রামাঞ্চলে সব অভিভাবক সচেতন নন এবং আমার মনে হয়, এমন অনেক শিশুই আছে যাদের টিকা দেয়া হয়নি। সরকারেরও বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত এবং হাম যেসব এলাকায় বেশি ছড়াচ্ছে সেসব এলাকায় অন্তত এক সপ্তাহের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখা যেতে পারে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু জাফর মো. ছালেহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এরই মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে আমাদের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। হামের বিষয়ে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সব বিদ্যালয়কে চিঠি দিয়েছি। এসব চিঠিতে কোনো শিক্ষার্থীর মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত তাকে আইসোলেট করা, চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ এবং সন্তানদের টিকাদান নিশ্চিত করার বিষয়ে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে।’
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাম সংক্রমণ বাড়তে থাকায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে তারা মনে করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই কেবল হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঠান্ডা-জ্বর, চোখ লাল হওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া বা কাশির মতো উপসর্গ দেখা দিলে কোনো শিশুকে স্কুলে পাঠানো উচিত নয়। একই সঙ্গে কোনো শিক্ষার্থী এসব লক্ষণ নিয়ে স্কুলে এলে তা শনাক্ত করে দ্রুত তাকে বাড়িতে পাঠানোর বিষয়েও শিক্ষক-প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আগেই এ বিষয়ে সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারির প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন তিনি।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ উল্লেখ করে ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, ‘কোনো আক্রান্ত শিশু যদি শ্রেণীকক্ষে উপস্থিত থাকে তাহলে তার সংস্পর্শে এসে ১৫-১৮ জন পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শুরুতেই সতর্ক হওয়া জরুরি। কারো শরীরে জ্বর, সর্দি বা কাশির মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের মাধ্যমে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে আলাদা বা আইসোলেশনে রাখা উচিত। পাশাপাশি তাকে স্কুল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা যেকোনো জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে।’
এদিকে দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় গত শুক্রবার থেকে দেশের ৩০টি উপজেলায় হামের হটস্পট নির্ধারণ করে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ সিটি, বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় হামের টিকা কার্যক্রম শুরু হবে। আর ৩ মে থেকে দেশব্যাপী এ টিকা কার্যক্রম শুরু হবে বলে গতকাল জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিরতিহীনভাবে এ টিকা কার্যক্রম চালিয়ে যাব। জনস্বাস্থ্য সঠিক রাখার জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখার জন্য এ কার্যক্রম চলবে।’
হামের জন্য নির্ধারিত মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে সচেতন আছি, আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে অ্যাটাচমেন্ট বৃদ্ধি করে ডাক্তার দিয়ে যাব, টেকনিশিয়ান, নার্স বাড়ানো হবে। এটার জন্য কষ্ট হবে না। এ মহামারীকে মোকাবেলা করার জন্য শুধু ডিএনসিসি হাসপাতাল নয়, প্রত্যেক জায়গায় আইসোলেশন বেড, গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বলে রেখেছি। বড় বড় হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিসরে ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইনটেনসিভ কেয়ার যেখানে আছে সেগুলোকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। এ কারণে শিশুদের সচেতন করতে হবে। রোগটিতে আক্রান্ত হলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় এবং নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়।
কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হলে তাকে অবশ্যই সুস্থ শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে বলে জানান জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে হামের সব লক্ষণ একসঙ্গে প্রকাশ পায় না। সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো উপসর্গ থাকায় অনেক শিশু স্বাভাবিকভাবেই অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা করে, যা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।’
ডা. ফয়সাল বলেন, ‘যেহেতু হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ এবং বর্তমানে এর প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, তাই অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। এমনকি সাধারণ জ্বর বা ঠাণ্ডা থাকলেও শিশুদের স্কুলে না পাঠানোর বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। শিক্ষকদেরও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাস তৈরি করা এবং প্রতিরোধমূলক বার্তা পৌঁছে দেয়া এখন সময়ের দাবি।’
হাম প্রতিরোধে নিয়মিত হাত ধোয়া, বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন জ্যেষ্ঠ এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তার মতে, সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।